kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ জানুয়ারি ২০২০। ৯ মাঘ ১৪২৬। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১          

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা কালুরঘাট বেতারে প্রচার হল যেভাবে

আমেরিকা প্রবাসী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলামের স্মৃতিচারণ

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা কালুরঘাট বেতারে প্রচার হল যেভাবে

একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে প্রচারের ঝুঁকি নিয়েছিলেন একজন প্রকৌশলী। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী তিনি। নাম তাঁর প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম। জামালপুরের সরিষাবাড়ির সন্তান। তিনি ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ বিদ্যুৎ অফিসে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২৬ মার্চ সকালে বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়ে দেখতে পান রাস্তায় মানুষের জটলা। লোকজন সাইক্লোস্টাইল করা একটি কাগজ নিয়ে বেশ গুরুত্ব সহকারে পড়ছেন এবং সবার মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। একজনের কাছ থেকে তিনিও সংগ্রহ করলেন একটি কপি। চোখ বুলাতেই দেখতে পেলেন এটা এক মহাবাণী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা। পাশেই পরিচিত চিকিৎসক সৈয়দ আনোয়ার আলীর চেম্বার। সেখানে গিয়ে বসলেন। ততক্ষণে সেখানে উপস্থিত হলেন বিদ্যুৎ অফিসের আরেক সহকর্মী গ্রীস চন্দ্র দাশ। ইংরেজিতে সাইক্লোস্টাইল করা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কাগজটি তাঁরা পড়ার পর সিদ্ধান্ত নিলেন এটার ব্যাপক প্রচার দরকার। তিনজন হেঁটে পার্শ্ববর্তী আগ্রাবাদ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে গেলেন। বেতারকর্মীরা জানালেন, এটা প্রচার করতে হলে কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালকের (আরডি) সঙ্গে আলাপ করতে হবে। তাঁরা তিনজনই বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে কথা বললেন। আঞ্চলিক পরিচালকও সায় দিয়ে বলেন, সবচেয়ে বেশি ভালো হয় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে এটি প্রচার করলে। আঞ্চলিক পরিচালক এমনও পরামর্শ দিলেন, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র সংলগ্ন একটি সামরিক ব্যারাকেই রয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি বিষয়টি নিয়ে মেজর জিয়ারও সহযোগিতা নিতে বললেন।

প্রকৌশলী আশিকুল সহযোগীদের নিয়ে একটি গাড়িতে করে ছুটলেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে। প্রথমেই তাঁরা যান সেনাবাহিনীর ব্যারাকে। ব্যারাকে গিয়ে প্রকৌশলী আশিকুল বিস্তারিত জানিয়ে সামরিক সহযোগিতা চাইলেন। ব্যারাক থেকে যথারীতি ১০ জন সশস্ত্র সেনা সদস্যকে তাঁদের সঙ্গে দেওয়া হল। কিন্তু ব্যারাকে প্রকৌশলী আশিকুল ইসলামদের সঙ্গে সরাসরি মেজর জিয়ার সাক্ষাৎ হয়নি। প্রকৌশলী আশিকুলরা গেলেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে।

সমপ্রতি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের শহীদ এ টি এম জাফর আলম সম্মেলনকক্ষে ঐতিহাসিক ঘটনাটি এভাবে জানালেন প্রকৌশলী আশিকুল। সম্প্রতি তিনি আমেরিকা থেকে বেড়াতে আসেন দেশে। এক পর্যায়ে আসেন কক্সবাজারে। পূর্ব পরিচিত সংরক্ষিত নারী আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য কানিজ ফাতেমা আহমেদের সঙ্গে গত ৯ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসন আয়োজিত বেগম রোকেয়া দিবসের অনুষ্ঠানে আশিকুলও যোগ দেন। সেখানে একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব বলেন আশিকুল।

বলেন, ‘কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের অফিসে বসেই বেতারকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলাম ওইদিনের সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় আমরা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি প্রচার করব। এটি প্রচার করা হবে বাংলা ও ইংরেজিতে।’

এই কারণে ইংরেজি সাইক্লোস্টাইল করা কপিটি নিয়ে তিনি বাংলা অনুবাদ শুরু করলেন। শুরুতেই লিখলেন, ‘আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। এদেশকে স্বাধীন করার জন্য দেশবাসীকে ঝাঁপিয়ে পড়তে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, যার যা-ই আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’

প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম নিজেই বাংলায় পড়লেন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি। আর ইংরেজিতে পড়লেন ফটিকছড়ি কলেজের প্রয়াত উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল কাশেম সন্দ্বিপী। বেতার কেন্দ্রে ওই সময় বেতারকর্মীসহ অন্যদের মধ্যে আবদুল হান্নান, হোসনে আরা ও বেলাল মোহাম্মদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি মনে করতে পারছেন।

প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম জানান, কালুরঘাট বেতারে তাঁর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রচারের বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে স্বাধীন দেশের প্রথম সংবাদপত্র চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী, বাংলার বাণী, মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের বইসহ ভারতীয় গণমাধ্যমেও অনেক লেখালেখি রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা