kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো যুবককে সহায়তা

অন্ধকার হৃদয়ে জ্বলল আলো

♦ এক মাসের খাদ্য সহায়তা
♦ নতুন দোকান ও মালপত্র প্রদান

রানা মিত্র   

১৩ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অন্ধকার হৃদয়ে জ্বলল আলো

সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারানো হৃদয়

২০ কি ২২ বছরের টগবগে যুবক হৃদয়। কর্ণফুলী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম শিকলবাহার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করে। ছোটবেলায় কোনো কিছু বুঝতে শেখার আগেই মা-বাবাকে হারায় সে। মা-বাবা হারানোর শোক তখনো বুঝে উঠতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

মা-বাবা হারিয়ে নানাবাড়িতে আশ্রয় মেলে হৃদয় ও তার বোনের। আপনজন বলতে শুধু এই বোনটিই। নানা-নানির অভাবের সংসারে পড়াশোনাটা করা হয়নি অভাগা হৃদয়ের। একটু বড় হতেই জীবিকার তাগিদে ছুটে যেতে হয় নানা কাজে। সব শেষে একটি বাসে হেলপারের কাজ নেয়। যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনো রকমে চলে যাচ্ছিল জীবন। বোনকে নিয়ে বেশ ভালোই চলছিল সে। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুরতম একটি ঘটনা হঠাৎই হৃদয়ের জীবনটা অন্ধকার করে দেয়। বাস নিয়ে একটি ট্রিপে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত হয়। বেশ আঘাত পায় হৃদয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তারের পরামর্শে একটি পা কেটে বাদ দিতে হয়। একটি আলোকিত হৃদয় হঠাৎ করেই যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। পরম করুণাময়ের লিখন খণ্ডাবে কে? ললাটে হয়তো এটিই লেখা ছিল। যে দুই পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে হৃদয় তার ছোট বোনটির মুখে খাবার তুলে দিত, সেখানে আজ এক পায়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। তা-ও আবার ক্রাচে ভর করে। এত কিছুর পরও করুণাময়ের কাছে কোনো অভিযোগ নেই হৃদয়ের। জীবনস্রোতের বিশাল বাধার বিপরীতে আবারও উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে সে। তার এই চেষ্টা আলেয়ার সব বাধা ডিঙিয়ে আলোয় ফেরার।

সম্প্রতি সেই আলোর পথের সহযাত্রী হয় শুভসংঘ কর্ণফুলী উপজেলা শাখা। হৃদয়ের সব কথা জানতে পেরে তার বাসায় এক মাসের বাজার নিয়ে ছুটে যান শুভসংঘের বন্ধুরা। তাঁদের সঙ্গে পেয়ে জীবনে নতুন করে আলোর প্রদীপ জ্বালানোর আশা খুঁজে পেল হৃদয়। শুভসংঘের বন্ধুরা ঠিক করলেন, যেভাবেই হোক হৃদয়কে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। যে কথা সেই কাজ। সবার সহযোগিতায় হৃদয়কে ছোট একটি দোকান করার জন্য কিনে দেওয়া হলো ভ্যানগাড়ি, যেখানে মালপত্র রেখে বিক্রি করবে সে। সেই ভ্যানগাড়িটির জন্য কিনে দেওয়া হলো মালপত্রও, যেগুলো বিক্রি করে হৃদয় অন্তত তার সংসার চালাতে পারবে। হৃদয় যেন এটিই চেয়েছিল। এই সমাজের কাছে সে বোঝা হতে চায়নি। ভ্যানগাড়িটি পেয়ে যেন জীবনে নতুন করে দাঁড়ানোর খুঁটি পেল সে। অশ্রুভেজা চোখে শুভসংঘের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হৃদয় বলে, ‘আপনারা আজ আমাকে দাঁড় করালেন। মনে হচ্ছে নতুন জীবন পেলাম। দুর্ঘটনার পর থেকে বেঁচে আছি না মরে গেছি বুঝিনি। আপনাদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার ছোট বোনটির মুখে অন্তত আহার তুলে দিতে পারব। ধরেই নিয়েছিলাম, আমি আর কোনো দিন কিছু করতে পারব না। আপনারা আজ আমাকে নতুন করে বাঁচার অবলম্বন দিলেন। ’ কথাগুলো বলতে বলতে হৃদয়ের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল আনন্দের অশ্রু। জীবনের সব পরীক্ষায় বারবারই ভাগ্যের কাছে হারতে হয়েছে তাকে। আজ যেন আবার ভাগ্য তার দিকে মুখ ফিরে চেয়েছে।

শুভসংঘ কর্ণফুলী উপজেলা শাখার সভাপতি শারমিন মনি বলেন, ‘সব সময়ই আমাদের চেষ্টা থাকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। হৃদয় আসলেই খুব অসহায় হয়ে পড়ছিল। তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে। আমরা চেয়েছি হৃদয় যাতে স্বাবলম্বী হয়। পরম করুণাময়ের ইচ্ছায় আমরা সেটা করতে পেরেছি। শুভ কাজে সবার পাশে থাকার প্রত্যয় নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। যাঁরা আমাদের এই কাজে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। শুভসংঘ এখন দেশের এমন হাজারো হৃদয়ের বেঁচে থাকার অবলম্বন হতে কাজ করছে। এমন করেই সারা দেশের অসংখ্য হৃদয়ে বেঁচে থাকার প্রদীপ জ্বালাবে শুভসংঘ। ’



সাতদিনের সেরা