kalerkantho

শনিবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

পাহাড়ে রাবার বাগান প্রকল্প

রক্ষকরাই ভক্ষক!

আবু দাউদ ও জাকির হোসেন, খাগড়াছড়ি   

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রক্ষকরাই ভক্ষক!

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাঠকর্মী থেকে শুরু করে অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রাবার বাগান বেদখল প্রক্রিয়ায় জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি জায়গা দখল করে এবং সরকারি টাকা ব্যয়ে সৃজিত রাবার বাগান কেটে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যক্তিগত বাগান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রান্তিক পাহাড়িকে

নামমাত্র টাকা দিয়ে তাঁদের দখলে থাকা ৪ একর রাবার বাগান, ২ একর ২৫ শতকের বাগানবাড়ি কিনেছেন উন্নয়ন বোর্ডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের মধ্যে সাবেক জেনারেল ম্যানেজার সুখময় চাকমা, বর্তমানে সহকারী ব্যবস্থাপক শক্তিনন্দ চাকমা, ফিল্ড সুপারভাইজার সুরেশ কান্তি চাকমা, সহকারী ব্যবস্থাপক (৩০০ পরিবার প্রকল্প) সানুমং মারমা, সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার প্রবীণ বরণ চাকমা, উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশল শাখার

উপ-সহকারী প্রকৌশলী কল্লোল রোয়াজা, মিশ্র ফল বাগান প্রকল্পের ফিল্ড সুপারভাইজার মহেশ্বর ত্রিপুরার নাম এসেছে। তদন্তে আরো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও আসতে পারে বলে জানা গেছে।

উঁচুভূমি বন্দোবস্তীকরণ রাবার বাগান প্রকল্পের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার সুখময় চাকমা আলুটিলা স্কুলপাড়ায় রাবার বাগানের জমিতে নিজস্ব মিশ্র ফল বাগান গড়ে তোলেন। একই প্রকল্পের সহকারী ম্যানেজার শক্তিনন্দ চাকমাও আলুটিলায় ব্যক্তিমালিকানায় বাগান করেছেন। ফিল্ড সুপারভাইজার সুরেশ কান্তি চাকমা ভাইবোনছড়ার নোয়াপাড়ায় প্ল্যান্টারের নামীয় রাবার বাগানের ১০ একর আর নতুন বাগান প্রকল্প গ্রামে ২ একর জমিতে নিজস্ব বাগান সৃজন করেছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

একই প্রক্রিয়ায় প্ল্যান্টারদের কাছ থেকে প্রায় ২০ একরের মতো জমি কিনেছেন ৩০০ পরিবার পুনর্বাসন প্রকল্পের সহকারী ব্যবস্থাপক সানুমং মারমা এবং সাবেক ফিল্ড সুপারিনটেনডেন্ট প্রবীণ বরণ চাকমা ভাইবোনছড়ার নেয়াপাড়ায় অন্তত ২০ একর জমিতে বাগান বাগিচা করেছেন।

উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী কল্লোল রোয়াজাও রাবার বাগানের জমি কিনেছেন। আমসহ মিশ্র ফল বাগানও করেছেন কয়েক বছর ধরে। রাবার বাগান আধুনিকায়ন প্রকল্পের প্ল্যান্টার লিডার সুভাষ চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘কল্লোল স্যার প্ল্যান্টারদের কাছ থেকে ২০ একরের মতো জমি কিনে সেখানে বাগান করেছেন। রাস্তাও তার বাগান পর্যন্ত যাচ্ছে।’

সরেজমিন দেখা গেছে, প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ উন্নয়ন বোর্ডের রাস্তাটি তার বাগান পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রকৌশলী কল্লোল ত্রিপুরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্ল্যান্টারদের কাছ খেকে জমি নিয়ে আম বাগান করেছি ঠিক; তবে সেখানে রাবার গাছ ছিল না।’ সরকারি প্ল্যান্টেশানের জায়গায় ব্যক্তিগত বাগান করা যায় কিনা জানতে চাইলে কল্লোল বলেন, ‘নিয়মের বিষয় জানা নেই, এখন তো এ রকম অনেকেই করছেন।’

সরকারি জায়গায় ব্যক্তিগত বাগান করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মহেশ্বর বলেন, ‘সীমানাপাড়া পর্যন্ত পুরো সড়কের দুপাশের সকল জায়গা উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন দখল করে বাগান করেছে। আমি বাগান করেছি তাদের অনেক পরে। দোষ হলে আগে তাদের হবে।’

রাবারের চিহ্নও নেই বহু এলাকায় : দীঘিনালার ছোট মেরুং যৌথখামার এলাকার তিনটি প্রকল্প গ্রামেই রাবারের চিহ্ন নেই। যেখানে ১৫০ পরিবারকে ৬০০ একর ভূমির ৪০০ একরে রাবার চাষ করা হয়েছিল, সেখানে ৫০০ রাবার গাছও টিকে নেই। ১ ও ২ নম্বর প্রকল্পের কোনো প্লান্টার রাবারের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। এখানকার হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারের বসতভিটা ব্যতীত প্রায় ৩০০ একর রাবার বাগান বেদখল হয়ে গেছে। এ কথা নিশ্চিত করেছেন প্লান্টার লিডার যতিন বিকাশ চাকমা নিজেও।

বোয়ালখালী ২ নম্বর যৌথ খামার প্রকল্প গ্রামের রাবার প্লান্টার সুনীল বিহারি চাকমা (৪০) জানান, উপজেলার আলমগীরটিলা এলাকায় প্রায় ১০০ একর রাবার বাগানের এখন একটি রাবার গাছও নেই। পুরো এলাকা জঙ্গলে ভরে গেছে। একই হাল, ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর রাবার বাগান প্রকল্প, নতুন বাগান, নেয়াপাড়া, দীঘিনালা সড়কের ৭ মাইল, ৮ মাইল, ৯ মাইল ও সীমানাপাড়ার রাবার বাগানগুলোর। বোর্ডের সহায়ক আধুনিকায়ন প্রকল্পের প্লান্টারদের জমিও বেচাকেনা হয়ে যাচ্ছে।

বক্তব্য নিতে ভোগান্তি : অজ্ঞাত কারণে রাবার বাগান বিষয়ে কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রায় দুসপ্তাহ ধরে ঘুরে বোর্ডের রাবার বাগান ব্যবস্থাপনা ইউনিটের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) পিন্টু চাকমার সাক্ষাত মেলে। বক্তব্য নেওয়ার জন্য বারংবার অনুরোধের পর জিএম পিন্টু চাকমা জানান, বর্তমানে প্রথম পর্যায়ে রোপণ করা রাবার বাগান থেকে বছরে মাত্র ৪০ টন আর দ্বিতীয় পর্যায়ের গাছ থেকে ৮০ টন রাবার উৎপাদিত হচ্ছে। রাবারের দাম কম হওয়ায় উৎপাদন আয় দিয়ে পুরো ব্যবস্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বিভাগটি। এর বাইরে রাবারের জমি বেদখল হওয়া প্রসঙ্গে কথা বলতে একদমই রাজি হননি তিনি।

এ বিষয়ে বোর্ডের জেলা কার্যালয়ের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মো. জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে পাঠানো এসএমসেরও জবাব দেননি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা