kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

মেলার দ্বিতীয় সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
গণতন্ত্রের অভিমুখে

গণতন্ত্রের দিকে যেতে হলে সাম্য ও স্বাধীনতার প্রয়োজন অনিবার্য

শ্যামল চন্দ্র নাথ

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গণতন্ত্রের দিকে যেতে হলে সাম্য ও স্বাধীনতার প্রয়োজন অনিবার্য

গণতন্ত্রের অভিমুখে : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ২০০ টাকা

সাম্য ও স্বাধীনতা নির্মাণে যিনি স্বপ্ন দেখেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি আমাদের বাতিঘর। এবারের একুশের গ্রন্থমেলায় উন্মোচিত হয়েছে তাঁর বয়ানসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘গণতন্ত্রের অভিমুখে’। এ গ্রন্থে তিনি গণতন্ত্রকে দেখাতে চেয়েছেন সমাজ, ইতিহাস ও দর্শনের আলোয়। যদিও গণতন্ত্রের কথা সবাই বলেন, তবে গণতন্ত্রের দাবিও প্রায় সর্বজনীন। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা সব সময় যে পরিষ্কার থাকে তা নয়। আসলে গণতন্ত্র হচ্ছে তেমন এক ব্যবস্থা, যেখানে সদস্যদের ভেতরে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণটা চলে যাবে যথার্থ জনপ্রতিনিধিদের হাতে। গণতন্ত্রের অভিমুখে এগিয়ে যাওয়াটা সহজ নয়; কিন্তু এগিয়ে যাওয়াটা খুবই জরুরি। গণতন্ত্রের দিকে যেতে হলে আন্দোলন চাই এবং অন্দোলনের জন্য সংগঠন দরকার। এসব কথাই এ বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে বিভিন্নভাবে এসেছে। গণতন্ত্র যে শুধু ভোট নয়, যদিও গণতন্ত্রের জন্য ভোট দরকার, এ সত্যটাও ভুললে চলবে না। শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরো যোগ করেন—বাংলাদেশে এখন আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়ছি। বুর্জোয়া ধরনের গণতন্ত্র পেলেও আপাতত চলবে, বলছি আমরা। তার চেয়ে বেশি আশা করে লাভ নেই, আসে যদি আসবে ধাপে ধাপে; কিন্তু তা-ও আসে না। বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পতনের স্তরে রয়েছে, এমনকি নির্বাচনও। নির্বাচন হবে কি না, হলেও তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা যদি পায়ও, তবু কত দিন টিকে থাকবে মধ্যবর্তী অভ্যুত্থানের পূর্বে—এ সবই প্রশ্ন বটে, তবে কোনো একটি সরকার নির্বাচনের পথ ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলেই যে দেশে গণতন্ত্র এসে যাবে, এমনও বলার উপায় নেই। কেননা গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সেই অধিকার প্রয়োগ করে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ উন্নত জীবন সম্ভব করে তোলা। সে ব্যবস্থা আসবে না, যদি গোটা ব্যবস্থা না বদলায়; এমনকি বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আশাও ক্ষীণ, খবরে দেশে নদীর মতো গণতন্ত্র না আসার পথে প্রতিবন্ধক এক নয়, অনেক কিছু তাদের সাধারণ হয়তো। যা বলা যাবে সর্বজনীন, আর কিছু স্থানীয়, বাংলাদেশের নিজস্ব। মুক্ত ঘটনা অবশ্য একই, বহুর সঙ্গে অল্পের স্বার্থগত বিরোধ। প্রতিবন্ধকগুলোতে কয়েকটির ওপর আলোকপাত এবং সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের অভিমুখে পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আমাদের নিজের অর্জনগুলো রয়েছে তাদের চিহ্নিত করাই এসবের উদ্দেশ্য। সে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে বেরিয়ে এসেছে সেটি এই যে গণতন্ত্রের লড়াই আর সমাজতন্ত্রের লড়াই ভিন্ন নয়। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিশ্বাস করা সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র একই এবং অভিন্ন। এ বইয়ে ১৬টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়-শৈলীর মধ্য দিয়ে। তাই আমি বলি, বারবার বলি সিরাজুল ইসলামের সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো বিরোধ নেই; বরং রয়েছে এক ও অভিন্ন সম্পর্ক। এ সম্পর্ক বিচ্ছেদের নয়, মিলনের। গণতন্ত্রের দিকে যেতে হলে সাম্য ও স্বাধীনতার প্রয়োজন অনিবার্য।

কিন্তু ‘অ্যারিস্টটল কি ভ্রান্ত?’ এ প্রবন্ধ পড়তে পড়তে গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের ভিন্ন ধারণার মধ্যে চলে যেতে হবে। এ কারণে যে অ্যারিস্টটল বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে গরিবতন্ত্র। কথাটা নিশ্চয় ভুল না হলে পরে সঠিক। আরো এক ধাপ এগিয়ে প্লেটো বলেছিলেন, গণতন্ত্র হলো ‘মূর্খতন্ত্র’। গণতন্ত্র হচ্ছে মূর্খদের রাজত্ব। বেশির ভাগ লোকই মূর্খ, গণতন্ত্রের অছিলায় এই মূর্খরাই রাজত্ব কায়েম করে। গুরু প্লেটোর এই কথার সঙ্গে শিষ্য অ্যারিস্টটলের বক্তব্যের তফাত আছে। সেই তফাতটা শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে আছে। আছে এ জন্য যে তিনি যে গণতন্ত্রকাঠামোর কথা ভাবেন তার চিন্তার পথটা ভিন্ন। তাই উভয়ের মুক্তির জন্য, শ্রেণিবৈষম্য দূর করার জন্য শোষণহীন, সাম্যতা নির্ভর সমাজতন্ত্র আমরা চাই অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের চিন্তার মতো এবং যদি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তা সম্ভব হয়, তাহলেই শুধু মুক্তি ঘটবে, না হলে নয়। নয় এ জন্য যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার আন্দোলন। জনগণের আন্দোলন মুক্তির লক্ষ্যে। সেই আন্দোলনকে একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হতে হবে এবং তার সামনে থাকা চাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা