kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

বিশেষ রচনা

বাংলার অলংকার

বিয়ের আয়োজনে সাজ-পোশাকের সঙ্গে বিশেষ আকর্ষণ গয়না। যুগে যুগে গয়নার আঙ্গিক ও ধারায় এসেছে পরিবর্তন। আদ্যোপান্ত জানিয়েছেন রিদওয়ান আক্রাম

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলার অলংকার

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সিসকো রেনাল্ডির আঁকা ঢাকার এক মুসলিম তরুণীর ছবি। তরুণীর পরে থাকা অলংকারগুলো বেশ দর্শনীয়

ভিন্ন ভিন্ন রত্ন পরলে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে—এমন বিশ্বাস থেকেই ভারতে অলংকারশিল্পের প্রসার। রত্নকে কোনো অলংকারের মধ্যে বা সঙ্গে সংযুক্ত করে পরা হতো। আর এভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশে অলংকারের যাত্রা। ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত প্রাচীনতম অলংকার পাওয়া গেছে পাকিস্তানের মেহেরগড়ে প্রাক-মৃিশল্পের স্তর থেকে। এটি সম্ভবত ব্যবহূত হতো মাদুলি হিসেবে। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বছর আগে তো হবেই।

অলংকারের মধ্যে সোনা স্থান করে নিতে বেশ সময় নেয়। সবচেয়ে পুরনো স্বর্ণের অলংকারটি পাওয়া যায় পাকিস্তানের জালিপুরে, খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালে। সিন্ধু উপত্যকায়, বিশেষ করে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় স্বর্ণালংকারের বহু ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে। সে সময় বিপুল পরিমাণে ভালো মানের সোনা পাওয়া যেত গঙ্গার সঞ্চিত পলিমাটির স্তূপ থেকে। আর দক্ষিণে সোনা বহনকারী বালু থেকে।

নৃত্যরতা নারী, পোড়ামাটির ফলক, পাহাড়পুর (৮-৯ শতক)।

বাংলাদেশে অলংকারের নমুনা পাওয়া যায় মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত মৃৎফলকে।

সেসবের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতক। শুধু স্বর্ণের অলংকারই নয়, পাওয়া গেছে তামার বালা ও আংটিও। এগুলোর নির্মাণকাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতক।

খ্রিস্টপূর্ব ২৯৬ সালে লেখা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে পুণ্ড্র (বগুড়া) ও ত্রিপুরায় (কুমিল্লা) রুপা ব্যবহারের কথা জানা যায়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে এমন একটি সোনার ভাঙা বাজু আছে, যা পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ সালের বলে মনে হয়।

মোদ্দা কথা, পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের সমান্তরালে অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও অলংকারশিল্পের বিস্তৃতি ঘটেছিল।

বাংলাদেশে প্রাচীনতম অলংকার পাওয়া গেছে বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের পাশাপাশি নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে। এগুলো কম দামি পাথরের পুঁতি দিয়ে তৈরি, খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ থেকে ৩৭০ বছর আগে।

বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁর (রাজত্বকাল ১৭৪০-১৭৫৬) তরুণ বয়সের ছবি। এখানে তাঁকে কানে দুল পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে

তা ছাড়া গুপ্ত শাসনামলে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০-৩২০) এখানে স্বর্ণালংকারের চল ছিল। সে সময় নারী-পুরুষরা শরীরের ওপরের অংশে কোনো পোশাক পরত না। ধনীরা নানা রকম অলংকার দিয়ে ঢেকে রাখত।

১২০৫ সালে বাংলায় সুলতানি আমল শুরু হলে মুসলমান শাসকদের হাত ধরে বাংলায় মুসলিম ঘরানার অলংকারের চল হয়। তত্কালীন সাহিত্যে সোনা ও রুপার অলংকার ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। নারীরা সুন্দর পোশাক ও মূল্যবান অলংকারাদি পরতে ভালোবাসত। পনেরো শতকে শাহ মুহম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ-জুলেখা’য় সে চিত্রই পাওয়া যায়। শাহ মুহম্মদ সগীর ছিলেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহর (১৩৮৯ থেকে ১৪১০ সাল) সভাকবি। হজরত ইউসুফ (আ.) আর জুলেখার প্রেমকাহিনি হলেও এতে কবি বাংলার উপাদান ব্যবহার করেছেন। এতে দেখা যায়, সম্পদশালী পরিবারের মেয়েরা গলায় হার, মুক্তা ও হীরার কর্ণকুণ্ডল, অনন্ত, বালা এবং মূল্যবান পাথর বসানো সোনার আংটি ব্যবহার করত। শুধু সাহিত্যেই নয়, মধ্যযুগে বাংলায় আসা বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনি থেকেও এখানকার অলংকারের কথা জানা যায়।

আঠারো শতকের শেষের দিকে ব্যালথাজার সুলভিনসের আঁকা সম্ভ্রান্ত বাঙালি নারীর ছবি। তাঁর গলা আর হাতে পরে থাকা অলংকারগুলো লক্ষণীয়

১৪১৪ সালে (সে সময় বাংলার শাসক ছিলেন গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ) সোনারগাঁয় এসেছিলেন চীনা পর্যটক মা হুয়েন। তিনি বাংলার কারুশিল্পীদের তৈরি বেশ কিছু অলংকারের নাম উল্লেখ করেছেন; যেমন—কর্ণকুণ্ডল, কেয়ূর, শঙ্খবলয়, মেখলা। বাংলার নারীরা কী ধরনের অলংকার পরত, সেসব উল্লেখ করতেও ভুল করেননি মা হুয়েন। ‘তাদের কানে প্রস্তরখচিত সোনার কর্ণাভরণ, গলায় মালা, মণিবন্ধ ও বাজুতে সোনার গহনা।’

বর্ণনা অনুযায়ী মনে হয়, কিছুটা অবস্থাপন্ন ঘরের নারীরাই এসব অলংকার ব্যবহার করত। কেননা একই সঙ্গে হুয়েন বলেছেন, ‘ঘরের বউঝিদের জন্য ছিল কচি তালপাতার দুল। আর তখনকার রাজকীয় মান-মর্যাদার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল নানা রকমের মূল্যবান রত্ন। সুলতান ব্যবহার করতেন মুক্তা, নীলকান্তমণি, মরকত মণি, প্রবাল প্রভৃতি। শুধু নিজের ব্যবহারেরই জন্যই নয়, অন্যান্য দেশের রাজাদের কাছেও তিনি উপহার হিসেবে মূল্যবান মণি-মুক্তা পাঠাতেন।’

হুয়েনের ঠিক ১০০ বছর পর ১৫১৪ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন পর্তুগিজ পর্যটক দুয়ার্তে বারাবোসা। তিনি বাংলায় সোনা-রুপার ব্যবসার কথা বলেছিলেন। মালাক্কার তুলনায় বাংলায় সোনার দাম ছয় ভাগের এক ভাগ বেশি হওয়ায় এবং বাংলা থেকে মালাক্কায় রুপা নিয়ে গেলে তার দাম চার ভাগের এক ভাগ বেশি পাওয়ায় এখানকার ব্যবসায়ীরা সোনা-রুপার ব্যবসায় বেশি আগ্রহী হতো। তখনকার অভিজাত মুসলমানদের অলংকার ব্যবহারের কথা বলেন এই পর্তুগিজ পর্যটক। পুরুষদের একাধিক আঙুলে থাকত সোনার আংটি। তাদের ছুরির বাঁট ও খাপেও থাকত রুপার বাজু। নারীরাও ব্যবহার করত সোনার অলংকার। এগুলো ছিল বাংলার অভিজাত শ্রেণির অলংকার।

বৃদ্ধাঙ্গুলিতে পরার মোগলাই আংটি, সপ্তদশ শতাব্দীর

১৫৬৭ সালে ইতালির এক পর্যটক এসেছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে। তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম হচ্ছে পুরো বাংলাদেশের (সম্ভবত পূর্ব বাংলার কথা বলা হয়েছে) রুপার প্রধান কেন্দ্র।

গ্রামীণ বাংলার মানুষদের অলংকারের বর্ণনা পাওয়া যায় ইংরেজ বণিক র‌্যালফ ফিচের কাছ থেকে। তিনি সম্ভবত ১৫৮৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম হয়ে বরিশাল আসেন। সেখানকার মেয়েদের অলংকারের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, মধ্যবিত্ত মেয়েরা গলায় হাঁসুলি, হাতে বালা, পায়ে তামা ও হাতির দাঁতের তৈরি মল পরত। ধনীদের গলায় আর বাহুতে থাকত রুপার গয়না। পায়ের আঙুলেও থাকত রুপা, তামা ও হাতির দাঁতের আংটি।

বাংলার ক্ষমতা মোগলদের কাছে চলে যাওয়ার পর এই অঞ্চলের অলংকারে ধীরে ধীরে ইসলামি, বিশেষ করে বললে পারস্যরীতি প্রবেশ করতে শুরু করে। মোগলদের অলংকারের পরিবর্তনে বিশেষ অবদান রেখেছে মোগল জেনানামহল। সম্রাজ্ঞী থেকে রাজকুমারীরা নিজের পোশাকের পাশাপাশি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন অলংকারকে। বিশেষ কোনো পাথর পেলে সেটাও সংযোজন করতেন নিজেদের অলংকারে।

মোগল নারীদের নাকে-কানে থাকত মুক্তা দিয়ে তৈরি নানা রকম অলংকার। মোগল নারীদের পরে থাকা অলংকার দিয়ে তাঁর স্বামী বা বাবার রাজকীয় পদ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেত। অর্থাৎ যে নারীর স্বামী বা বাবা যত বেশি উচ্চপদে থাকতেন, তিনি তত বেশি অলংকার পরে থাকতেন।

ঢাকার নবাব আবদুল গণির (১৮১৩-১৮৯৬) ছবিতেও অল্প হলেও অলংকারের জাঁকজমকটা ঠিকই দেখা যাচ্ছে

মোগল রাজপুরুষরাও অলংকার ব্যবহার করতেন। তাঁদের ছয় থেকে আট সেট মূল্যবান রত্ন বসানো অলংকার থাকত। গলায় কয়েক প্যাঁচ দিয়ে পরতেন মুক্তার মালা, যা দিয়ে দুই কাঁধ পর্যন্ত ঢেকে যেত। পাগড়ির মাঝখানে থাকত একটা বড় রত্ন। অনেক সময় পাগড়ির চারদিকেও গোল করে নানা রকম দামি রত্ন ব্যবহার করা হতো। উপহারস্বরূপ যেসব অস্ত্র দেওয়া-নেওয়া হতো, সেসবের মধ্যেও অলংকারের ব্যাপক ব্যবহার হতো। কখনো কখনো মোগল রাজপুরুষরাও কানে দুল পরতেন। তবে সেটা নারীদের মতো ঝুলে থাকত না। বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁকে একটি ছবিতে কানে দুল পরে থাকতে দেখা যায়। তবে সব সময় দুল পরে থাকতেন না এই রাজপুরুষরা। সম্ভবত কখনো কখনো ফ্যাশন করে পরা হতো। আর কম বয়সী মোগল পুরুষরাই কানে দুল পরতেন।

শুধু মোগল যুবরাজ কিংবা রাজকুমারীরাই নয়, মোগল সুবাদাররাও (গভর্নর) সম্রাটদের মতো দামি রত্নের কদর করতেন আর সংগ্রহ করতেন। বিজিত রাজ্য থেকে সংগ্রহ করা সেরা রত্নটি পাঠিয়ে দিতেন খোদ মোগল সম্রাটের কাছে। এভাবে সম্রাটদের খুশি রাখতেন সুবাদাররা। ১৬৬৩ সালে ঢাকা এসেছিলেন ফ্রান্সের হীরা ব্যবসায়ী জঁ বাঁতিস্তা তাভের্নিয়ার। তাঁর কাছ থেকে বেশ দাম দিয়ে হীরা-জহরত সংগ্রহ করেন সে সময়কার ঢাকার সুবাদার শায়েস্তা খাঁ।

প্রায় সাড়ে তিন শ বছর ধরে মোগলদের অধীন থাকায় ভারতীয়রা মোগলরীতি গ্রহণ করে। ফলে অন্যান্য ধর্মের মানুষরাও মোগলদের মতো অলংকার পরতে শুরু করে।

এরপর ভারতবর্ষের ক্ষমতা যখন ইংরেজদের হাতে গেল, তখন হুট করেই যে বাংলার অলংকারে পরিবর্তন আসা শুরু করল তা কিন্তু নয়। উনিশ শতকের শেষ দিকেও পুরুষদের অল্প করে হলেও অলংকার ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে সেসব অনেকটা আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়ে; যেমন—বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে অলংকার পরতে দেখা যায়।

এই সময়ে শুধু সমাজের উচ্চবিত্তরাই নয়, নিম্ন ও মধ্যশ্রেণিদেরও দেখি সঞ্চয়ের অন্যতম সহজ উপায় হিসেবে স্বর্ণে আস্থা রাখতে। ফলে অল্প অল্প করে অলংকার তৈরি করে সঞ্চয় করতে থাকে। এসব একই সঙ্গে ব্যবহারও করা যেত। ঢাকার নবাবদের কিছু সূক্ষ্ম অলংকারে মোগল প্রভাবের পাশাপাশি ইউরোপীয় শৈলীরও পরিচয় পাওয়া যায়। কলকাতার বিখ্যাত মণিকার হ্যামিলটন অ্যান্ড কম্পানির প্রকাশিত ‘ঢাকা কালেকশন’ নামে প্রকাশিত একটি কফি টেবিল বইয়ে ১৪টি রত্নালংকারে সেই প্রভাব ভালোভাবেই দেখতে পাওয়া যায়।

তবে নারীরা ইংরেজ প্রভাব থেকে ছিলেন মুক্ত। তাঁদের অলংকার ব্যবহারে মোটা দাগে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। বলা যায়, এটা কোনো রকমে টিকে ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত।

এরপর ধীরে ধীরে অলংকারে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অলংকার বলতে এখন শুধু সোনা আর দামি রত্ন দিয়ে তৈরি গয়নাই বোঝায় না। বাঙালি নারীরা এখন ইমিটেশনের অলংকার থেকে শুরু করে প্লাস্টিক, মাটির অলংকারও ব্যবহার করে থাকে।

 

 

 

মন্তব্য