kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো লায়লার পরিবারে খাদ্য সহায়তা

তারাগঞ্জ শাখার সহায়তা

এনামুল হক দুখু   

১৪ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো লায়লার পরিবারে খাদ্য সহায়তা

কুর্শা কাজীপাড়া গ্রামের লায়লা বেগমকে তারাগঞ্জ শুভসংঘের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা কাজীপাড়া গ্রামের ফকিরা ইসলামের স্ত্রী লায়লা বেগম (২৫)। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁদের সংসার। বছরখানেক আগের কথা। পারিবারিক কাজে লায়লা বেগম রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক দিয়ে ভ্যানে করে এক জায়গায় যাচ্ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তারাগঞ্জ উপজেলা সংলগ্ন এলাকায় আনজিরননেছা কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সামনে একটি মাইক্রোবাস তাঁর ভ্যানটিকে ধাক্কা দেয়। রাস্তা থেকে ছিটকে পাশের একটি খাদে পড়ে যায় ভ্যানটি। লায়লা বেগমের একটি পা ভেঙে যায়। অবস্থা খারাপ দেখে সঙ্গে সঙ্গেই রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। চিকিৎসকরা তাঁর একটি পা কেটে ফেলেন। অল্প বয়সে পঙ্গুত্ববরণ করে স্বামীর সংসারে একপ্রকার বোঝা হয়ে যান লায়লা। অভাবের সংসারে যে সামান্য অর্থ ছিল, লায়লার চিকিৎসা করাতে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় ফকিরার পরিবার। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছিল পরিবারটি। অভাবের সংসারে নিজের সম্পত্তি বলতে বাড়ির ভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই তাদের। অন্যের জমিতে মজুরির কাজ করেন ফকিরা। বাইরে থেকে ভাঙা টিনের ঘরের ভেতরে কোনো রকম শুয়ে থাকার জন্য একটি চৌকি রয়েছে, তা স্পষ্ট দেখা যায়। ঘরের ভেতরে আর কিছুই চোখে পড়েনি। ভাঙা ঘরে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কোনো রকম দুঃখ-কষ্টে চলে লায়লার জীবন। কষ্ট করে এক বেলা খেলে আর পরের বেলা ভাত যায় না তাঁদের পেটে। ছোট দুটি বাচ্চা খিদে পেলেই দৌড়ে আসে মায়ের কাছে। খেতে চায় পেট ভরে দুমুঠো ভাত। স্বামী-সন্তান নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকবেন। কী খাবেন? এসব চিন্তা করেন আর কাঁদেন লায়লা। পানি পড়তে পড়তে চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে তাঁর।

সম্প্রতি এই পরিবারের খোঁজ পান শুভসংঘ তারাগঞ্জ উপজেলা শাখার বন্ধুরা। তাদের অবস্থার কথা জেনে খাদ্য সহায়তা নিয়ে হাজির হন শুভসংঘের সদস্যরা। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করা পরিবারটির মুখে হাসির দেখা মেলে অনেক দিন পর। শহর থেকে একটু দূরে লায়লা বেগমদের বাড়িতে মোটরসাইকেলে করে পৌঁছে যায় শুভসংঘ টিম। সদস্যদের কারো হাতে চালের বস্তা, কারো হাতে ডাল, আটা, সয়াবিন তেল কিংবা আলুর প্যাকেট।

শুভসংঘের সদস্যরা বলেন, বাড়ির কাছে রাস্তার পাশে ছেলে দুটিকে সঙ্গে নিয়ে লাঠিতে ভর করে দূরে তাকিয়ে ছিলেন লায়লা। কখন আসব আমরা তাঁর বাড়িতে খাদ্য সহায়তা নিয়ে। বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেখে লায়লার মুখে ফোটে হাসির ঝিলিক। তাঁর সন্তান দুটি আমাদের মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে দৌড়ে আসতেছে আর তাদের মাকে বলতেছে, মা, ওমরা হামার চাউল ধরি আইসোছে। হামরা ওই চাউল দিয়া ভাত আন্দি খামো। হামাক খুব ভোগ নাগছে মা। ম্যালা দিন পরে তিন বেলা খাইবার পাইয়ুম। শুভসংঘের সহায়তার সামগ্রীগুলো দেখে কী যে আনন্দিত হচ্ছিল লায়লার সন্তান দুটি, তা বলে বোঝানো অসম্ভব।

লায়লার বড় সন্তান নাঈম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিল, ‘হামরা গরিব মানুষ। হামার বাপ মাইনসের বাড়িত কাম করে। মাও এক্সেডেন্ট করছে এক বছর আগোত। মাও হামাক কোলাত নিয়া আর হাঁটি বেড়ার পায় না। মাও সারা দিন বিছনাত সুতি থাকে। রোজার ঈদোত হামার গ্রামের সউগ ছোয়াগুলা নয়া শাটপ্যান্ট পিন্দি ঈদ করছে। হামরা দুই ভাই ছিঁড়া শাটপ্যান্ট পিন্দি বাড়িতে বসি আছনো কায়ও হামাক একনা শাটপ্যান্ট তো দূরের কথা, এনা খাবারে দেয় নাই। হামার গরিব মাইনসের খবর যারা থুইছে, আল্লাহ ওমার ভালো করবে। ’ 

কথা বলতে গিয়ে কান্নায় দুই চোখ ভিজে আসে লায়লার। লায়লা বলেন, ‘গেল ঈদোত মুই হামার এলাকার চেয়ারম্যানের গোরোত গেছনু চাউলের জন্যে। মুই যেয়া কনু চেয়ারম্যান সাহেব, মুই পঙ্গু হয়া পড়ি আচুং বিছানাত। কামকাজ কিছুই করির পাওং না। মোর স্বামীটাও তো কাজের অভাবে বসি আচে বাড়িত। তোমরা এনা মোক চাউল দেন, মুই ঈদোত ছোয়াগুলাক ধরি দুই মুঠ ভাত খাইম। ওমরা মোর কথা শোনে নাই। মোক একনা চাউলও দেয় নাই। দুই দিন থাকি মুই ছোয়াগুলাক নিয়া না খেয়া আচুং। তোমরা মোর ছোয়াগুলার মুখোত দুই মুঠ ভাত খোয়ার জন্যে চাউল-ডাউল দিনেন, আল্লাহ তোমাক ভালো থুক। দোয়া করোং বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান যেন হাজার বছর সুখে-শান্তিতে বাঁচি থাকে। আল্লাহ ওমার মঙ্গল করুক। মুই শুনচুং ওমরা খুবে ভালো মানুষ। ওমরা দেশের গরিব মানুষগুলাকে খুব সাহায্য-সহযোগিতা করে। ওমার মতন ভালো মানুষগুলা দেশোত আছে, সেই জন্যি হামার মতন গরিব মানুষগুলা বাঁচি আছে। ’

খাদ্য সহায়তা প্রদানের সময় লায়লাদের পরিবারের ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেন তারাগঞ্জ উপজেলা শাখার উপদেষ্টা অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ। এ সময় তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ মানুষের কল্যাণে কাজ করে। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কেউ না খেয়ে থাকলে তাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। পরবর্তী সময়ে আপনাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমাদের জানাবেন, আমরা শুভসংঘ সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। ’

শুভসংঘের খাদ্য সহায়তা বিতরণের সময় আরো উপস্থিত ছিলেন দীপংকর রায় দীপু, মো. লুতু সরকার, মো. রহমত মণ্ডল, আবু বারেক পিয়েল, সত্যজিৎ রায়, সুমন মিয়া প্রমুখ।

 



সাতদিনের সেরা