kalerkantho

শনিবার । ২৫ জুন ২০২২ । ১১ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৪ জিলকদ ১৪৪৩

বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তা

এক মাসের খাবার পেলেন রিকশাচালক মনু মোল্লা

♦ বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় মনু মোল্লাকে চাল, ডাল, তেল, নুন, আটা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতি প্রদান করা হয়
♦ আমি বসুন্ধরা গ্রুপের সকলকে প্রাণভরে দোয়া করি : মনু মোল্লা

গৌরাঙ্গ নন্দী   

২৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক মাসের খাবার পেলেন রিকশাচালক মনু মোল্লা

প্রতিবন্ধী মনু মোল্লাকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে শুভসংঘ খুলনা জেলা শাখা

ট্রেন দুর্ঘটনায় ডান পা ঠিক হাঁটুর নিচ থেকে কাটা পড়ে মনু মোল্লার। প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তবে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। এক পায়ে সব কাজ করা যায় না। এ কারণে তিনি এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

একটানা আট বছর ভিক্ষাবৃত্তি করেছেন। তবে তা দেশে নয়, বেশির ভাগ সময়ই বিদেশে, মানে ভারতে। এখন আর তা করেন না, বাদ দিয়েছেন। কাটা পায়ের খণ্ডিত অংশটুকুতে একটি প্লাস্টিকের পা লাগিয়েছেন, তাতেই কোমর সোজা করে মাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারেন। রিকশা চালান। খুব কষ্ট হয়, আয় হয় অতি সামান্য। কিন্তু পোষ্য অনেক।

মনু মোল্লার বাড়ি খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলায়। থাকেন খুলনা শহরের বাগমারায়। নিত্য অভাবের সংসারের জোয়াল টানতে টানতে তিনি ক্লান্ত। শারীরিক অক্ষমতা তাঁর এই ক্লান্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। প্রতিদিন রিকশা নিয়ে বেরোতে পারেন না। আবার ঠিকমতো ভাড়াও হয় না। দুই দিন আগে রিকশা চালাতে গিয়েছিলেন। সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে মাত্র ১০০ টাকা আয় করেছেন। নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। করোনাকালেও আয় ছিল না, মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করে টিকে ছিলেন। এখন সেই সহায়তা অব্যাহত নেই। ফলে তিনি খুবই অসহায় বোধ করছিলেন। এমন সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয় শুভসংঘের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে।

শুভসংঘ খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামানের সঙ্গে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয় দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরার পক্ষ থেকে মনু মোল্লাকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। সহায়তাটি এমন হবে, যাতে ওই পরিবারটির অন্তত মাসখানেকের জন্য বাজারের চিন্তা না করতে হয়। এই ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে শুভসংঘ খুলনা শাখার আবু সাইদ খান, কাজী মাহবুব রহমান, রাজীব সরকার রাহুল, চিরঞ্জিত সরকার ও বিশাল কাজ শুরু করেন। সম্প্রতি খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল, তেল, নুন, আটা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতি) নিয়ে তাঁরা হাজির হন খুলনা নগরের বাগমারা ব্রিজের কাছে মনু মোল্লার ভাড়া বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন কালের কণ্ঠ খুলনা ব্যুরো প্রধান ও সিনিয়র রিপোর্টার গৌরাঙ্গ নন্দী।

একজন আইনজীবীর জমি সেটি। সেখানেই ছোট ছোট অনেক ঘর। জ্যৈষ্ঠ মাসের ঠা ঠা রোদের মাঝেও বাড়িটির একাধিক কোণ পানিতে সয়লাব। জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ছোট ছোট ঘরের সারি। ঠিক যেন বস্তি ঘর। ঘরের পাশেই পয়োনিষ্কাশনের জায়গা। বাড়িতে প্রবেশ করে এঁকেবেঁকে বেশ খানিকটা এগিয়ে মনু মোল্লার ঘর পাওয়া গেল। ১০ হাত প্রস্থ, ১৫ হাত লম্বা ঘরটির মেঝেতে ইট বসানো হলেও তা স্যাঁতসেঁতে। এক কোনায় দরজা। টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া দেওয়া এই ঘরটির ভাড়া দিতে হয় মাসে এক হাজার ৫০০ টাকা।

বসুন্ধরার খাদ্য সহায়তা নিয়ে মনু মোল্লার দরজার সামনে হাজির হতেই তাঁর মুখে হাসির ঝিলিক ওঠে। শুভসংঘের বন্ধু বিশালকে দেখেই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর পরিবারের জন্যই এই সহায়তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশালের সঙ্গে আগে মনু মোল্লার কথা হয়েছিল। বিশাল তাঁকে বলেছিলেন, আলোচনা করে দেখি আপনাকে কিছু খাদ্য সহায়তা করা যায় কি না। এক দিন আগে এসব কথাবার্তা। পরদিন চাল ও বস্তা ভর্তি অন্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে সবাই তাঁর দরজার সামনে হাজির। তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় খাদ্যসামগ্রী। তাঁর পা হারানোর কথা, পরিবারের অবস্থা নিয়ে কথা হয়। খাদ্য সহায়তা পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি কাজী মাহবুবকে বলেন, ‘আমি বসুন্ধরা গ্রুপের সবাইকে প্রাণভরে দোয়া করি। ’ 

মনু মিয়া বলেন, ‘আমার ছয়টি সন্তান। চার মেয়ে ও দুই ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। বড় মেয়েটি তার স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় আমার কাছে চলে আসে। সেই মেয়েটিও মারা গেছে। মেয়েটির চারটি সন্তান আমার গ্রামের বাড়ি তেরখাদায় থাকে। ছেলে দুটি দিনমজুরের কাজ করে। খুলনার বাসায় ছোট ছেলেটিকে নিয়ে আমরা স্বামী-স্ত্রী মোট তিনজন থাকি। ’ দিনমজুরি, রিকশা চালানো প্রভৃতি কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।

১৯৮৯ সালে ট্রেন দুর্ঘটনায় ডান পা কাটা পড়লে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। স্বাভাবিক কাজকর্ম করা খুবই অসুবিধাজনক হয়। বেছে নিয়েছিলেন ভিক্ষাবৃত্তির জীবন। নিজের শহর খুলনায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করা দুরূহ হবে ভেবে চলে যান ভারতে। গুজরাট, দিল্লি প্রভৃতি এলাকায় ভিক্ষা করেছেন। সেই ভিক্ষাবৃত্তির টাকায় পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। এখন রিকশা চালান ঠিকই, কিন্তু সামর্থ্যহীনতা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।



সাতদিনের সেরা