kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বই আলোচনা

‘বেড়াই ঢাকা’ গ্রন্থটি নিয়ে যাবে অতীতে

শ্যামল চন্দ্র নাথ   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



 ‘বেড়াই ঢাকা’ গ্রন্থটি নিয়ে যাবে অতীতে

বেড়াই ঢাকা : মোহা. মোশারফ হোসেন, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রকাশক : পড়ুয়া, ২০১৮। প্রচ্ছদ : আনওয়ার ফারুক। মূল্য : ৩০০ টাকা

আমরা অনেকেই অবগত আছি যে সুদূর অতীতের ঢাক্কা বর্তমানে মহানগরী ঢাকা। সেই ঢাক্কা থেকে কিভাবে ঢাকায় রূপান্তরিত হলো, তারই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিক বর্ণনার যে প্রতিরূপ, তা ‘বেড়াই ঢাকা’ বইয়ে লেখকদ্বয় বিস্তারিত বলার চেষ্টা করেছেন। বলার এই চেষ্টা বলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। একাত্তরের বাংলাদেশের রাজধানী হলো ঢাকা। সেই ঢাকারই কোথায় দেখার মতো কী আছে? কেন দেখব? দেখে কী জানব? কত দিনের প্রাচীন এর ইতিহাস? কারা বাস করত এবং আজ কারা বাসিন্দা? এসব প্রশ্ন যাতে সহজে ও একনাগাড়ে পাঠক উপলব্ধি করতে পারে, তারই সার্থক প্রচেষ্টা এ বই। এ বই পড়তে পড়তে মনে হলো, এ বই গবেষণাধর্মী নয়; বরং মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন পরিদর্শনের বিবরণমূলক উপস্থাপন। তবে কিছু কিছু বিবরণের পরস্ফুিটনের প্রয়োজনে অনিবার্য হয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজন হয়েছে পুরাতাত্ত্বিক ও শ্রুতি-কাহিনির সহায়তা। একইভাবে এতে এসেছে ভূগোল, জীববৈচিত্র্য, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি শাস্ত্রের অনুষঙ্গ। তাই আমি বলতে পারি, গ্রন্থটি একটি বহুমাত্রিকতার মিশেলজনিত ফলও বটে। এ ছাড়া আমরা দেখি, আমাদের দেশ ক্রমেই দুরন্ত গতিতে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে চলেছে। তাই প্রতিনিয়ত ঘটছে পরিবর্তন। দুটি ভাগে বিন্যস্ত হয়েছে এর পরিসর। প্রথম অধ্যায়ে আছে ডবক থেকে ডাক্কা, ডাক্কা থেকে ঢাকায় রূপান্তরের ইতিহাস এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে ক্রমপরিবর্তিত হয়ে আসা মহানগর ঢাকার কথা। প্রথম অধ্যায়ে দেখি, ডবক কিভাবে আস্তে আস্তে ঢাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। ‘ডাকা নামটির উত্পত্তির ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রে যাঁরা নিয়োজিত, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ ঋদ্ধজন সমুদ্রগুপ্তের (খ্রি. ৩৫০-৭৬) এলাহাবাদ পাথুরে স্তম্ভের প্রশস্তিতে উল্লিখিত ডবক নামের প্রান্তীয় অঞ্চলকে ঢাকা গণ্য করে থাকেন। তাঁদের অভিমত অনুযায়ী ঢাকা নামটি ওই ডবকের সরল কথ্যরূপ। এই অভিমত সত্য বলে ধরে নিলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে তত্কালে নিদেনপক্ষে সাড়ে ষোলো শ বছর আগে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পুব প্রান্তে ঢাকা নামে একটি রাজ্য ছিল এবং সেই রাজ্যের নরপতি গুপ্ত সাম্রাজ্যের আনুগত্যাধীন মিত্র ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে এর বেশি বৃত্তান্ত অবগত হওয়ার উপযোগী সূত্র এযাবত্ আবিষ্কৃত হয়নি। সুদীর্ঘকাল পরে ১১৪৯-১১৫০ সালে কাশ্মীরের দরবারি কবি কলহনর রাজতরঙ্গিনীতে ঢাকা নামের উল্লেখ দেখা যায়। আফগান ভাষায়ও ঢাক্কা শব্দটি অনুরূপ অর্থে ব্যবহূত হয়ে থাকে। এতদ্সত্ত্বেও ঢাকা নামের উত্পত্তি নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে নানা গপ্প প্রচলিত রয়েছে; যেমন—ঢাক বাজনার আওয়াজ থেকে ঢাকা, ঢাকেশ্বরী নামের দেবী থেকে ঢাকা, ডাক নামের গাছের প্রাচুর্য থেকে ঢাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। পড়তে পড়তে আরো দেখি যে এই বইয়ে যেটি স্থান পাওয়ার কথা, কিন্তু পায়নি; সেটি হলো, ডবকবাসীদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়। ইতিহাসের অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায়, খ্রি. বার শতক থেকে এ অঞ্চলে দক্ষিণ ভারত থেকে একের পর এক বর্মণ ও সেনবংশীয় যোদ্ধাদের সঙ্গে এসেছিল উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বহু ভাগ্যসন্ধানী সৈনিক।  দ্বিতীয় অধ্যায়ে চোখ বোলালে দেখতে পাই মহানগরী ঢাকার কথা। আমরা দেখি যে ‘বায়ান্ন হাজার তেপান্ন গলি’, ‘প্রাচ্যের রহস্যনগরী’ এবং পূর্বাঞ্চলীয় ‘ভেনিস’ পদবিপ্রাপ্ত তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীঘেরা অতীতের সে ঢাকা শহর ক্রমেই নতুনরূপে আবির্ভূত হচ্ছে। লেখকদ্বয় মোহা. মোশারফ হোসেন এবং মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সে কাজটি করে গেছেন নানা ঐতিহাসিক ও প্রাচীন স্থাপনার বর্ণনা ও চিত্র সমৃদ্ধায়নের মাধ্যমে। তাই আমার মনে হয়, বইখানি একদিকে যেমন নস্টালজিয়ায় ফেলবে; অন্যদিকে এটি নিয়ে যাবে অতীতে। আর এই অতীতের গুরুত্ব এই যে এটি একদিকে ইতিহাসের কথা বলবে, অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা