kalerkantho

শনিবার । ২৬ নভেম্বর ২০২২ । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে আলামিন ও তাঁর স্ত্রী শিউলিকে সহায়তা

সেলাইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনছেন শিউলি

♦ বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় কেটে ফেলতে হয় দুটি হাত
♦ কিনে দেওয়া হয়েছিল তিনটি ছাগল ও পাঁচটি করে হাঁস-মুরগি
♦ দোকানে নতুন করে অনেক মালপত্র কিনে দেওয়া হয়েছিল
♦ শিউলিকে কিনে দেওয়া হয়েছিল একটি নতুন সেলাই মেশিন

সুচিত্রা পূজা   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সেলাইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনছেন শিউলি

দুর্ঘটনায় এক যুবকের দুটি হাতই কাটা গেছে। দুই বছর হলো বিয়ে করেছেন তিনি। টুকিটাকি বিদ্যুতের কাজ করে ভালোই চলছিল সংসার। নতুন বউ, ১১ মাসের ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান নিয়ে সুখেই কাটছিল আলামিনের দিনগুলো।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি তাঁর। একটি দুর্ঘটনা আলামিনের জীবনে নিয়ে আসে ঘোর অন্ধকার। কেটে ফেলতে হয় দুটি হাত। ঘটনাটি পাবনা সদর উপজেলার চর বাঙ্গাবাড়িয়া এলাকার। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় ফেব্রুয়ারি মাসে কম্বল বিতরণ প্রগ্রামে আলামিন এসেছিলেন সহায়তা নিতে। শুভসংঘের বন্ধুরা সে সময় তাঁর খোঁজ পান।

দুটি হাত নেই, কাজ করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। ঠিক তখনই তাঁর পাশে দাঁড়ায় শুভসংঘ। পাবনা জেলা শুভসংঘের উদ্যোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে আলামিন ও তাঁর স্ত্রীকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করা হয়। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে আলামিনের স্ত্রী শিউলিকে একটি সেলাই মেশিন, তিনটি ছাগল ও কয়েকটি করে হাঁস-মুরগি কিনে দেওয়া হয়। আলামিনের জন্য এলাকাবাসী আগে একটি দোকান করে দিয়েছিল। সেখানে মালপত্র তেমন কিছুই ছিল না। সেই দোকানের জন্য মালপত্র কিনে দেওয়া হয় বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে। এরপর কেটে গেল ছয় মাস। কেমন আছে আলামিন ও তাঁর পরিবার, এটা দেখতে চর বাঙ্গাবাড়িয়া যায় শুভসংঘের টিম। বাড়িতে ঢোকার আগেই আলামিনের দোকান। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে কাটা হাত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ক্রেতারা এসে নিজেই দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যাচ্ছে। কত টাকা হয়েছে জিজ্ঞেস করে দাম মিটিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ আবার নিজেই কাপে গরম পানি ও টি-ব্যাগ নিয়ে চা বানিয়ে খাচ্ছে। আলামিনের কাজ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা। তবু এতেই তিনি খুব খুশি। জীবনের একটা গতি তো হলো। এক কাপ করে চা খেয়ে শুভসংঘের বন্ধুরা এগিয়ে যান আলামিনের বাড়ির দিকে। কাছে যেতেই পাওয়া গেল সেলাই মেশিনের আওয়াজ। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখা যায় মেয়ে বিছানায় বসে খেলা করছে। ঘরের এক কোণে সেলাই মেশিনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন শিউলি, যেন সেলাইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনছেন তিনি। ঘড়ির কাঁটা থেমে নেই। প্রতিটি মুহূর্তকে রাঙিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবনসংগ্রাম। এই সংগ্রামের গল্প মানুষভেদে নানা রকম। আলামিন আর শিউলি বোধ হয় জীবনসংগ্রামের প্রকৃত যোদ্ধা।

পরিবারের নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও স্ত্রী শিউলি হাল ছেড়ে দেননি। আলামিনকে ভাত খাওয়ানো থেকে শুরু করে তাঁর যাবতীয় কাজ একা হাতে করছেন। এলাকাবাসীর সহায়তায় গড়ে তোলা ছোট্ট দোকান থেকে আসা অল্প আয়ে কিছুতেই সংসার চলত না। স্ত্রী আর দুই বছরের মেয়ে মাইশাকে নিয়ে অসহায় জীবন চলছিল তাঁর। তাঁদের এই অসহায়ত্ব দূর করতে পাশে দাঁড়িয়েছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প পরিবার বসুন্ধরা গ্রুপ। হাঁস-মুরগি-ছাগল পালন, সেলাই মেশিনের কাজ, কাঁথা সেলাই এবং মুদি দোকানে বেচাকেনার মাধ্যমে এখন বেশ আরামেই চলছে তাঁদের জীবন। আগের সেই দুঃখ-দুর্দশার চিন্তার ছাপ আর ভেসে ওঠে না আলামিন ও তাঁর স্ত্রীর চোখেমুখে।

সকাল হতেই আলামিন চলে যান দোকানে। বাড়িতে ব্যস্ততার সঙ্গে পালন করছেন হাঁস-মুরগি-ছাগল শিউলি। সেই সঙ্গে পুরোদমে চলছে সেলাইয়ের কাজ। ছেলেমেয়েদের জামাকাপড় সেলাই করে বেশ সাড়া পেয়েছেন এলাকায়। রোজই বাড়ছে ক্রেতাদের আনাগোনা। সেই সঙ্গে তাঁর নকশি কাঁথার চাহিদারও কমতি নেই। দুই বছরের মেয়ে মাইশাও এখন আগের থেকে বেশ হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। পরিবারের সবাই তিন বেলা ভালোভাবে খেতে পারছে। সেলাইয়ের ফাঁকেই শুভসংঘের সদস্যদের কথা চলতে থাকে শিউলির সঙ্গে। উঠে আসে এখনকার সুখী জীবনের নানা গল্প। আর বসুন্ধরা গ্রুপের, শুভসংঘের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা বারবার বলতে কোনো কার্পণ্য করছেন না তিনি। শিউলি বলেন, ‘মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় শুনেছি অনেক। নিজেদের ভাগ্য এভাবে পরিবর্তন হবে, এমন বিশ্বাসই ছিল না। খালি মনে হতো এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল। এখন বুঝতে পারছি কিছুই শেষ হয়ে যায়নি। নতুন করে আমাদের বাঁচার পথ তৈরি করে দিল বসুন্ধরা গ্রুপ। সারা জীবনেও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা শেষ হবে না। আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন—এই দোয়া করি। ’

মেয়েকে কোলে নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন আলামিন। কনুই পর্যন্ত দুই হাত নেই, তবু কী আশ্চর্য রকমভাবে মেয়েকে কোলে নিয়ে রেখেছেন। বাবারা বোধ হয় এমনই। ছয় মাস আগে দেখা আলামিনের সেই করুণ মুখখানির কথা মনে হলো। আজ সেই ছাপ নেই একদমই। সুন্দর একটা হাসি লেগেই আছে। কালের কণ্ঠ শুভসংঘ আর বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি তাঁরও অশেষ কৃতজ্ঞতা বোধ। তিনি বলেন, ‘দুটি হাত কেটে ফেলার পর মনে হয়েছিল, জীবন বুঝি এখানেই থেমে গেল। আল্লাহর রহমতে সেটা হয়নি। আপনারা এগিয়ে এসেছেন। আমাকে নতুন করে বাঁচার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা এখন বেশ ভালো আছি। ’

 



সাতদিনের সেরা