kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ জুলাই ২০১৯। ৮ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৯ জিলকদ ১৪৪০

মেলার শেষ সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
একাত্তর ও একজন মা

যুদ্ধের ভেতরে যুদ্ধ

এমরান কবির

১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুদ্ধের ভেতরে যুদ্ধ

একাত্তর ও একজন মা : ইমদাদুল হক মিলন। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : অনন্যা। মূল্য : ৪৫০ টাকা

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বহুমাত্রিক। কিন্তু বড়ই আক্ষেপের বিষয়, এত বড় এক জনযুদ্ধ নিয়ে আশানুরূপ সাহিত্য রচিত হয়নি। তবে এ কথাও ঠিক যে কোনো কোনো লেখকের সব সাহিত্যকর্মের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই জনযুদ্ধ। যেমন—দেশপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের কথাই ধরা যাক। তাঁর সব সাহিত্যকর্মের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ। কি ছোটগল্পে কি উপন্যাসে কি শিশুসাহিত্যে। চলতি বইমেলায় বের হলো আরেকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস একাত্তর ও একজন মা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কথাসাহিত্যে সংযোজিত হলো আরেকটি পালক। এ পালক মুক্তিযুদ্ধের মতোই বহুমাত্রিক। বহুমাত্রিক এর প্রকরণে, বহুমাত্রিক এর বয়ানে, বহুমাত্রিক এর ভাষায়, বহুমাত্রিক এর উপস্থাপনে, বহুমাত্রিক এর  কাহিনিতে।

এত সব বহুমাত্রিকতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যেতে হলে প্রথমে যেতে হবে এর টেক্সটে। শুরুতেই দেখা যাচ্ছে, আনোয়ারা বেগম তাঁর নিজস্ব বয়ানে বলে যাচ্ছেন কথাগুচ্ছ সব। তিনি বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে বলে যাচ্ছেন তাঁর অনুভূতির কথা। বিবরণ দিচ্ছেন, কে কোথায় কী করছে তার কথা। ১০ ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিশাল সংসার তাঁর। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। এরই ভেতর তাঁর স্বামী মারা গেলেন। ঠিক সরাসরি মিলিটারির হাতে গুলি খেয়ে নয়, মিলিটারিরা তাঁকে মারল অন্যভাবে। বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে এসএসসি পরীক্ষার্থী মিলুর হাতে বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ১০ ছেলে-মেয়ের সংসার নিয়ে আনোয়ারা বেগম অথই সাগরে পড়লেন। শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। যুদ্ধের ভেতরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কথাই উপন্যাসজুড়ে। আনোয়ারা বেগমকে যুদ্ধের অভিঘাত যা অভিজ্ঞতা দিল, তিনি তা বর্ণনা করছেন। তরুণ মিলু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে না পারার জন্য মনঃপীড়া নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন। আজাদ বর্ণনা করছেন। মণি বর্ণনা করছেন। এত সব বর্ণনা এমনভাবে আসছে যে এর ভরকেন্দ্রে রয়েছে মুুক্তিযুদ্ধ এবং এর আবহ। জীবনযুদ্ধটা বাদ যাচ্ছে না সেখান থেকে। বয়ানের এই বহুমাত্রিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। প্রকরণের দিকে তাকালে দেখা যাবে, উপন্যাসটি প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে নেই। হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার আলেখ্য। ভাষা হয়ে উঠছে যার যার মতো। আনোয়ারা বেগম বলে যাচ্ছেন তাঁর মতো করে। যখন মিলু বলছেন তখন মিলুর ভাষাই উঠে আসছে। যখন আজাদ বলছেন তখন আজাদের ভাষা। যখন মণি বলছেন তখন মণির ভাষা প্রাধান্য পাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে লেখকের ভাষা কোথায়। উপর্যুক্ত ব্যক্তির মনোভাব ও ভাষা মিলে যা তৈরি হচ্ছে তা-ই লেখকের ভাষা হয়ে উঠছে। এই দিক বিবেচনা করলে এ রকম উপন্যাস বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে কি না সন্দেহ।

মিলু স্বাস্থ্য খারাপের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। কিন্তু পরিণত বয়সে তাঁর যে কাজ, তা ঠিক ঠিক করে ফেলেছেন। সক্রেটিসকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম কী? তিনি বলেছিলেন, নিজের কাজটি ঠিকমতো করে যাওয়া। বলার অপেক্ষা রাখে না, উপন্যাসে পাওয়া মিলু চরিত্রটি লেখক নিজেই। তিনি যুদ্ধে যেতে পারেননি; কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে তিনি আরেক যুদ্ধে নেমেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একের পর এক উপন্যাস লিখে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন।

যা হোক, প্রকরণ ও বয়ানের দিক থেকে বের হয়ে এসে আমরা যদি কাহিনির দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেই ওই সংসারে আরেক যুদ্ধ শুরু হয়। ঘরে দশটি টাকা নেই। খাবার নেই। নিরাপত্তা নেই। এভাবে শুরু হয় বেঁচে থাকার যুদ্ধ। নিরাপত্তার যুদ্ধ। মিলু নিজে সে যুদ্ধের অংশীজন। তরুণ চোখ দিয়ে সে যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন তিনি। তাঁর মায়ের যুদ্ধটাও দেখছেন আঁচল-দূরত্ব থেকে। যখন দেশটাকে কল্পনা করছেন মা হিসেবে, তখন তিনি দেখছেন দুই মায়ের সমান যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা। দুই মায়ের অসহায়ত্বের কথা। আর পরিণত বয়সে তা বয়ান করছেন পরিণত হূদয়ে, পরিণত ভাষায়।

দেশ-মা আর নিজের মায়ের যুদ্ধ মিলু বলে যাচ্ছেন। পাঠকের চোখ জলে ভরে উঠছে। কারণ ওই মা যে সবার মা। কারণ দেশ-মাও যে সবার মা। আর মিলু! মিলু যে স্বয়ং লেখক! আত্মজৈবনিক লেখা তো অনেক হয়। সেখানে হাসি-ঠাট্টা আর মশকরাই যেন প্রাধান্য পায়। যুদ্ধের ভেতরে থেকে এ রকম আত্মজৈবনিক লেখা কয়জন লিখতে পারে! কনফুসিয়াস বলেছেন, যেখানেই যাও হূদয়টা নিয়ে যাও। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন উপন্যাস লিখতে বসে খাঁটি হূদয় নিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন। তবেই না বাংলা সাহিত্যে এ রকম এক বহুমাত্রিক উপন্যাস যুক্ত হলো।

মন্তব্য