kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আওয়ামী লীগের বড় পদে বিএনপির বিতর্কিতরা!

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আওয়ামী লীগের বড় পদে বিএনপির বিতর্কিতরা!

খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও দীঘিনালায় বিএনপির বিতর্কিত ব্যক্তিরা এখন আওয়ামী লীগের বড় পদ পেয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, নাশকতা সৃষ্টি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্মের হোতা বিএনপির আলমগীর হোসেন পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় জেলাজুড়ে তোলপাড় চলছে। অন্যদিকে দীঘিনালায় বিএনপির দাতা সদস্য ও যুবদল নেতা মো. আব্দুল বারেক ও মো. মনির ফরাজিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের হামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ক্ষত শুকানোর আগেই তাঁরা হয়ে গেছেন আওয়ামী লীগের বড় নেতা। মূলত দলের অভ্যন্তরে দলাদলি, অর্থের লেনদেনসহ যোগদানকারীদের প্রতি বিশেষ নেতাদের সুনজর এবং ডেলিগেটদের প্রভাবিত করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের।

জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা সত্যিই ঘটে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করছি। বিতর্কিতরা কীভাবে কমিটিতে ঠাঁই পেল সেটিও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে কমিটিগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হবে।’

কেবল ওই তিনজন নন; গোটা জেলায় এমন বেশ কজন বিতর্কিত ব্যক্তি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনে ঢুকে পড়েছেন। এ ছাড়া দীঘিনালার ৫টি ইউনিয়ন কমিটিতেও যোগদানকারীদের সংখ্যাই বেশি। ফলে উপজেলা কাউন্সিলে এর প্রভাব পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ওঠেছে পানছড়ির আলমগীরকে নিয়ে। সদ্য সমাপ্ত পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের মাধ্যমে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে হামলা চালিয়ে আহত করা, এলাকা ছাড়া করা এবং বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাজির হোসেনের ওপর গুলি চালানোর মামলারও এক নম্বর আসামি আলমগীর হোসেন ওরফে বিদেশি আলমগীর। ১৯৯২ সালে একটি সিগারেট কম্পানির গাড়ি ডাকাতির মামলায় আসামি হয়ে বিদেশ পাড়ি জমানোর কারণে বিদেশি আলমগীর নামে তাঁর পরিচয় ঘটে। কেউ কেউ তাঁকে বিড়ি আলমগীরও বলে থাকেন।

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শ্রীকান্ত দেব মানিক অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ১৫ জানুয়ারি আলমগীর হোসেনসহ বিএনপির ক্যাডাররা তাঁকে ও উপজেলা যুবলীগ সম্পাদক নাজির হোসেনকে কুপিয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওবায়দুল হক ও আওয়ামী লীগ কর্মী আব্দুল করিমকে মারধর করেছে। ওই মামলায়ও আলমগীর হোসেনকে আসামি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি অনুমোদিত পানছড়ি উপজেলা যুবদলের সদস্য আলমগীর হোসেন। ২০১৩ সালে পানছড়ি দমদম জিয়া স্মৃতি সংসদের সর্বশেষ সভাপতি ছিলেন নব্য আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর।

এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মোমিন। তিনি বলেন, ‘আলমগীর সম্পর্কে জানি যে সে বিদেশে ছিল; বিদেশি আলমগীর নামে পরিচিত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত হল এবং ঢুকল, এ বিষয়ে আমি অবগত নই।’

পানছড়ির নতুন সাধারণ সম্পাদক বিজয় কুমার দেব বলেন, ‘সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় তাকে নিয়ে বিপদেই পড়েছি।’ কিছু কাউন্সিলর টাকা-পয়সা খেয়ে বিতর্কিত লোকটিকে ভোট দিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক বানিয়েছে বলেও আশঙ্কা নতুন সাধারণ সম্পাদকের।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাথ দেব বলেন, ‘মূলত আওয়ামী লীগে বাহার-মোমিন গ্রুপিংয়ের সুযোগে এমন বিতর্কিত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগে এসেই এত বড় পদ পদবি দখল করে নিয়েছেন; যা দুঃখজনক।’

এদিকে দীঘিনালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন আওয়ামী লীগে যোগদান করা বিএনপি সদস্য মো. আব্দুল বারেক এবং মো. মনির ফরাজি। বারেক ছিলেন উপজেলা যুবদলের সক্রিয় নেতা এবং বিএনপির দাতা সদস্য। ৫ বছর আগে আওয়ামী লীগে যোগদানের এক সপ্তাহের মাথায় রাতারাতি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি পদ লাভ করেন। বছর তিনেক ধরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা হুট করে কবাখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হন; যখন উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের প্রস্তুতি চলছিল। আশ্চর্যজনকভাবে তিনিই নির্বাচিত হয়ে গেলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক! একা তিনি নন; যোগদানকারী মো. মনির ফরাজিও তৃতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ডেলিগেট দীপংকর নারায়ণ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটিতে যোগদানকারীরাই বেশি সংখ্যায় ঢুকে পড়ায় দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারা এ দুটি পদে স্থান পাননি।

মেরুং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রহমান কবির রতন বলেন, ‘এখন টাকার কাছে নীতি বিক্রি হয়; সে কারণে বিতর্কিতরা পদ পদবি পাচ্ছেন। প্রকৃত যারা আওয়ামী লীগের তাঁরা টাকার কাছে হেরেছেন। দুটি সাংগঠনিক পদ দখলে নিলেন যোগদানকারীরা।’

আওয়ামী লীগ কর্মী মো. আরিফ অভিযোগ করেছেন, ‘এই বারেক বিএনপি আমলে আমাদের নির্যাতন করেছেন। বাড়ি ছাড়া করেছেন, এখন প্রভাবশালী নেতাদের হাত ধরে সে-ই আওয়ামী লীগের বড় নেতা।’

কবাখালী ইউপি সদস্য ও উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নওশাদ বলেন, ‘এতদিন দল করে বিএনপির নির্যাতন স্বীকার করেও আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারিনি; আর সেদিনকার বিএনপি নেতারাই বনে গেছেন আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা।’

দীঘিনালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিদ্যুৎ বরণ চাকমা জানান, কাউন্সিলের মাধ্যমে তাঁরা নির্বাচিত হওয়ায় কিছু করার নেই। তবে, অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে দলের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা