kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মায়ের হাতে মেয়ে ও স্বামী খুন

‘বিকলাঙ্গ’ সমাজের চিত্র

সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বিকলাঙ্গ’ সমাজের চিত্র

সাম্প্রতিককালে পরকীয়া প্রেম ঘিরে পারিবারিক কলহ এবং স্বামী-স্ত্রী খুনাখুনির বেশ কটি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িতদের স্বজনরাও বলি হন। গত শনিবার নগরের বন্দর থানায় ঘটেছে আরো করুণ ঘটনা। পরকীয়ার কারণে মায়ের ছুরিকাঘাতে মারা গেছে চার বছর বয়সী মেয়ে। আর প্রেমিককে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে স্বামীকেও।

পৃথিবীতে বাবা-মায়ের কোল সন্তানদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ। এমন নিরাপদ কোলে ছুরিকাঘাতে জীবন দিতে হয়েছে অবুঝ শিশু বিবি ফাতেমাকে। আবার মেয়েকে হত্যার পর ঠাণ্ডা মাথায় মা হাছিনা বেগম অপেক্ষায় ছিলেন স্বামীর ফেরা পর্যন্ত। এর পর প্রেমিক মাঈনুদ্দিনের সঙ্গে মিলে স্বামীকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর প্রেমিক পালিয়ে যায়। আর নিজের কাপড় পাল্টে সন্তান-স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় কান্নায় ভেঙে পড়েন হাছিনা বেগম নামের ওই নারী। অথচ তিনিই দুজনকে হত্যা করেছেন প্রেমিকের সহযোগিতায়।

সুনামগঞ্জে বাবা-চাচার হাতে শিশু তুহিনের মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশ মর্মাহত। বাবা কীভাবে শিশু সন্তানের হত্যায় জড়িত থাকতে পারে! এমন বিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই চট্টগ্রামবাসী দেখলেন পরকীয়া প্রেমের কারণে নিজের সন্তানের গলায় ছুরি চালিয়েছেন মা!

বাবার হাতে ছেলে খুন, সন্তানের হাতে বাবা-মা খুন-এমন সব ঘটনা সামাজিক মূল্যবোধহীনতার স্পষ্ট চিত্র বলেই মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘মায়ের ছুরিকাঘাতে মেয়ের মৃত্যু-এটা বিকলাঙ্গ সমাজের চিত্র। একটি সমাজ বিকলাঙ্গ হয়ে পড়লে এমন ঘটনা ঘটে। সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় বন্ধনগুলো বিকলাঙ্গ সমাজে বিকল হয়ে পড়ে। এই কারণে বিকলাঙ্গ সমাজ থেকে সভ্য কিছু আশা করা যায় না। এককথায় সভ্যতার বিপরীত রূপ হচ্ছে বিকলাঙ্গ সমাজ।’

এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সভ্যতার আলোয় সমাজকে আলোকিত করতে হবে। এ জন্য সর্বস্তরের সচেতন মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি।’

তাঁর মতে, ‘নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে পরকীয়ার মতো অনৈতিক সম্পর্কগুলো বাড়ছে। এসব কারণে খুনাখুনির মতো জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধে জড়াচ্ছেন অতি আপনজনরা। তাই সামাজিক, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা প্রত্যেকের জন্য জরুরি।’

‘বিকলাঙ্গ’ সমাজের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য খণ্ডচিত্র : সৎ মায়ের হাতে সন্তান খুনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি। সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের হিঙ্গারিপাড়া এলাকায় সৎ মা শামীমা আক্তার হত্যা করে ছয় বছরের শিশু হাসান রাজুকে। ৩১ জানুয়ারি নগরের চান্দগাঁও থানার বাসিন্দা ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ আত্মহত্যা করেন স্ত্রীর পরকীয়া প্রেম সহ্য করতে না পেরে। মৃত্যুর আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর পরকীয়ার অভিযোগ তোলেন। ওই ঘটনায় ডা. মিতু গ্রেপ্তার হন এবং পুলিশ মিতুর পরকীয়ার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ পায়।

২০১৮ সালের ১১ আগস্ট রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের এয়াছিননগর গ্রামের আবুল হাসেমকে হত্যা করেন স্ত্রী রুনা আক্তার ও তাঁর প্রেমিক জাহেদ। দুজনই আদালতে জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেন। 

২০১৭ সালের ২১ অক্টোবর মিরসরাই উপজেলায় ওমর ফারুককে হত্যা করেন তাঁর সাবেক স্ত্রী জেসমিন সুলতানা সোনিয়া ও তাঁর প্রেমিক রুবেল এবং শ্যালিকা আবিদা সোলতানা। একই বছরের ২২ মার্চ বায়েজিদ বোস্তামী থানার শহীদনগর এলাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র মোহাম্মদ আলাউদ্দিন চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। ইয়াছমিন আক্তার রুম্পা নামের এক নারীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেমের কারণে রুম্পা ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে হত্যা করে। 

২০১৬ সালের ১৯ নভেম্বর হালিশহর থানার মধ্যম রামপুর কেতুরা মসজিদ এলাকায় আবদুল বাতেন খোকনকে হত্যা করে তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার। একই বছরের ২৬ অক্টোবর পতেঙ্গা থানার বাসিন্দা রিদুয়ান তাঁর স্ত্রী আয়েশা মনিকে পরকীয়ার জেরে হত্যা করে নিজেই র্যাব কার্যালয়ে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এর আগে ২ মার্চ কোতোয়ালী থানার ফিরিঙ্গিবাজার এয়াকুব নগরে স্ত্রী আছমা আক্তারের সঙ্গে খালু মাকসুদুর রহমানের পরকীয়া চলছে-এমন অভিযোগে স্ত্রী ও খালুকে হত্যা করে হৃদয় নামে এক ব্যক্তি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা