kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

মেলার দ্বিতীয় সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
ফেলে যাওয়া রুমালখানি

বিচ্ছুরিত জীবনের নানা রকম প্রতিচ্ছবি

এমরান কবির

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিচ্ছুরিত জীবনের নানা রকম প্রতিচ্ছবি

ফেলে যাওয়া রুমালখানি : ইমদাদুল হক মিলন। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ। মূল্য : ২০০ টাকা

জীবনের নানা দিক থাকে। লেখকজীবনে সেসব দিকের বেশির ভাগই হয়তো অচেনা থাকে। প্রচল ধারাপাতে যাঁরা লেখকজীবন পার করেন, তাঁরা জীবনের প্রচলিত দিকের প্রতিই আলো ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু যাঁরা জীবনের বহুকৌণিক বোধের নিরিখ থেকে বিবেচনা করেন, তাঁরা আলো ফেলেন ভিন্ন দিক থেকে। অনেক সময় এমন দিকে আলো ফেলেন, যেদিকে কেউ কখনো আলোই ফেলেনি। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের ‘ফেলে যাওয়া রুমালখানি’ গল্পগ্রন্থটি পাঠ করতে গিয়ে উপরিউক্ত কথাগুলোই মনে পড়ল। কারণ তিনি গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোতে জীবন, সমাজ ও পরিবারের এমন দিকের প্রতি আলো ফেলেছেন যা সচরাচর গড়পড়তা লেখকরা করেন না। ইমদাদুল হক মিলনের সূক্ষ্ম দৃষ্টি জীবনের সেসব দিকে আলো ফেলল। ফলে বের হয়ে এলো জীবনের অন্য রকম সংকট ও সংবেদ। লেখক ওই সংবেদ ও সংকট তুলে আনলেন।

সমাজের উপরিকাঠামোর বিবেচনায় আলোচ্য গ্রন্থের ছয়টি গল্প একই রকম সমাজকাঠামোর নয়। ছয় গল্পের লোকজন ছয় ধরনের বৃত্তীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদের গল্পও ছয় ধরনের। সংকট ও সংবেদনও ছয় রকমের। এ দিক বিবেচনা করলে পাঠক ছয় ধরনের গল্প পড়ার সুযোগ পাবেন। কারণ বৃত্তীয় কাঠামো যখন ভিন্ন হয়, তখন তাদের সংবেদ ও সংকটও আলাদা স্তরের হয়। লেখক সুচারুরূপে সেসব ঘটনা তুলে আনেন।

যেমন প্রথম গল্পের কথাই ধরা যাক। ‘মতিন সাহেবের মা’ শিরোনামীয় গল্পটির শুরু মতিন সাহেবের অসুস্থতা দিয়ে। হঠাৎ তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হয়। সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল। নিয়ম মেনে হেঁটেছেন। ওষুধ খেয়েছেন। তার পরও নাশতার পর ব্যথা শুরু হলো। তাঁর প্রেসারের সমস্যা, হার্টের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এবং ডায়াবেটিস। এ অবস্থায় বুকে ব্যথা শুরু হওয়া মানে খুব খারাপ কিছু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। পাঠকও যেন প্রস্তুত সে ধরনের খারাপ কিছু হয়ে যাওয়ার কথা দেখা যাবে গল্পের শেষে। মতিন সাহেবের যৌথ পরিবার। তিনি নিষেধ করেন তাঁর মাকে যেন এ সংবাদ না দেওয়া হয়। তিনি কষ্ট পাবেন। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাবেন। পরিবারের সবাই তখন মতিন সাহেবকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করলে মতিন সাহেব তাঁর মায়ের কাছে যান। মা তখন বুকে হাত বুলিয়ে দেন আর বারবার বলেন, তোমার কিছু হয় নাই। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। মিনিট পনেরো পর দেখা যায় তিনি একেবারে সুস্থ।

ছোট এই ছোটগল্পে নানা বিষয়ের ইঙ্গিত দেন লেখক। যেমন যৌথ পরিবারে থাকলে নানা রকম মতামত আসে। সবার সহযোগিতা পাওয়া যায়। ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকেও গল্পটি সফল। কারণ পাঠক যে আশঙ্কা করে, লেখক সে আশঙ্কা দিয়ে গল্পের উপসংহার টানেন না। তা করতে গিয়ে তিনি মায়ের হাতের স্পর্শে সন্তানের বুকের ব্যথা সেরে যাওয়ার মতো প্রায় অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করেন। আমাদের বাস্তবের ভেতরে কিছু জাদুময়তা বিরাজ করে। সেই জাদুময়তার কেন্দ্রে থাকে তীব্র ভালোবাসা। এই তীব্র ভালোবাসা যাঁরা ধারণ ও লালন করেন তাঁদের দ্বারা এ রকম প্রায় অলৌকিক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আলোচ্য গল্পে লেখক সেটিই দেখিয়েছেন।

অন্য গল্পগুলোও ভিন্ন বিষয় ও মাত্রিকতায় উজ্জ্বল। বহু বছর পর প্রয়াত বাবার ঋণ করে যাওয়ার কথা স্মরণে আসার পর বন্ধুর জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। গ্রামের নির্জন কবরস্থানে পড়ে থাকা জ্যান্ত শিশুকে গল্প, প্রেমাষ্পদের ফেলে যাওয়া একটি রুমাল নিয়ে এত তরুণীর সারা জীবন পার করে দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মর্মন্তুদ গল্প। এ রকম ছয়টি বিষয় নিয়ে ভিন্ন মাত্রায় গল্প বলে যান কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।

জীবনের যেমন নানা রকম দিক থাকে, থাকে রহস্য। গল্পের মধ্যেও নানা রকম দিক থাকে, থাকে রহস্য। কথাসাহিত্যিক  ইমদাদুল হক মিলন জীবন ছেঁকে ওই নানা রকম দিক ও রহস্য তুলে আনেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা