kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

শুভসংঘ থেকে দেওয়া হয়েছে ছাগল হাঁস মুরগি

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে জায়েদা এখন স্বাবলম্বী

জিয়াউর রহমান   

১৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে জায়েদা এখন স্বাবলম্বী

সদ্যঃপ্রসূত ছাগলের বাচ্চা হাতে জায়েদা বেওয়া

প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে বানানো একটি ঝুপড়িঘর। এই ঘরেই জায়েদার বসবাস। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা সব ঋতুই জায়েদার কাছে এক রকম। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাঝিড়া ইউনিয়নের মাঝিড়া দক্ষিণপাড়ার মৃত কালাম উদ্দিন ওরফে কালাদ্দিনের মেয়ে জায়েদা বেওয়া।

বিজ্ঞাপন

ষাটের কাছাকাছি বয়সী সহায়-সম্বলহীন এই নারীর জীবনসংসারে কেউ নেই। বহু বছর আগেই মা-বাবা, ভাই-বোনকে হারিয়েছেন। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার পর কোলের শিশুসন্তান মারা যাওয়ায় স্বামীও তাঁকে ছেড়ে চলে যান। সারা দিন ঘুরে ঘুরে শাক-কচু সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করে সারা দিনে যা পেতেন তাই তাঁর মূলধন ছিল। কোনো কোনো দিন শাক-কচু পাওয়া না গেলে ওই দিনের একমুঠো ভাতের খোরাক জুটত চেয়েচিন্তে আর ভিক্ষা করে। মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই বাঁশের মোটা কঞ্চির খুঁটি গেড়ে সিমেন্টের প্লাস্টিক বস্তা টানিয়ে একটি ঝুপড়িঘর। গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়েদের খেলনা ঘরের মতোই ঘরটি। ঘরের কোণে একটি চুলা। পলিথিনের ব্যাগে মোড়ানো কিছু জিনিসপত্র। অন্যের জমির ওপর নর্দমার পাশে এই ঝুপড়িঘরেই জায়েদা বেওয়ার বসবাস। তখনই পত্রিকার পাতায় আসে জায়েদার খবর। ২০২০ সালের ১৭ জুন কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ‘যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের’ শিরোনামে প্রথম সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর ২৮ জুন কালের কণ্ঠ অনলাইনে ‘প্লাস্টিক বস্তার ঝুপড়ি এখন জায়েদার স্বপ্নের রাজপ্রসাদ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয়ভাবে মানুষের নজরে আসে। জীবনযুদ্ধে পরাজিত সহায়-সম্বলহীন স্বজনহারা এই জায়েদা বেওয়ার খবর জানতে পেরে তাঁর পাশে দাঁড়ায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ।

২০২০ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকা থেকে ছুটে আসেন কালের কণ্ঠ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। সঙ্গে ছিলেন শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান। তাঁরা নিজ হাতে অসহায় জায়েদাকে স্বাবলম্বী করতে তাঁর হাতে তুলে দেন এক জোড়া করে ছাগল, হাঁস ও মুরগি। সে সময় উপস্থিত শুভসংঘ শাজাহানপুর উপজেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান এ কে এম আছাদুর রহমান দুলু ও শাজাহানপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য প্রভাষক সোহরাব হোসেন ছান্নু জায়েদার সারা জীবনের স্বপ্ন মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর নির্মাণের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি জায়েদার খাবারের জন্য প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ও সাংসারিক সরঞ্জাম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন উপজেলা চেয়ারম্যান প্রভাষক সোহবার হোসেন ছান্নু। সেই অনুযায়ী ৩০ কেজি চাল, হাঁড়ি-পাতিল, জগ-গ্লাস, বালতি ও কাঁচা তরকারিসহ সাংসারিক সরঞ্জাম নিজ হাতে জায়েদাকে পৌঁছে দেন উপজেলা চেয়ারম্যান ছান্নু।

জায়গার অভাবে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া সম্ভব না হলেও ইমদাদুল হক মিলনের নিজ হাতে দেওয়া উপহারের ছাগল, হাঁস, মুরগি প্রতিপালন করে এখন স্বাবলম্বী জায়েদা। অন্যের কাছে চেয়ে খেতে হয় না। তাঁর মুরগি ও হাঁস এখন ডিম পাড়ে। দুটি ছাগল বড় হয়ে গেছে। গত শনিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে জায়েদার একটি ছাগল দুটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। ছাগলের বাচ্চা হওয়ায় জায়েদার চোখে-মুখে এখন আনন্দের হাসি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাগলের সদ্যঃপ্রসূত বাচ্চা দুটিকে পাশে রেখে খড়ের ওপর শুয়ে আছেন জায়েদা বেওয়া। কোনো হিংস্র প্রাণী বা কেউ যাতে বাচ্চা দুটির ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে সজাগ তিনি। প্রতিবেদককে দেখেই লাফ দিয়ে উঠে বসেন। মুখে তাঁর তৃপ্তির হাসি। কেমন আছেন জানতে চাইতেই হাসিমাখা মুখে বললেন, খুব ভালো আছি। দৌড়ে গিয়ে মা ছাগলটা নিয়ে এলেন। মাকে পেয়ে বাচ্চা দুটি দুধ খেতে চাইল। জায়েদা বেওয়া গিয়ে বাচ্চা দুটিকে মায়ের দুধের বাঁটে লাগিয়ে দিলেন। পরিচর্যায় যেন কোনো কমতি নেই। কখনো মাথায়, শরীরে হাত বুলিয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছেন। শীতে ঠাণ্ডা যেন না লাগে সে জন্য চটের ছালা গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছেন। এই ছাগলের বাচ্চা দুটিকে জায়েদা যেন নিজ সন্তানের মতো কোলেপিঠে করে প্রতিপালন করছেন। এখন তিনি মহাখুশি।

জায়েদা বেওয়া বলেন, এই বাচ্চা দুটিই আমার সন্তান। এদের কোলেপিঠে করে লালনপালন করেই আমার শান্তি। কিন্তু এই বাচ্চাদের রাখব কোথায়। ঘরের অভাবে নিরাপদে রাখতে পারছি না। মাথা গোঁজার একটি ঘরের জন্য বহু মানুষকে বলেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ঝুপড়িঘরেই থেকেছি সারা জীবন। তাতে কী। শুভসংঘের বাবারা অনেক কিছুই দিয়েছেন। হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তরিতরকারী, ছাগল, হাঁস, মুরগি অনেক কিছুই পেয়েছি। ছাগল বাচ্চা দিয়েছে। ছয় মাস পর আবার বাচ্চা দেবে। এই ছাগল, হাঁস, মুরগি প্রতিপালন করে অনেক ভালো আছি। যারা এত কিছু দিয়েছেন আল্লাহ তাঁদের ভালো করবেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় জায়েদার নামে সরকারি কোনো বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করা হয়। শুভসংঘের দেওয়া ছাগল, হাঁস, মুরগি প্রতিপালন করে এখন বেশ ভালোই আছেন জায়েদা বেওয়া। ’



সাতদিনের সেরা