kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাবা যখন সন্তান চোর!

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাবা যখন সন্তান চোর!

উদ্ধারের পর মায়ের কোলে শিশু আবিদা। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্বামী-স্ত্রী এক কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল তাঁদের পাশে ঘুমিয়ে থাকা ৯ মাসের কন্যাসন্তান আবিদা নেই। এর পর আশপাশে ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া গেল না শিশু আবিদাকে। পরদিন ৩১ আগস্ট সকালে বাবা-মা দুজনই থানায় গিয়ে মামলা করেন। মামলার বাদী হলেন মা।

শিশুসন্তান চুরির এ ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার বিকেলে তিনটার পর। পতেঙ্গা থানার দক্ষিণ পতেঙ্গা ফুলছড়ি পাড়ার লোহাগাড়া ভবনের নিচ তলার বাসা থেকে এই শিশু চুরি হয়। মামলা দায়েরের তিনদিনের মাথায় শিশু আবিদাকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

আর শিশু আবিদাকে চুরির দায়ে গ্রেপ্তার হলেন ওই শিশুর বাবা মনির হোসেন (৪২)। সঙ্গে গ্রেপ্তার হন আবিদার সৎ মা ও মনিরের প্রথম স্ত্রী রোজিনা বেগম (৩৫)। নিজের কন্যাসন্তানকে ছুরির দায় স্বীকার করে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু ছালেম মো. নোমানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বাবা মনির হোসেন। সঙ্গে সৎ মাও চুরি করা সন্তান নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে যাওয়া এবং সেখানে নিজের কাছে রেখে দেওয়ার তথ্য স্বীকার করেন।

মামলার বাদী ও মনির হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী রিনা বেগম মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, তিনি শরীয়তপুর জেলার পালং মডেল থানার স্বর্ণঘোষ গ্রামের কেরামত আলীর মেয়ে। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদ হওয়ার পর ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল মনির হোসেনকে দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথম সংসারের ১৬ বছরের এক সন্তান দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে থাকে। আর স্বামী মনির হোসেন বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্পের একজন কর্মকর্তার গাড়িচালক। গত শুক্রবার দুপুরের খাবার খাওয়ার পর বেলা তিনটার দিকে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন। সাড়ে তিনটায় মনির হোসেন বাইরে থেকে এসে ঘুম থেকে রিনা বেগমকে ডেকে তোলে জিজ্ঞেস করেন আবিদা কই? স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে বিস্মিত হয়ে রিনা দেখেন, তাঁর পাশে ঘুমিয়ে থাকা আবিদা নেই। পরক্ষণে স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, আপনিতো আমার পাশেই ঘুমিয়ে ছিলেন? আবিদা কই? তখন মনির হোসেন জবাব দেন, ‘আমি মুরগি খুঁজতে গিয়েছিলাম।’ এরপর স্বামী-স্ত্রী ও রিনার ছেলে আবু বক্করসহ আশপাশে আবিদাকে খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু আবিদাকে আর পাওয়া যায়নি।

পরদিন শনিবার সকালে পতেঙ্গা থানায় যান স্বামী-স্ত্রী দুজন। নিজেদের সন্তান চুরি হওয়ার তথ্য জানান পতেঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ উৎপল বড়ুয়াকে। পরে এই ঘটনায় রিনা বেগম বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্ত ও আবিদাকে উদ্ধারের তথ্য জানিয়ে পতেঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ উৎপল বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পরপরই বাবা মনির হোসেনকে সন্দেহ করে পুলিশ। এর পর প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে মনির হোসেনের দেওয়া কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ। এতে গড়মিল পাওয়ায় রবিবার দ্বিতীয় দফা মনিরকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে মনির স্বীকার করেন, তিনিই আবিদাকে চুরি করেছেন এবং প্রথম স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছেন। আবিদাকে নিয়ে প্রথম স্ত্রী চলে গেছেন ঢাকায়।’

কেন নিজের সন্তান চুরি?-এমন প্রশ্নের জবাবে মনির হোসেন জানান, তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দ্বিতীয় স্ত্রী রিনা বেগমের সঙ্গে আর সংসার করবেন না। তাই ঘটনার ২৫ দিন আগে পরিকল্পনা করেন, আবিদাকে চুরি করে প্রথম স্ত্রী রোজিনা বেগমের কাছে দিয়ে দেবেন। এর পর রিনাকে ডিভোর্স দিয়ে রোজিনাকে নিয়ে সংসার করবেন মনির। এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই ঢাকা থেকে রোজিনাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন গোপনে। আনার পর একটি ভাড়া বাসায় রাখেন এবং আবিদাকে চুরির সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার আবিদা ও রিনা বেগম ঘুমিয়ে পড়লে এক পর্যায়ে আবিদাকে তিনি কোলে নিয়ে বাইরে চলে যান এবং রোজিনার হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে ঢাকায় চলে যেতে বলেন। শেষে বাসায় ফিরে আবিদাকে খোঁজার নাটক করেন। কিন্তু মনির হোসেনের শেষ রক্ষা হয়নি। নিজের মেয়েকে চুরির অপরাধে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে। সঙ্গে প্রথম স্ত্রীকেও। দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাদ দিয়ে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে সংসার শুরুর আগেই স্বামী-স্ত্রীকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা