kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভাড়ায় চলে ব্যক্তিগত হাজারো গাড়ি

পুলিশের ‘টোকেন বাণিজ্য’

মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুলিশের ‘টোকেন বাণিজ্য’

চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ব্যক্তিগত হাজারো গাড়ি চালানো হচ্ছে ভাড়ায়। যদিও ভাড়ায় ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো আইন পরিপন্থী। এসব গাড়ির কোনো স্ট্যান্ড না থাকায় সড়কেই পার্কিং করা হয়। এতে অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। আর এই লেনদেনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন পুলিশ, পরিবহন শ্রমিক নেতা ও রাজনৈতিক নেতারা। চলছে ‘টোকেন বাণিজ্য’। বছরের পর বছর ধরে পরিবহন সেক্টরে এমন অনিয়ম চললেও স্থায়ী সমাধানের কোনো পথ খোঁজা হচ্ছে না।

এদিকে ভাড়ায়চালিত ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে বিআরটিএর আইনে জরিমানার বিধান থাকলেও জরিমানা আদায়ে নগর ও জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে দুই ধরনের নিয়ম চালু রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জরিমানা আদায়ের পর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের রসিদ দেওয়া হয় না। এই ধরনের গাড়ির চালানোর জন্য জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে মাসিক ২ হাজার টাকার টোকেন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। টোকেনবিহীন গাড়ি মামলা ও জরিমানার শিকার হয়।

বিআরটিএর সহকারী পরিচালক শাহ আলম বলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চালানো অবৈধ। ভাড়ায় চালাতে হলে রাইড শেয়ারিং আইনে রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। এ ধরনের গাড়ির জন্য আমরা মোবাইল কোর্ট করে মামলা দিচ্ছি। এখন আমাদের ডিপোতে শতাধিক গাড়ি জব্দ রয়েছে।’

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) হারুণ-অর-রশিদ হাযারী বলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চালাতে হলে রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। এসব গাড়ির নাম্বার ও গাড়ির কালার ভিন্ন ধরনের। আমরা এ ধরনের গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছি।’

সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন অপরাধে যানবাহনের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হচ্ছে। তবে অবৈধ পার্কিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়ে থাকে। অবৈধ পার্কিং নিয়ে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা করা যায়। আর গাড়ি মালিক ও চালক না থাকলে গাড়ি আটক করা হয়।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাড়ায় চালিত কয়েক হাজার মাইক্রোবাস, নোহা ও কার রয়েছে। এসব গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। দেখা যায়, গাড়িগুলো নগরের বহদ্দারহাট মোড়, লালদিঘি পাড়, কাতালগঞ্জ, অলংকার মোড়, পোর্টকানেকটিং রোডসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পার্কিং করে যাত্রী পরিবহন করছে। জেলার প্রতিটি উপজেলা সদরে এই ধরনের হাজারো গাড়ি ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। মানুষের ব্যক্তিগত কাজে, বিয়েসহ নানা অনুষ্ঠানে এসব গাড়ির ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে।

এসব গাড়ির মালিক ও চালকরা জানান, ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চললে বিআরটিএর ১৫২ ধারায় সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নগরে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা জরমািনা করা হলেও নগর পুলিশ গাড়ি চালকদের জরিমানা গ্রহণের রসিদ প্রদান করে থাকে। কিন্তু জেলা পুলিশ ২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করলেও কোনো রসিদ দেয় না।

একই জেলায় দুই আইন কী ভাবে চলে এমন প্রশ্ন মালিক ও চালকদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন মালিক জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চালাতে মাসে ২ হাজার টাকা করে জেলা ট্রাফিক বিভাগ থেকে টোকেন নিতে হয়। টোকেন ছাড়া গাড়ি চালালে মামলা দেওয়া হয়। তবে জেলা পরিদর্শক (ট্রাফিক) নজরুল ইসলাম রসিদ না দেওয়া এবং টোকেনের  অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি খাগড়াছড়ি, নাজিরহাট ফটিকছড়িসহ চট্টগ্রাম উত্তরের একাংশের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন হাজারো বাস মাইক্রোসহ যানবাহন চলাচল করে। এসব বাস ও গাড়ির জন্য স্থায়ী কোনো টার্মিনাল নেই। আগে ষোলশহর সড়কের উপর পার্কিং করে উত্তর চট্টগ্রামমুখী যানবাহনগুলো চলাচল করত। গত কয়েক বছর ধরে ষোলশহর থেকে সরিয়ে অক্সিজেন মোড়ে সড়কে পার্কিং করে যাত্রী পরিবহন করছে এসব বাস। পরিবহন মালিক সমিতিগুলো দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। অক্সিজেন মোড় অত্যন্ত ব্যস্ততম জংশন। এখানের সড়কে পার্কিংয়ের কারণে নিত্য যানজট লেগে থাকে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম নাজিরহাট-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম মঞ্জু বলেন, ‘আমরা মুরাদপুরে ছিলাম। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আমাদেরকে অক্সিজেনে নিয়ে আসা হয়েছে। উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন ৬০০/৭০০ বাস চলাচল করে। এখানে আমরা নানা সমস্যার মধ্যে আছি। পুলিশের টোকেন বাণিজ্যের কারণে আমরা অতিষ্ঠ। চাঁদাবাজি ও হয়রানির কারণে গাড়ি চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কুলগাঁও এলাকায় একটি স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। জায়গা অধিগ্রহণ করে ১২ একর জায়গার উপর এটি নির্মাণ করা হবে।’

অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের গাড়ির জন্যও স্থায়ী কোনো টার্মিনাল নেই। এসব গাড়ি বিআরটিসি মার্কেট, দামপাড়া, অলংকার, কর্নেলহাট, বহদ্দারহাট মোড় এলাকায় (ভোলাগামী) গাড়ি পার্কিং করে চলাচল করছে। তারাও সিডিএর কাছে একটি স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের দাবি করে আসছে অনেক দিন ধরে। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে প্রতিদিন ১২০০/১৩০০ বাস চলাচল করে। গত ৩০/৩৫ বছর যাবত নগরের ভেতরে কদমতলী এলাকায় রেলওয়ে থেকে জায়গা লিজ নিয়ে আন্তঃজেলা বাসগুলো যাত্রী পরিবহন করছে।

এ ব্যাপারে আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কোনো টার্মিনাল নেই, বাস ডিপো নেই। পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পাশে জায়গাটিতে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য আমরা সিডিএ ও সিটি করপোরেশনের কাছে দাবি জানিয়েছি।’

তাঁর মতে, একটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের পাশে গরুর বাজার শোভা পায় না। জায়গাটির চারপাশে সড়ক রয়েছে। টার্মিনাল হলে যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধা হত। তবে এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাড়া পাইনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা