kalerkantho

৫০ বছরেও জমি ফেরত পাননি হালদার চরের কৃষকেরা

দখলদাররা সক্রিয়, বাড়ছে হয়রানি-নির্যাতন

কাজী আয়েশা ফারজানা, বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম)   

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৫০ বছরেও জমি ফেরত পাননি হালদার চরের কৃষকেরা

একসময় নদী নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হালদার চরের বাসিন্দাদের মৌরশী সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে। পরে অবশ্য প্রয়োজন না হওয়ায় জমিগুলো ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দখলদারদের অপতৎপরতায় দীর্ঘ পাঁচ দশকেও হালদার চরের এসব জমি বুঝে পাননি কৃষকেরা। দিন দিন গরিব ভূমিহীনদের ওই জমিতে অবৈধ দখলদারের আগ্রাসন বাড়ছে। বাড়ছে হয়রানি ও নির্যাতন।

হালদার চরের কৃষকের মালিকানাধীন জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে ‘আল নাজিম স্যালভেজ অ্যান্ড কেরিয়ার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনটি কৃষি ব্লকে ওই প্রতিষ্ঠান বন্দর থেকে ১২ একর জমি একসনা ইজারা নেয়। কিন্তু বন্দরের ফেরত দেওয়া জমিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতিষ্ঠানটি কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে একরের পর একর জমি দখল করছে। স্কেভেটর দিয়ে খনন করে পুকুর, সড়ক নির্মাণ করে স্থায়ী স্থাপনাও গড়ে তুলছে। এ ব্যাপারে প্রতিবাদকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ গরিব কৃষকদের ‘মিথ্যা চাঁদাবাজি’ মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

এসব কৃষিজমিতে যুগ যুগ ধরে চাষাবাদ করে আসা কৃষকদের চাষাবাদ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ওই প্রতিষ্ঠানের দুর্বৃত্তদের হামলা, মামলা ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ অসহায় কৃষক। ফলে ভূমিহীন কৃষিনির্ভর বোয়ালখালী ও রাউজানের প্রায় ২০০ কৃষক পরিবার অর্ধাহারে-অনাহার মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হালদার চরের এসব কৃষিজমি তাঁদের মৌরশী সম্পত্তি। ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া মৌজার ১২২.৬৫ একর, কচুখাইন মৌজার ৯.৭৫ একর এবং বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল মৌজার ০.৭০ একরসহ সর্বমোট ১৩৩.১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জমিগুলো বন্দরের কোনো প্রয়োজনে না আসায় ৩১ একর জমি রেখে বাকী জমি বিভিন্ন আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৯৮৮ সালের ৩ নভেম্বর জমির সাবেক মালিকদের ফেরত দিতে সুপারিশসহ জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রামকে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে খবরের কাগজে বিজ্ঞপ্তি জারির ব্যবস্থা করার কথাও উল্লেখ করা হয়। মালিকরা যাতে তাঁদের জমি ফেরত পান সেজন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ চিঠি দিয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক রাউজানের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ভূমিহীনদের মাঝে ভূমি বরাদ্দের নির্দেশ দেন। কিন্তু একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেই বন্দোবস্তি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। স্থগিত আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোট বেঞ্চে রিট করা হলে আদালত রুলনিশি জারি করেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশে দুটি তদন্ত হয়। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। হাইকোর্ট স্থগিত আদেশ বাতিল করে সরকারি সর্বশেষ নীতিমালার আলোকে জমি বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন। এর পর জমির মুল মালিকদের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা এম এ বশর জেলা প্রশাসকের কাছে হাইকোর্টের রিট মামলার নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং জমি ফেরতের কার্যক্রম গ্রহণের জন্য আদালতের আদেশের কপিসহ আবেদন করেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর করা অভিযোগে জানা গেছে, আনোয়ারা এলাকার বাসিন্দা মো. নাজিম উদ্দিন তাঁর প্রতিষ্ঠান আল নাজিম স্যালভেজ অ্যান্ড কেরিয়ার্সের নামে নোয়াপড়া ও কধুরখীল মৌজায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২৭, ২৮ ও ২৯ নম্বর কৃষিব্লকভুক্ত জায়গা ইজারা নেন। লাইসেন্সকৃত জায়গা খনন বা অতিরিক্ত জায়গা ভোগ দখল বা ব্যবহার করা যাবে না বলে দরপত্রে উল্লেখ থাকলেও তিনি বন্দর দরপত্র ১২ ও ১৩ নম্বর শর্ত লঙ্ঘন করে ইজারাবহির্ভূত অতিরিক্ত জায়গা দখল ও স্কেভেটরের সাহায্যে পুকুর খনন করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব বলেন, ‘মো. নাজিম উদ্দিন ও তাঁর লোকজন চরের নিরীহ মানুষকে জুলুম নির্যাতন করে ইজারার জায়গা বাদ দিয়ে কৃষকদের মালিকানা খাসের জায়গা দখল করে নিয়েছে।’ তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর যুদ্ধকালীন কমান্ডার। তিনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীও।  অবৈধ দখলদার নাজিম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশরসহ সাধারণ কৃষকদের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ বলে মামলা করে হয়রানি করছে।

জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। সরাসরি অফিসে এসে যোগাযোগ করলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোনাইদ কবির সোহাগ বলেন, ‘জমির মালিকরা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন। তাঁদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করে নীতিমালার আলোকে এবং আইনকানুন মেনে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

আল নাজিম স্যালভেজ অ্যান্ড কেরিয়ার্স ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েকজন আমার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন এবং পুকুরে বিষ দিয়ে মাছ মেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছেন। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছি।’

এ সময় তিনি বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করলে মানহানি মামলা করার হুমকি দেন।

মন্তব্য