kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নীরবতা নেমেছে নগরে

এস এম রানা, চট্টগ্রাম    

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নীরবতা নেমেছে নগরে

নিগরের নিউমার্কেট এলাকা। এখানে যানজট, হকারদের হাঁকডাক, বাস কিংবা ট্রেন যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছার তাড়া কিংবা মার্কেটের দোকানগুলোতে ভিড়বাট্টা-নিত্যদৃশ্য। চিরচেনা সেই দৃশ্যপট এবার পরিবর্তন হচ্ছে। নেই যানজট, ট্রাফিক পুলিশের ব্যস্ততা, হকারদের হাঁকডাক। মার্কেটগুলোও প্রায় বন্ধ-সবমিলিয়ে থেমে যাচ্ছে প্রায় ৬০ লাখ বাসিন্দার জনকোলাহলপূর্ণ বন্দরনগর চট্টগ্রাম।

এমন দৃশ্য শুধু নিউমার্কেট এলাকার নয়, আশপাশের রেলস্টেশন, স্টেশন রোড, রিয়াজউদ্দিন বাজার, তিনপুলের মাথা, কোতোয়ালী থানা মোড়, আলকরণ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত ভবন, আন্দরকিল্লা, চেরাগিপাহাড়, জামালখান, কাজিরদেউরি, লালখানবাজার কিংবা টাইগারপাস-সর্বত্র প্রায় অভিন্ন দৃশ্য।

-এভাবে ধীরে ধীরে থামছে চট্টগ্রাম নগরের জনকোলাহল। অথচ প্রায় ৬০ লাখ মানুষের পদভারে মুখরিত এই জনপদের উল্লিখিত এলাকাগুলো থাকত নিত্যমুখর। এমন কর্মমুখর পরিবেশ আবার কবে ফিরবে কেউ নিশ্চিত বলতে পারছেন না। সবার মুখে উদ্বিগ্ন প্রশ্ন, ‘করোনাভাইরাসে চট্টগ্রামে কতোজন আক্রান্ত হয়েছে?’ ‘চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কী?’ ‘আবার কবে ফিরব এই নগরে’-এমন প্রশ্নগুলো ঘুরছে উদ্বিগ্ন মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে পাচ্ছে না নগরবাসী।

লালখানবাজার মোড়ে নিত্য যানজট থাকে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ব্যস্ততা থাকে চোখে পড়ার মতো। বুধবার দুপুরে সেখানে একজন ট্রাফিক পুলিশকেও দেখা গেল না, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত সময় পার করতে। আরেকটু পরেই টাইগারপাস। এখানেও নেই ট্রাফিক পুলিশের ব্যস্ততা। ট্রাফিক পুলিশ বক্সে একজন পুলিশ সদস্যকে দেখা গেল অলস বসে থাকতে।

ব্যস্ততম স্টেশন রোডের কাঁচা বাজারের আড়ত। এখান থেকে কিছু ভ্যানচালক সবজি নিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। লেবু বিক্রেতাকে ঘিরে ধরেছেন কিছু ক্রেতা। প্রতিটি লেবুর মূল্য ১৫ টাকা। উচ্চমূল্যেও কেনা বন্ধ হচ্ছে না। যেন শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা।


বাঁ থেকে : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চট্টগ্রাম নগরে গতকাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা সচেতনতামূলক প্রচার চালান, খুলশী এলাকায় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের বাসায় লাল পতাকা টাঙিয়ে দেয় প্রশাসন এবং জনশূন্য সার্কিট হাউসের সামনের সড়ক।             ছবি : রবি শংকর


আরো সামনে গিয়ে রেলস্টেশন। দেখা গেল, সেনাবাহিনীর গাড়ি। সঙ্গে আছে পুলিশ ও জলকামান। জীবাণুনাশক পানি ছিটানো হচ্ছে। আর খোলা থাকা দোকানগুলো দ্রুত বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে নিরাপদে বাসায় ফেরার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

সেখানেই দেখা কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মহসিনের সঙ্গে। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বললেন, ‘এই মুহূর্তে নিরাপদে বাসায় থাকা ছাড়া উপায় নেই। করোনাভাইরাসের জীবাণু ঠেকাতে বাসায় অবস্থানই নিরাপদ। পথে ঘাটে ঘোরাঘুরি করলে এই ভাইরাস আরো দ্রুত ছড়াতে পারে, দেশ ও দেশের মানুষের জীবন রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেতনতামূলক দায়িত্ব পালন করছে। মানুষ যতো দ্রুত বাসায় ফিরবে, ততোই মঙ্গল।’

রিয়াজউদ্দিন বাজারের একটি মার্কেটের ব্যবসায়ী

মোহাম্মদ হারুন। তিনি ছাতাসহ অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করেন। ১০ দিনের বন্ধের ঘোষণায় হতাশ। বিক্রি বন্ধের সঙ্গে ঘরের উনুন বন্ধের আশঙ্কা করে তিনি বলেন, ‘তাহলে ছোট্ট ব্যবসায়ীরা চলবে কি করে? আমাদের যে জমা টাকা নেই।’ এমন প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে কেউ দিচ্ছেন না হারুন সওদাগরদের। এর পরও জীবন বাঁচানোর জন্যই বাড়ি ফেরার তাগাদা আছে।

সেখান থেকে কোতোয়ালী মোড় হয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে পৌঁছে দেখা গেল অকল্পনীয় দৃশ্য। সাধারণত সরকারি অফিস খোলা থাকলে জেলা প্রশাসন কার্যালয় ও আদালত অঙ্গনে গাড়ি নিয়ে পৌঁছা মুশকিল। কিন্তু বুধবার দুপুরের চিত্র যে ভিন্ন। এখানেও হাতেগোনা কিছু মানুষের চলাচল। যাঁদের অনেকে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী কিংবা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জরুরি প্রয়োজনে আসা। আদালত ভবনের চারপাশ লক্ষ করে বোঝা গেল, সেখানে সুনসান নীরবতা। আসামি, আইনজীবী কিংবা পুলিশের ব্যস্ততা নেই সেখানে।

জুবিলী রোডের দৃশ্য কিছুটা বিপরীত। যন্ত্রপাতি বিক্রির দোকানগুলোতে ভিড় লেগেছে স্প্রে মেশিন কিনতে। জীবাণুনাশক পানি ছিটানোর প্রয়োজনে স্প্রে কিনতে শেষ মুহূর্তে মানুষ ভিড় করছে দোকানগুলোতে। দোকানকর্মীদের কেউ কেউ স্প্রে মেশিনে পানি ভর্তি করে পানি ছিটিয়ে দেখাচ্ছেন। দাম হাঁকছেন ১৫শ থেকে ১৬শ টাকা করে।

কাজির দেউরি মোড়ে এসে দেখা গেল, সেখানেও সেনাসদস্যরা মাইকিং করছেন। জনগণকে নিরাপদে দ্রুত বাসায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন। এরই মধ্যে সার্কিট হাউস রোডের দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল, যেন দেশে চলছে অঘোষিত হরতাল। না হলে যুদ্ধ পরিস্থিতি! কোথাও কেউ নেই। জনমানবশূন্য সড়ক। এভাবে থামছে বন্দরনগরের জনকোলাহল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা