kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

ট্রাফিক পুলিশ ব্যস্ত ‘বখরা’ আদায়ে

গ্রামের অটোরিকশা নগরে : মাসে কোটি টাকার টোকেনবাণিজ্য

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ট্রাফিক পুলিশ ব্যস্ত ‘বখরা’ আদায়ে

চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কে যাত্রীর অপেক্ষায় গ্রামের অটোরিকশার সারি। গতকাল সকালে হামজারবাগ এলাকা। ছবি : কালের কণ্ঠ

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা। নগরের ব্যস্ততম মুরাদপুর স্টেশন। মানুষ ও গাড়ির জটলায় কোলাহলমুখর। রিকশাগুলো গিয়ে যাত্রী নামাচ্ছে ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ির কাছে। আবার যাত্রী নিচ্ছে মুরাদপুর মোড়েই। ফলে যানজট বেড়েছে। কয়েকটি গাড়ি সামনে এগোনোর জন্য হর্ন দিয়ে যাচ্ছে। সেই জটলা সরানোর জন্য ট্রাফিক পুলিশের সেদিকে ফুসরতই যেন নেই।

অক্সিজেন থেকে মুরাদপুর পৌঁছা একটি কাভার্ড ভ্যান দেখেই সিগন্যাল দিলেন একজন ট্রাফিক পুলিশ। যানজটের কারণে এমনিতেই সেখানে গাড়ির গতি কম। চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ হতেই গাড়ির গতি আরো কমানো হলো। মুহূর্তেই কাভার্ড ভ্যান চালাকের আসনের কাছাকাছি পৌঁছলেন একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। আর কাছে পৌঁছতেই কাভার্ড ভ্যান চালক ডানহাত বের করে দিলেন। মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভেতরে যে টাকা আছে সেটা বোঝা গেল, মুষ্টিবদ্ধ হাতে টাকার একাংশ দেখা যাওয়ায়। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যও মুহূর্ত বিলম্ব না করে প্যান্টের ডান পকেটে হাত ঢোকালেন। নির্বিঘ্নে বহদ্দারহাটমুখী পথ ধরে চলে গেল কাভার্ড ভ্যান। অথচ দিনের বেলা নগরীতে কাভার্ড ভ্যান চলাচল নিষিদ্ধ। তবে শুধু বিজিএমইর স্টিকারযুক্ত গাড়িগুলো চলাচলের অনুমোদন রয়েছে।

অথচ, কিছুদিন আগে নগরে দিনের বেলায় কাভার্ড ভ্যান চলাচলের দৃশ্য সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিলেন নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান। তখন তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন এবং এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকার জন্য ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনা বেমালুম ভুলে ট্রাফিক পুলিশ সেই পুরনো রীতিতে ফিরেছে কাভার্ড ভ্যান চালকের সঙ্গে ‘মুষ্টিবন্ধুত্বের’ মাধ্যমে।

মুরাদপুরে যখন ট্রাফিক পুলিশ ও কাভার্ড ভ্যান চালকের ‘মুষ্টিবন্ধুত্ব’ চলছিল, তখন তাঁর পাশেই একটি অটোরিকশা ইউটার্ন করল। সেটি অক্সিজেন দিক থেকে এসে মুরাদপুরে ইউটার্ন করে পুনরায় অক্সিজেন সড়ক ধরেছে। চালক যাত্রী ডাকছেন ‘হাটহাজারী’, ‘হাটহাজারী’ বলে। ‘চট্টগ্রাম-থ’ লেখা এসব গাড়ি ‘গ্রামগাড়ি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত।

এবার অক্সিজেন সড়ক ধরে কিছুটা সামনে গিয়ে দেখা গেল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ‘গ্রাম’ অটোরিকশা। সব অটোরিকশার গন্তব্য হাটহাজারীসহ অন্যান্য এলাকা। যাত্রী নিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে গ্রাম অটোরিকশাগুলো। গ্রাম অটোরিকশা বলতে যেসব গাড়ির নম্বর ‘চট্টগ্রাম-থ’ দিয়ে শুরু হয়েছে সেগুলোকে বোঝানো হয়। এসব গাড়ি শহরে চলাচল নিষিদ্ধ। শুধু চট্টগ্রাম জেলা এলাকায় এসব অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে-এটাই আইন। কিন্তু আইন অমান্য করে গ্রাম অটোরিকশাগুলো দেদারছে চলছে নগরে।

আরো সামনে এগিয়ে হামজারবাগ মোড়ে পৌঁছে দেখা গেল, ‘চট্টগ্রাম’ অটোরিকশার দীর্ঘসারি। এখানে দীর্ঘ সারি করে দাঁড়িয়ে কেন? প্রশ্ন করতেই উত্তর দিলেন চালক আবু হানিফ। বললেন, ‘এই গাড়ি হিলভিউ আবাসিক এলাকায় যায়। মানে, হামজারবাগ-হিলভিউ রুটের গাড়ি এগুলো।’ নগরীতে নম্বরবিহীন বা চট্টগ্রাম জেলার জন্য রেজিস্ট্রেশনকৃত অটোরিকশাগুলো কীভাবে ‘নিজস্ব রুট’ তৈরি করল? প্রশ্নের জবাবে চালকের সোজা উত্তর, ‘আমরা তো মাসে মাসে টাকা দিই, টাকা ছাড়া কী এসব হয়?’ তিনি প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কে? কোথায় যাবেন বলুন। হিলভিউ গেলে সামনের গাড়িতে উঠুন। আমার সিরিয়াল আরো পরে।’ এ প্রতিবেদক সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমরা মাসিক ভিত্তিতে টাকা দিয়ে এই লাইনে গাড়ি চালাই।’ কাকে কত টাকা দিয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি গত সপ্তাহ থেকে এই গাড়ি চালাচ্ছি। আগের চালক চলতি মাসের লাইন খরচ দিয়েছে। আমি শুধু লাইনম্যানদের দৈনন্দিন টাকা দিই। তাই বিস্তারিত বলতে পারব না।’

হিলভিউ আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, সেখানে রীতিমতো অটোরিকশা স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে। কেউ যাচ্ছেন মুরাদপুর, কেউ বা হামজারবাগ আবার অন্য লাইনের গাড়ি যাচ্ছে ষোলশহর দুই নম্বর গেট। সবগুলোই ‘গ্রাম গাড়ি’।

একাধিক চালক জানিয়েছেন, মাসিক ভিত্তিতে টাকা দিয়ে লাইনে অটোরিকশা চালাতে হয়। হিলভিউ আবাসিক এলাকায় শহরের অটোরিকশার (চট্টমেট্রো সিরিয়াল) কোনো নির্ধারিত রুট নেই। সেই কারণে ‘চট্টগ্রাম’ গাড়িগুলো নিয়ে নতুন রুট করা হচ্ছে।

ট্রাফিক পুলিশ, অটোরিকশা চালক ও মালিক পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নগরে ১৩ হাজার অটোরিকশা অনুমোদন দিয়েছে। ‘চট্টমেট্রো’ রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত অটোরিকশাগুলো নগরে এবং ‘চট্টগ্রাম’ রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত অটোরিকশাগুলো চট্টগ্রাম জেলাপর্যায়ে চলাচলের কথা। সেই নির্দেশনা অমান্য করে নগরেই চলছে ‘চট্টগ্রাম’ রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত অটোরিকশা। এর মধ্যে ২০০০ সালে নিবন্ধন বাতিল হওয়া টু স্ট্রোক গাড়িগুলোর নম্বর ব্যবহার করেও অনেক গাড়ি নগরে চলছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ‘গ্রাম’ অটোরিকশার সামনের অংশ হলদু রঙের হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইন মানা হয় না। এই অপরাধে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ গাড়িগুলো আটকও খুব বেশি করে না। আবার নগরে ট্রাফিক পুলিশ, ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও এক শ্রেণির সাংবাদিক নিজদের মধ্যে যোগসাজশ করে গাড়িগুলো চলাচলের সুযোগ তৈরি করছে মূলত অবৈধ অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে। এসব অবৈধ লাইনে ২০-২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে গাড়ি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার পর মাসিক টোকেন ভিত্তিতে গাড়িগুলো চলে। নগরে চলাচলরত অন্তত চার হাজার গ্রাম অটোরিকশা থেকে মাসে গড়ে তিন হাজার টাকা হারে চাঁদাবাজি হচ্ছে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা।

মুরাদপুরে একদল ট্রাফিক পুলিশ সদস্য নিয়ে যানজট নিরসনের দায়িত্বপালন করছেন নগর ট্রাফিক পুলিশ উত্তর বিভাগের সার্জেন্ট নিজাম উদ্দিন। কিন্তু দুপুরে তাঁকে মুরাদপুরে দেখা যায়নি। বিকেল সাড়ে তিনটায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি মুরাদপুরে দায়িত্বপালন করছি।’ ‘চট্টগ্রাম’ রেজিস্ট্রেশন পাওয়া কিংবা রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়িগুলো মুরাদপুর পর্যন্ত কীভাবে আসছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সকালেও দুটি গাড়ি ধরা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পত্রিকাবাহী অটোরিকশা হওয়ায় সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যটি জব্দ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রেললাইনের পরে হয়তো গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে পারে।’ মাসিক টোকেন দিয়ে অর্থ আদায়ের বিনিময়ে গ্রাম অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না।’

দিনের বেলায় কাভার্ড ভ্যান চলাচল নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা টাকার বিনিময়ে কাভার্ড ভ্যান চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি যখন এসেছেন, তখন আমাকে ফোন দিতেন। আমার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।’ কাভার্ড ভ্যান চালকের কাছ থেকে টাকা টাদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক কনস্টেবলদের কতোক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখা যায়? হয়তো আমি কোনো গাড়ির কাগজপত্র দেখছি কিংবা মামলা দিচ্ছি, এই ফাঁকে তারা কি করছে আমি বলতে পারব না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা