kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’

বাঁশখালী বাঁচল বেড়িবাঁধে

বৃষ্টি-জোয়ারে আনোয়ারায় ফসল বীজতলা মৎস্যঘেরের ক্ষতি

নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা ও উজ্জ্বল বিশ্বাস, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাঁশখালী বাঁচল বেড়িবাঁধে

বাঁশখালী উপকূলে নবনির্মিত বেড়িবাঁধের কারণে ঘূর্ণিঝড়ে জোয়ারের পানি ঢুকতে পারেনি এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

আনোয়ারার উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী দুই লাখ মানুষের মাঝে শনিবার ও রবিবার ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আতঙ্ক বিরাজ করলেও শেষ পর্যন্ত এটি সুন্দরবন ও এর আশপাশ এলাকায় আঘাত হেনে দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে এখানকার মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসলেও টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে মৎস্যঘের, মাঠের ফসল, গাছপালা, রবিশস্য ও বীজতলার ক্ষতি হয়েছে। তবে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি লক্ষ করা গেছে।

৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করা হলে আনোয়ারা উপকূলে বসবাসকারী দুই লক্ষাধিক মানুষের মাঝে ভয় ও আতঙ্ক বাড়তে থাকে। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দুর্যোগের ভয়াবহতা এড়াতে উপকূলীয় গ্রামগুলোতে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা, সতর্কতামূলক প্রচার, সাইক্লোন সেল্টারে লোকজন আনা-নেওয়া এবং তাঁদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণসহ সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন।

তবে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও শনিবার বিকেল থেকে টানা দুই দিন বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকা রায়পুর, গহিরা, সরেঙ্গা, দক্ষিণ গহিরা, জুঁইদণ্ডি, বরুমচড়া, বারশত, হাইলধর, পরৈকোড়া, চাতরী, আনোয়ারা, বৈরাগ, বারখাইনসহ বিভিন্ন এলাকায় মাঠের ফসল, সবজি ক্ষেত, বীজতলাসহ চিংড়ি ঘেরের ক্ষতি হয়।

রায়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জানে আলম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর পরও বারআউলিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ খোলা থাকায় ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে ছিল।’

আনোয়ারা উপজেলা কৃষি অফিসার হাসানুজ্জামান জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ধানের মাঠ, রবি ফসল ও বীজতলার কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা নিজ নিজ ব্ল্নকের আওতায় কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

আনোয়ারা উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেডিক্যাল টিম, শুকনো খাবার, পানীয় জলসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়টি সুন্দরবনে আঘাত হেনে দুর্বল হয়ে পড়ায় আল্লাহর রহমতে আনোয়ারা বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছি।

বাঁশখালী : নবনির্মিত ২৯১ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ এবং প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সতর্কতার কারণে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেল বাঁশখালী উপকূল। মুষলধারে বৃষ্টিতে রবিশস্য ও ফসলি জমির ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিলে কৃষি কর্মকর্তা ও চাষিদের বিচক্ষণতায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে পরিস্থিতি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার নির্ঘুম কাটিয়েছেন শনিবার রাত। ছুটে গেছেন দুর্গত জনপদে। উপকূলে আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের নিজ হাতে চিড়া, মুড়ি ও গুড় বিতরণ করেন। তাঁর নির্দেশে প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা উপকূলের ১০ ইউনিয়নে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ছিলেন। বাঁশখালীতে ১০২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছিল। উপকূলের ১০ ইউনিয়নে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ১ হাজার ৬৫ জনের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে।

বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী মোহাম্মদ গালিব সাদলী বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছেন।

সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বাঁশখালীবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া উপহার নবনির্মিত বেড়িবাঁধই বাঁশখালীবাসীকে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে সবচেয়ে বেশি রক্ষা করেছে। কোথাও এক ফোঁটা জলোচ্ছ্বাসের লোনা পানিও ঢুকতে পারেনি।’

ছনুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়কে মোকাবেলা করতে প্রশাসনের নির্দেশে রাত জেগে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সতর্ক করেছি। আমার ইউনিয়নে কাউকে ভোগান্তিতে পড়তে দিইনি।’

খানখানাবাদের চেয়ারম্যান মো. বদরুদ্দিন বলেন, ‘কয়েক দশকের প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে খানখানাবাদের মানুষ শুধুই স্বজন হারিয়েছে আর লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছিল জনপদ। এবার বেড়িবাঁধের কারণে মানুষের মনে ভীতি ও শঙ্কা ছিল না। কোথাও ক্ষতি হয়নি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, ‘বাঁশখালীর সকল জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস বাহিনী ও সিপিপি স্বেচ্ছাসেবকসহ সবাই আন্তরিকভাবে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। এভাবে আমাদের প্রত্যেককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা