kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

জুতা তল্লাশির জন্য ‘সোর্স’

‘আমরা তো পুলিশ সদস্য। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আছি। কোনো যাত্রীর পায়ে হাত দিয়ে আমরা জুতা তল্লাশি করতে পারি না। এ কারণে জুতা তল্লাশির জন্যই সাদা পোশাকে তাঁকে রাখা হয়েছে।’

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জুতা তল্লাশির জন্য ‘সোর্স’

নগর পুলিশ মাদক-অস্ত্রসহ অবৈধ জিনিসপত্র জব্দে নিয়মিতভাবে গাড়ি তল্লাশি করে। নগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সড়কগুলোতে এই কার্যক্রম নিয়মিত চলে। ফলে প্রায়ই মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ধরা পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী, তল্লাশি কার্যক্রমে ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।

কিন্তু নিয়ম বহির্ভূতভাবে তল্লাশির সময় সাদাপোশাকধারী সোর্সদের সঙ্গে রাখা হচ্ছে। এই নিয়ে যাত্রী হয়রানির শিকার হন। অনেক সময় যাত্রীদের ব্যাগ ও পকেটে কৌশলে ইয়াবা রেখে যাত্রীদের ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে বিস্তর। এমন সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নগর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনা ছিল, চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশিকালে কোনো অবস্থাতেই সোর্স রাখা যাবে না। শুধুমাত্র পুলিশ সদস্যরাই তল্লাশি করবেন। কিন্তু এই নিয়ম মানা হচ্ছে না চেকপোস্টগুলোতে।

গত শুক্রবার আকবরশাহ থানার সিটিগেট এলাকায় সৌদিয়া পরিবহনের একটি বাস তল্লাশির সময় দেখা যায়, শাহ আলম নামের একজন উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্বে চারজন পুলিশ সদস্য এবং একজন সাদা পোশাকধারী সোর্স ওঠেন বাসে। বাসে একজন পুলিশ কনস্টেবলের পরই সোর্স উঠেন। এই সোর্স ওঠার পর পর পুলিশের অন্য সদস্যরা বাসে উঠেন।

সোর্স কয়েকজন যাত্রীকে প্রশ্ন করেন, এই ব্যাগটি কার? কই যাচ্ছেন? সঙ্গে কে আছে?-এসব তথ্য জানার পর তিনি একজন যাত্রীকে ব্যাগ খুলতে বলেন। তাঁর পেছনে থাকা পুলিশ কনস্টেবলও যাত্রীদের নানা প্রশ্ন করছিলেন।

বাসে ওঠা পুলিশ সদস্যদের একজন ছিলেন আকবরশাহ থানার উপ-পরিদর্শক শাহ আলম। তল্লাশির সময় সাদাপোশাকে সোর্স সঙ্গে না রাখার বিষয়ে পুলিশ কমিশনারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেন সোর্স রাখা হয়েছে?-কালের কণ্ঠের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো পুলিশ সদস্য। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আছি। আমরা তো কোনো যাত্রীর পায়ে হাত দিয়ে জুতা তল্লাশি করতে পারি না। এই কারণে জুতা তল্লাশির জন্যই সাদা পোশাকে তাঁকে (সোর্সের দিকে ইঙ্গিত করে) রাখা হয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষ নন, কমিউনিটি পুলিশ সদস্য।’ মানুষের শরীর তল্লাশির আইনগত সুযোগ রয়েছে পুলিশের। কিন্তু জুতা তল্লাশির জন্য আলাদাভাবে সোর্স রাখা যাবে? এমন কোনো নির্দেশনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আছে কি না? জবাবে তিনি বলেন, ‘জুতা তল্লাশির জন্যই রাখা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ নেই।’

এরই মধ্যে দেখা গেল, একজন যাত্রীকে নিচে নামিয়ে যাওয়া হলো। গাড়ির সাইডবক্সে ওই যাত্রীর মালামাল পরীক্ষা করা হচ্ছিল। এই মধ্যে আবদুল ওয়াহেদ নামের আরেক যাত্রী নিচে নামলেন সাইডবক্স খোলা হয়েছে দেখে। কয়েক মিনিট পর দুজনই গাড়িতে ওঠে এলেন। দুই যাত্রীই কিছুটা ক্ষুব্ধ। পুলিশ সদস্যরা ডেকে না নিলেও কেন নিচে নামলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ওই যাত্রী বললেন, ‘ভাই, আর বলবেন না। সোর্সরা তল্লাশির সময় কৌশলে কয়েকপিস ইয়াব রেখে দেয়। তারপর ব্যাগের মালিককে গাড়ি থেকে নামিয়ে হেনস্তা করা হয়। শেষে টাকা নিয়ে ছাড়ে। আমি একবার এমন বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলাম। সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে টাকা দিয়ে নিজকে মুক্ত করেছিলাম। এরপর থেকেই ব্যাগ তল্লাশির মুখে পড়লে আমি নিজেই উপস্থিত থাকি। যদি আবার অঘটন ঘটে?’

তিনি বলেন, ‘আজও দেখলাম, নিচে আরও চারজন সাদাপোশাকধারী সোর্স আছে। তারাই ব্যাগ তল্লাশি করল।’

সোর্স নিয়ে গাড়ি তল্লাশির বিষয়ে জানতে চাইলে আকবরশাহ থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোর্স সঙ্গে নিয়ে গাড়ি ও বা যাত্রী তল্লাশির নিয়ম নেই।’ কিন্তু সোর্স থাকার বিষয়টি এই প্রতিবেদক নিশ্চিত করার পর তিনি বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই সোর্স রাখা যাবে না। এই বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া আছে। বিষয়টি আমি দেখছি।’

অফিসার ইনচার্জ ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ফোন করে প্রতিবেদককে জানান, ‘ওই চেকপোটে দায়িত্বপালনরত উপ-পরিদর্শকে দায়িত্ব থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে সরিয়ে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। জুতা তল্লাশির নামে সোর্স রাখার সুযোগ নেই। তাই তাত্ক্ষণিকভাবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা