kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

মৎস্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মৎস্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

সসাগরা ভারতবর্ষ। গহিন অরণ্য। শ্বাপদসংকুল। উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণি। পর্বতের গায়ে গায়ে বহতা ক্ষীণ জলধারা। সমতলে এই বারিধারা তরঙ্গময় খরস্রোতা নদী—গঙ্গা, সরস্বতী, সিন্ধু, কাবেরি, যমুনা, ইরাবতী—এসব। পাহাড় ঘিরে ঘিরে উপত্যকা। উপত্যকা ছাড়িয়ে বিশাল বিশাল সমতল ভূমি। ভূমিজুড়ে ফসলের সম্ভার। সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা এই ভারতবর্ষ বহুসহস্র বছর আগে থেকে মানুষের আবাসস্থল।

আসমুদ্র হিমাচল বিস্তৃত এই ভারতবর্ষকে দুটি রাজবংশ শাসন করে আসছে। সূর্যবংশ আর চন্দ্রবংশ। সূর্য এবং চন্দ্র—দুজনেই প্রভাবশালী দেবতা। সূর্যের পিতা কশ্যপ, মা অদিতি। অদিতির পুত্র বলে সূর্যের আরেক নাম—আদিত্য। কালক্রমে সূর্য বিয়ের যোগ্য হয়ে ওঠেন। বিয়ে করেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার মেয়ে সংজ্ঞাকে। সংজ্ঞার গর্ভে জন্মলাভ করে তিন তিনটি সন্তান। এঁদের নাম—বৈবস্বত মনু, যম এবং যমুনা। সূর্য অত্যন্ত তেজবান পুরুষ। সূর্যের প্রখর দ্যুতি সংজ্ঞা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। ছায়া নামের এক তরুণীর শরণাপন্ন হন সংজ্ঞা। ছায়াকে সূর্যের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে সংজ্ঞা উত্তরকুরুবর্ষ নামক স্থানে পালিয়ে যান। তার পরও তিনি আশঙ্কামুক্ত হতে পারেন না। সূর্যের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য তিনি অশ্বিনীরূপ ধারণ করেন। ছায়া সংজ্ঞার মতো করেই সূর্যের সেবাযত্ন শুরু করেন। সূর্যের ঔরসে ছায়ার গর্ভে দুই পুত্র ও এক কন্যা জন্মে। জ্যেষ্ঠ পুত্র সাবর্নি মনু, দ্বিতীয় ছেলে শনি এবং কন্যার নাম তপতী।

 

তবে শেষ পর্যন্ত সংজ্ঞা লুকিয়ে থাকতে পারেননি। সূর্যের কাছে ছায়া ধরা পড়েন একদিন। উত্তর কুরুতে চলে যান সূর্য। নিজে অশ্বরূপ ধারণ করে অশ্বিনীরূপী সংজ্ঞাকে সংগম করেন। জন্ম নেয় অশ্বিনীকুমারদ্বয় নামের দুই পুত্র। এরপর সংজ্ঞাকে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। কথা দেন নিজের উগ্র তেজোবীর্য কমিয়ে ফেলবেন তিনি। এভাবে ধীরে ধীরে গোটা ভারতবর্ষে সূর্যবংশের সন্তানরা ছড়িয়ে পড়লেন।

সূর্য ও সংজ্ঞার ওই যে বড় ছেলে বৈবস্বত মনু, যৌবনবান হয়ে স্ত্রী ঘরে আনলেন। এক পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন মনু। পুত্রের নাম দিলেন—ইক্ষ্বাকু। পরবর্তীকালে এই ইক্ষ্বাকু পৃথিবীশ্রেষ্ঠ নৃপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তিনি প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী। তার বীর্য-ঐশ্বর্য সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। ছোট-মাঝারি রাজারা তাঁর পায়ের কাছে এসে নতজানু হলেন। ইক্ষ্বাকু সূর্যের পৌত্র। ইক্ষ্বাকু হতে সূর্যবংশের ধারা প্রবহমান হলো। সূর্যবংশ ক্ষত্রিয় বংশ নামেও এই পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করল।

সূর্যবংশের দুটি ধরা। প্রথম ধারার রাজারা অযোধ্যায় রাজত্ব করতেন। দশরথ এই ধারার নৃপতি। দশরথপুত্র রামচন্দ্র এই ধারার খ্যাতিমান রাজা। দ্বিতীয় ধারার রাজারা মিথিলায় রাজত্ব করতেন।

দেবতা চন্দ্র থেকে চন্দ্রবংশের উত্পত্তি। চন্দ্রের বাবা অত্রি মুনি। চন্দ্র ছিলেন কামুক আর অহংকারী। রাজা দক্ষের ভরণী, কৃত্তিকা, আর্দ্রা, অশ্লেষা, উত্তরফাল্গুনী, বিশাখা প্রভৃতি সাতাশ জন কন্যাকে বিয়ে করেন চন্দ্র। তাঁদের নিত্য ভোগ করেও কামাগ্নি নিভে না চন্দ্রের। দেবগুরু বৃহস্পতির সুন্দরী স্ত্রী তারার প্রতি কুনজর দেন চন্দ্র। ওতেই তিনি থেমে থাকেন না, হরণ করে বসেন তারাকে। এবং তারাকে বলাত্কার করেন। দেব-দৈত্যে ঘোর বিবাদ উপস্থিত হয়। সমূহ বিপদ আসন্ন দেখে চন্দ্র তারাকে বৃহস্পতির কাছে প্রত্যার্পণ করেন। তত দিনে তারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। তারার গর্ভমোচনে এক পুত্র জন্মে। বৃহস্পতি তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। চন্দ্র এই পুত্রকে গ্রহণ করে নাম রাখেন বুধ। বৃহস্পতি চন্দ্রকে যক্ষ্মারোগগ্রস্ত হওয়ার অভিশাপ দেন। সেই জন্য চন্দ্র মাসে ১৫ দিন ক্ষয় পেতে থাকে। এই চন্দ্র থেকেই উদ্ভূত হয় এক রাজবংশ। পৃথিবীতে এই রাজবংশ চন্দ্রবংশ নামে পরিচিতি পায়। এই বংশটিও দুই ভাগে বিভক্ত—যাদববংশ এবং পৌরববংশ। প্রথম বংশ যদু থেকে এবং দ্বিতীয় বংশ পুরু থেকে সৃষ্ট। যদু বংশেই কৃষ্ণের জন্ম হয়েছে আর কুরুপাণ্ডবরা জন্মেছেন পুরুবংশে। পরবর্তীকালে পুরুবংশ কুরুবংশ নামেও পরিচিতি পায়।

কুরুবংশের খ্যাতকীর্তি অধিপতি হলেন শান্তনু। শান্তনুর পিতার নাম প্রতীপ। সুনন্দা হলেন তাঁর জননী। প্রতীপ প্রতিপত্তিশালী নরপতি ছিলেন। বিশাল বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে প্রতীপের রাজ্য ছড়িয়ে ছিল। হস্তিনাপুর ছিল প্রতীপ রাজ্যের রাজধানী। গঙ্গার দক্ষিণ তীরে এই হস্তিনাপুর। জাঁকজমকে সেই সময়ের ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজার রাজধানীগুলোর মধ্যে হস্তিনাপুর ছিল তুলনাহীন। এর রাস্তাঘাট, এর সুরম্য প্রাসাদগুলো, এর জলাশয়, এর দিব্যকান্তি দেবতাদের মন্দির সব—অন্যান্য দেশের রাজা-প্রজাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিত। হস্তিনাপুর ছিল সুসজ্জিত, এর আইন-শৃঙ্খলা ছিল মনুষ্যবাসের অনুকূল। প্রজারা ছিল দারিদ্র্যমুক্ত। রাজসভায় চর্চিত হতো ধর্ম, সাহিত্য, রাজনীতি, ধনুর্বিদ্যা। প্রতীপের পারিষদরা ছিলেন জ্ঞানী, মন্ত্রীরা ছিলেন প্রজারঞ্জক। চারদিকে ভূপতি প্রতীপের জয়গান ধ্বনিত হতো।

এ রকম একটা রাজ্যের রাজধানী হস্তিনাপুর, প্রতীপের মতো প্রজাহিতৈষী এবং প্রতাপী একজন রাজার ঘরে শান্তনু জন্মগ্রহণ করেন। শান্তনু নৃপতি প্রতীপের একমাত্র পুত্র ছিলেন না। শান্তনু ছাড়া রানি সুনন্দার গর্ভে আরো দুজন পুত্র সন্তান জন্মেছিলেন। তাঁরা হলেন দেবাপি এবং বাহ্লিক। দেবাপি শান্তনুর জ্যেষ্ঠ সহোদর আর কনিষ্ঠ হলেন বাহ্লিক।

বড় ছেলে দেবাপি থাকা সত্ত্বেও এবং দেবাপি সর্বগুণান্বিত সর্বাঙ্গ সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও রাজা প্রতীপ কালক্রমে শান্তনুকে যুবরাজ করেন। দেবাপি যে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, এমন নয়। অথবা নিজের অন্য কোনো গুরুতর আচরণে মহারাজা বা মহারানির মনঃকষ্টের কারণ হয়েছিলেন, তা-ও নয়। তার পেছনে অন্য একটা কারণ ছিল।

বাল্যবেলা থেকেই দেবাপি কী রকম যেন উদাসীন, কী রকম যেন বিষয় নিরাসক্ত। ঐশ্বর্য, ক্ষমতা, রাজসুখ, রমণী, যুদ্ধবিগ্রহ—এসবের প্রতি গভীর গাঢ় এক ঔদাসীন্য দেবাপির। সেই ছোটবেলা থেকেই নির্জনতা তাঁর কাছে প্রিয়। রাজপ্রাসাদের চেয়ে অরণ্য তাঁর কাছে অধিক আকর্ষণীয়।

কৈশোর উত্তীর্ণ হলে একদিন পিতার সামনে এসে দাঁড়ালেন দেবাপি। অর্ধনির্মীলিত চোখে পিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘বাবা, আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন।’

খুব ছোটবেলা থেকে দেবাপি অন্য রকম বলে এই পুত্রটিকে বহুদিন তেমন করে খেয়াল করেননি রাজা প্রতীপ। বেখেয়ালি পিতা আজকেও দেবাপির কথা তেমন করে খেয়াল করলেন না। অনেকটা অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যেতে দেব! কোথায় যেতে দেব? কোথায় যেতে চাও তুমি দেবাপি?’ ‘আমি সংসার ত্যাগ করে যেতে চাই।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন দেবাপি।

‘কী—!’ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন প্রতীপ। প্রথম কিছুক্ষণ মুখ দিয়ে কথাই সরল না তাঁর। নিজের ভেতরটা সংহত করে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কথা আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারছি না পুত্র। তুমি কি তোমার কথাগুলো আবার একটু গুছিয়ে বলবে আমায়?’

দেবাপি বুঝলেন—তাঁর কথা পিতা প্রতীপ ঠিকই শুনেছেন এবং বুঝেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। এত অল্প বয়সে, এত সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থেকে কোনো রাজপুত্র যে রাজধানী ত্যাগ করে অরণ্যে চলে যেতে চায়, তা রাজা কেন, কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষেও তো বিশ্বাস করা কঠিন। তাই বাবা চক্ষু আর কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের জন্য তাঁর কথাটি আবার শুনতে চান।

নিরাবেগ কণ্ঠে পিতাকে লক্ষ্য করে দেবাপি আবার বললেন, ‘এই সংসারের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই বাবা। এ রকম ঐশ্বর্যে ভরা জীবন আমার মোটেই ভালো লাগে না। এত বৈভবে থেকে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না বাবা। আমি এই রূপময় জীবন ত্যাগ করতে চাই। আমি অরণ্যচারী হয়ে স্রষ্টাসাধনায় মগ্ন হতে চাই।’

কী বলবেন ঠিক করতে পারলেন না নৃপতি প্রতীপ। তিনি যেন সংবিৎ শূন্য। বহু কষ্টে তিনি প্রহরীকে বললেন, ‘রাজমহিষীকে সংবাদ দাও।’

রাজমহিষী সুনন্দা এলে দিশাহারা নৃপতি ডান হাতের তর্জনীটি তুলে দেবাপিকে দেখিয়ে দিলেন।

সুনন্দা কিছুই বুঝতে পারলেন না। একবার রাজা, আরেকবার রাজপুত্রের দিকে তাকাতে লাগলেন। পরে দেবাপির কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে পুত্র? তোমার পিতাই বা এ রকম করছেন কেন?’

এবার কণ্ঠকে আরো দৃঢ় করে দেবাপি বললেন, ‘আমি প্রব্রজ্যায় যেতে চাই জননী।’

‘মানে—! এ কী বলছ তুমি দেবাপি? তুমি সন্ন্যাসী হয়ে গেলে আমরা কাকে নিয়ে বাঁচব পুত্র।’ বিহ্বল ভঙ্গিতে বললেন রানি সুনন্দা।

‘শান্তনু আছে মা। বাহ্লিকও আছে। ওরা আমার অনুপস্থিতির কষ্ট ভুলিয়ে দেবে।’

রাজা প্রতীপ বলে উঠলেন, ‘আমার পরে এই সাম্রাজ্যের অধিপতি হবে কে? আমার বংশধারা অব্যাহত রাখবে কে?’

নিজের মধ্যে নিজেকে একেবারে গুটিয়ে দেবাপি বললেন, ‘পিতার পরে এই চন্দ্রবংশের রাজা হবে শান্তনু। তাকেই যুবরাজ করুন বাবা, কালক্রমে ও-ই নৃপতি হোক এই হস্তিনাপুরের।’

‘বাবা, বাবারে এ কী বলছিস তুই!’ একেবারেই ভেঙে পড়া গলায় বলে উঠলেন মহারানি সুনন্দা।

দ্রুত পায়ে মায়ের কাছে এগিয়ে গেলেন দেবাপি। নিজের দুখানি হাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘যাকে সংসারের জালে বাঁধার নয়, তাঁকে বাঁধতে চেয়ো না মা। আমাকে আমার পথে এগোবার অনুমতি দাও মা।

এরপর রাজা এবং রানির অনেক কাকুতি-মিনতি আর চোখ রাঙানির পরও দেবাপিকে নিরস্ত করা গেল না। তখন তখনই রাজকীয় বেশভুষা পরিত্যাগ করলেন দেবাপি। পিতা-মাতার চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। তারপর দেবাপি নামের সন্ন্যাসীটি হস্তিনাপুরের জৌলুশময় জীবনকে পেছনে ফেলে প্রব্রজ্যাজীবনের দিকে অগ্রসর হলেন। প্রব্রজিত দেবাপির পরনে তখন সন্ন্যাসীর জীর্ণবিবর্ণ বস্ত্র।

এই ঘটনার অনেক দিন পরে শান্তনু যখন যুবক হয়ে উঠলেন, নৃপতি প্রতীপ শান্তনুকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। রাজকুমার শান্তনু পিতার রাজকার্যে অংশগ্রহণ শুরু করলেন। কালে কালে শান্তনু রণকুশলী, দক্ষ রাজনীতিজ্ঞ, প্রজাপ্রিয় হয়ে উঠলেন। শান্তনুর চেহারা ছিল অতি মনোহর। প্রিয়দর্শন শান্তনুর মধ্যে বেশ কিছু সদগুণ দৃশ্যমান হয়ে উঠল। তিনি পরিশ্রমী এবং নিরলস। ধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সত্যবাদী হিসেবে শান্তনুর খ্যাতি মানুষের মুখে মুখে।

প্রতীপ প্রবীণ থেকে প্রবীণতর হতে থাকলেন। মহারানি সুনন্দার চুলে রুপালি আভা। একদিন রাজা-রানি দুজনের মনে বানপ্রস্থে যাওয়ার বাসনা প্রবল হয়ে উঠল। এক গভীর রাতে প্রতীপ এবং সুনন্দা সিদ্ধান্ত নিলেন—তাঁরা সংসার ত্যাগ করে জীবনের তৃতীয় আশ্রমে চলে যাবেন। শাস্ত্রে যে নির্ধারিত হয়ে আছে সংসার ধর্মে আর ভোগবিলাসে বিরাগ জন্মালে মানুষ বানপ্রস্থে যাবে এবং সেখানে ঈশ্বরচিন্তায় জীবন অতিবাহিত করবে।

পরদিন রাজসভায় প্রতীপ তাঁর এবং তাঁর মহিষীর সিদ্ধান্তের কথা মন্ত্রী-অমাত্যদের জানিয়ে দিলেন। মহামন্ত্রীকে আগামী সাত দিনের মধ্যে শান্তনুকে রাজসিংহাসনে আরোহণের অনুষ্ঠানের আয়োজনের নির্দেশ দিলেন।

এক শুভদিনের শুভক্ষণে শান্তনুকে সিংহাসনে বসালেন। প্রতীপ নিজের রাজমুকুট শান্তনুর মাথায় পরিয়ে দিলেন। সোত্সাহে সভাসদদের উদ্দেশে বললেন, ‘আজ থেকে প্রতীপ রাজ্যের নৃপতি হলো শান্তনু। এই হস্তিনাপুরের, শুধু হস্তিনাপুরের কেন সমস্ত করুরাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বিধান করবে শান্তনু। মন্ত্রী-অমাত্যদের কাছে আমার অনুরোধ, আমার এই পুত্রটিকে আপনারা রাজকার্যে যারপরনাই সহযোগিতা করবেন।’ থামলেন একটু প্রতীপ। দম নিয়ে বললেন, ‘আমার কনিষ্ঠ পুত্র বাহ্লিককেও আমি বঞ্চিত করতে চাই না। আজ থেকে সে মহাধিপতি শান্তনুর প্রধান পরামর্শক হিসেবে নিয়োজিত হলো।’

চারদিক করতালিতে ফেটে পড়তে লাগল। বাহবা বাহবা, সাধু সাধু ধ্বনিতে গোটা রাজসভা মুখরিত হয়ে উঠল। ডান হাত ওপর দিকে তুললেন প্রতীপ। বললেন, ‘আমার পুত্রদের দেখবেন আপনারা। কুরুবংশের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্য সদপরামর্শ দেবেন।’ বলে সিংহাসনের পাশ থেকে ত্বরিত নেমে এলেন প্রতীপ। দ্রুত পায়ে রাজকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন।

এরপর থেকে হস্তিনাপুরের কেউ রাজপিতা প্রতীপ বা রাজমাতা সুনন্দাকে দেখেনি।

প্রতিটি রাজবংশের মধ্যে অনেক সদগুণ এবং দু-একটা অপ্রশংসনীয় গুণ থাকে। কুরু বংশধারাও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। এই বংশধারাটির পত্তনের কাল থেকে কুরুরাজাদের মধ্যে মৃগয়াসক্তি প্রবলভাবে বিরাজমান। পূর্বপুরুষদের মতো রাজা শান্তনুও অত্যন্ত মৃগয়াশীল ছিলেন। সময় পেলেই বনে-উপবনে ঘুরে বেড়াতেন রাজা। সঙ্গে তাঁর অস্ত্রশস্ত্র।

মৃগয়ার প্রতি যে রকম আসক্তি, তার কণামাত্র নারী আসক্তি রাজা শান্তনুর মধ্যে দেখা গেল না এত বছর বয়স অবধি। বিশেষ কোনো নারীকে একেবারে নিজের করে পাওয়ার জন্য তেমন কোনো আকুতিও শান্তনুর মধ্যে তৈরি হয়নি এত দিনে।

কিন্তু এক বিষণ্ন বিকেলে শান্তনুর মধ্যে নারী লিপ্সা জাগল। রমণী আশ্লেষের জন্য তাঁর মধ্যে এক গাঢ়-গভীর উতরোল সৃষ্টি হলো।

সামনে দাঁড়ানো দুর্দান্ত সুন্দরীকে উদ্দেশ করে আচমকা বললেন, ‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে রূপময়ী।’

দিব্যভিরণভূষিতা সুন্দরীটি বলল, ‘একটি শর্তে আপনাকে বিয়ে করতে রাজি আমি।’

ম  চলবে ঁঁ

মন্তব্য