kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

প্রশ্নবিদ্ধ রাবার বাগান প্রকল্প

আবু দাউদ ও জাকির হোসেন, খাগড়াছড়ি   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রশ্নবিদ্ধ রাবার বাগান প্রকল্প

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের প্যারাছড়া ইউনিয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের রাবার প্ল্যান্টেশনের জায়গায় ব্যক্তিগত বাগান করেছেন উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তা কল্লোল রোয়াজা। আবার সেই বাগানে যাওয়ার জন্য উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে সড়কও। ছবি : কালের কণ্ঠ

পার্বত্য চট্টগ্রামে রাবার বাগান সৃজন করে প্রান্তিক পাহাড়িদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারের নেওয়া প্রায় সব প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে। উঁচুভূমি বন্দোবস্তকরণ রাবার বাগান ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে সব প্ল্যান্টারের (সুবিধাভোগী জুমিয়া) নামে ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কাজটিও তিন যুগে করতে পারেনি উন্নয়ন বোর্ড। রাবার বাগান ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সুযোগে সরকারের গোটা রাবার প্রকল্পটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বহু প্রান্তিক জুমিয়া তাঁর অংশের রাবার বাগান, জমিজমা; অভাবে বিক্রি করে দিয়ে ভূমিহীন হলেও সেই ভূমির মালিক বনছেন প্রভাবশালীরা। উন্নয়ন বোর্ডের বিধিবিধান অমান্য করে নামমাত্র মূল্যে প্ল্যান্টারদের কাছ থেকে রাবার বাগানের জমি দখলে নিয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে উন্নয়ন বোর্ডের রাবার বাগান প্রকল্পসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধিদের দখলে গেছে সরকারের বেদখল হওয়া রাবার বাগানের শত শত একর ভূমি। প্রশাসনিক নানা দুর্বলতা এবং রাবারের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহারের অভাবে সরকার এবং সুবিধাভোগী পাহাড়ি পরিবারগুলোর কোনো পক্ষ আশানুরূপ সাফল্য পাচ্ছে না। রাবার বাগান ব্যবস্থাপনায় ন্যস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় তাদের তদারকির ঘাটতি ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

বোর্ডের চুক্তি অনুযায়ী প্ল্যান্টাররা (উপকারভোগী জুমিয়া কৃষক) উৎপাদিত রাবার বিক্রির আয়ের ৬০ ভাগ অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র কয়েক শ পরিবার কালেভদ্রে তা পাচ্ছে। দীঘিনালার নয়মাইল এলাকার জিনো ত্রিপুরা জানান, তাঁরা গেল ৪/৫ বছর ধরে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না।

এদিকে তরল কষ প্রক্রিয়াজাত করে শক্ত করার জেলার প্রায় সব কটি কারখানা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। মেরুং কারখানা পুরোদমে বন্ধ থাকলেও ভৈরফা কারখানা চালু আছে নামেমাত্র। এমনকি রাবার উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারো কারো বেতন ৪/৫ বছর ধরেও বন্ধ রয়েছে।

তৎকালীন বিরাজমান পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ ও ভূমিহীন জুমিয়া পরিবারগুলোর জীবনমান পরিবর্তনে যে কটি উদ্যোগ নেওয়া হয়, রাবার বাগান সৃজন প্রকল্প অন্যতম। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে রাবার বাগান করে দিয়ে তাঁদের জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করার কথা ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ১৯৮১/৮২ সাল থেকে তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত ৩ হাজার ৩০০ পাহাড়ি পরিবারকে রাবার বাগান সৃজনের জন্য প্রায় ২০ হাজার একরের বেশি ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে এডিবির অর্থায়নে শুধু খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় ২ হাজার ৩০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে ভারত প্রত্যাগত আরো ৩০০ শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। কেবল খাগড়াছড়িতে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৭০০ পরিবার এবং ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন প্রকল্পে আরো ৩০০ পরিবারকে রাবার বাগান পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়েও জেলার মাটিরাঙায় আরো ৫০০ পরিবারকে রাবার বাগান প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এসব পাহাড়ি জুমিয়ার বসবাসের ঠিকানা হিসেবে ১ম পর্যায়ে প্রতি পরিবারকে ৪ একর রাবার বাগান ও ২ একর ২৫ শতক বসতভিটাসহ বাগান বাড়ি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪ একর রাবার বাগান এবং ১ একর ২৫ শতক বাগান বাড়ির জন্য পাহাড়ি ভূমি বন্দোবস্ত করে বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। অথচ ভূমির দখল পেলেও তাঁদের অধিকাংশই এতদিনেও বন্দোবস্তী পাননি।

রাবার প্ল্যান্টাররা অভিযোগ করেছেন, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সৃজিত রাবার বাগানের অধিকাংশ এখন নেই। লোক দেখানোর মতো রাস্তার কাছে ধারের কিছু কিছু জায়গায় রাবার বাগান শোভা পাচ্ছে মাত্র। নেই আগের মতো উৎপাদন এবং বিপনন। মূলত: উন্নয়ন বোর্ডের নিয়মানুযায়ী সার, উপকরণ এবং উৎপাদিত রাবার কষের ন্যায্য হিস্যা না দেওয়ায় জুমিয়ারা রাবার চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। নিরুৎসাহিত পাহাড়িদের অনেকে রাবার গাছ কেটে সেখানে জুম চাষ করেন এবং অনেকেই সরকারের দেওয়া জমিজমা অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে খাগড়াছড়ির অধিকাংশ রাবার বাগান নিশ্চিহ্ন হয়ে সরকারের মহাপ্রকল্প প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এ ছাড়া ইটভাটা এবং তামাক চুল্লিতেও প্রচুর পরিমাণ রাবার গাছ চলে যায়। লাকড়ি ব্যবসায়ীদের চাহিদার কারণে সরকারি রাবার বাগান উজাড়ে জড়িত অসাধু চক্র। বাগানের পর বাগান কেটে বিক্রি করা হয় লাকড়ি হিসেবে। প্লান্টাররা কেউ নিজ উদ্যোগে টাকার লোভে রাবার গাছ বিক্রি করেন আবার একটি বিশেষ চক্রও চুরি করে ইটভাটা ও তামাক চুল্লিতে বিক্রি করে থাকে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, কতিপয় প্রভাবশালীদের ভাগ্য পরিবর্তন আর অসাধু কিছু কর্মকর্তাদের লাভবান হওয়া ছাড়া রাবার প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের মূল লক্ষ্য ভেস্তে যেতে বসেছে।

দীঘিনালার বোয়ালখালী (সদর) ইউপি চেয়ারম্যান চয়ন বিকাশ চাকমা বলেন, ‘রাবার বাগানের মাধ্যমে প্রান্তিক জুমিয়াদের সুবিধা দেওয়ার সরকারের উদ্যোগ অর্জিত হচ্ছে না। অসাধু কিছু লোকের কারণে রাবার-সংশ্লিষ্ট ধনীরা আরো ধনী হয়েছে আর গরিব প্ল্যান্টার অধিকাংশ হয়েছে আরো গরিব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা