kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

বাঁ থেকে : চন্দনাইশের জোয়ারা বাণী উচ্চ বিদ্যালয়, চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর সড়ক এবং খাগড়াছড়ির পানছড়িতে বিধ্বস্ত দুদুকছড়া ফুটব্রিজ। গতকাল তোলা। ছবি : ছোটন কান্তি নাথ (চকরিয়া), এস এম মহিউদ্দিন (চন্দনাইশ) ও শাহজাহান সাজু (পানছড়ি)

টানা ছয় দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শঙ্খ ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছ। চন্দনাইশে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি। সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দীঘিনালা-লংগদু সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন। পানছড়ির দুদকছড়া ফুটব্রিজ ধসে গেছে। চকরিয়া ও পেকুয়ার বন্যাকবলিত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। রাঙ্গুনিয়ায় ইছামতি নদীতে স্রোতে ভেসে গেছে এক তরুণ। বিস্তারিত নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধির পাঠানো খবরে :

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : টানা বৃষ্টিতে মুরাদপুর ইউনিয়নের ১০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান মো. জাহেদ হোসেন নিজামী। তিনি জানান, বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে গোপ্তাখালী, গুলিয়াখালী, ভাটেরখীল, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন গ্রাম। কয়েক কোটি টাকার ফসল পানির নিচে। ভেসে গেছে ৩ শতাধিক পুকুরের কোটি টাকার মাছ। সৈয়দপুর ইউপি চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম নিজামী বলেন, ‘নিম্নাঞ্চলের হাজারো বাড়ি ঘরে পানি ঢুকে আছে। জলাবদ্ধতায় রান্না-বান্না বন্ধ। ফসলি জমি পানির নিচে।’

একইভাবে পানিতে তলিয়ে আছে বারৈয়াঢালা, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, ভাটিয়ারী ইউনিয়ন এলাকাও। এ ছাড়া পৌরসদরের অবস্থাও বেহাল।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায় বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলের পানি বাড়ি-ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। রান্না-বান্না ব্যাহত হচ্ছে।’

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : ইছামতি নদীতে স্রোতে ভাসমান বাঁশের চালি ধরতে নেমে নিখোঁজ এক তরুণ। তার নাম দিদারুল আলম (১৮)। সে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বদিউল আলমের ছেলে। তবে তাঁর সঙ্গে বাঁশের চালি ধরতে নামা আবদুর রহমান (১৯) নামে আরেক তরুণ ভেসে যাওয়ার পরপরই পানি থেকে উঠে আসতে সক্ষম হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ইউনিয়নের হালিমপুর গ্রামে ইছামতি নদীতে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ইছামতি নদী অতি বৃষ্টির কারণে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে উত্তাল ছিল।  

ফায়ার সার্ভিসের রাঙ্গুনিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দল নিখোঁজ দিদারুল আলমকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। পানির তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটছে। আমরাও তাদের সহযোগিতা করছি।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদের কাজ করতে কষ্ট হচ্ছে।’

চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) : পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দোহাজারী, চাগাচর, রায়জোয়ারা, দিয়াকুল, কিল্লাপাড়া, জামিজুরী, পূর্ব দোহাজারী, কাঞ্চনাবাদ, পশ্চিম এলাহাবাদ, শাহ্

সুফিপাড়া, মধ্যম চন্দনাইশ, হাশিমপুর, চন্দনাইশ পৌরসভা, বরকল, বরমা, ধোপাছড়ির, ছাপাছড়ি, শামুকছড়ি, ছিড়িংঘাটা, খাগরিয়াসহ চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পৌরসভার জিহস ফকির পাড়া এলাকায় বরুমতি খালের পানি উপচে পৌরসভার নয়াহাট, বড়পাড়া, হারলা, জিহস ফকির পাড়া, দক্ষিণ গাছবাড়িয়া, নাথপাড়া, সাহিত্যিকপাড়া, ফকিরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে চন্দনাইশ উপজেলায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শতাধিক মত্স্য প্রকল্প পানির নিচে রয়েছে। কোথাও কোথাও আউশের বীজতলা তলিয়ে গেছে।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার চৌধুরী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং সাহায্যের জন্য জেলা প্রসাশক বরাবরে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছেন বলে জানান।

কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) : টানা বৃষ্টিতে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জুলধা ইউনিয়নের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমনের বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। ভেঙে গেছে চলাচলের সড়ক। পুকুরের মাছ ও খেত খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘যেসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

চকরিয়া ও পেকুয়া (কক্সবাজার) : প্রবল বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভয়াবহ বন্যায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা। এতে দুই উপজেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ এখন বানের পানিতে ভাসছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায়। এই অবস্থায় রান্নাবান্না করতে না পারায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন এসব মানুষ। কোনো কোনো ইউনিয়নে সড়ক ও বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে দুই উপজেলার দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভেসে গেছে বিভিন্ন পুকুরের মত্স্যভাণ্ডার ও তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার একর জমির সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত।

কাকারা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. শওকত ওসমান, সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম, লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের গোলাম মোস্তফা কাইছার, কৈয়ারবিলের মক্কী ইকবাল, বরইতলীর জালাল আহমদ সিকদার, হারবাংয়ের মিরানুল ইসলাম মিরান জানান, মাতামুহুরী নদী ও বিভিন্ন ছড়াখালের পানিতে তাঁদের ইউনিয়নের বাসিন্দারা পানিবন্দি। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির।

অপরদিকে পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়ন, রাজাখালী, মগনামাসহ সবকটি ইউনিয়নের অন্তত লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা নিশ্চিত করেছেন।

চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, ‘যেসব এলাকা বানের পানিতে তলিয়ে গেছে সেখানকার মানুষ যাতে খাবার ছাড়া না থাকে সেজন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

চকরিয়ার ইউএনও নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান জানান, বন্যাকবলিত মানুষগুলোকে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য সিপিপির সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।

সংসদ সদস্য জাফর আলম বলেন, ‘চকরিয়া ও পেকুয়ার বানভাসি একটা মানুষও যাতে অভুক্ত না থাকে সেজন্য যথাযথ পদড়্গেপ নেওয়া হয়েছে।’

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) : চার ইউনিয়নের মাঈনী নদী তীরবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হলেও বাবুছড়া, কবাখালী এবং বোয়ালখালী ইউনিয়নে পানি অনেক কমে গেছে। তবে তুলনামূলকভাবে অনেক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অপরিবর্তিত রয়েছে মেরুং ইউনিয়নের বন্যাকবলিত এলাকা। ছোটমেরুং বাজার, বাজার সংলগ্ন সড়ক এবং বড়মেরুং এলাকার সড়ক পানির নিচে থাকায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত চালু হয়নি দীঘিনালা-লংগদু সড়ক যোগাযোগ।

মেরুং ইউপি চেয়ারম্যান রহমান কবির রতন জানান, ইউনিয়নের ৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২২ পরিবার অবস্থান নিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজি মোহাম্মদ কাশেম বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণ করেন।

পানছড়ি (খাগড়াছড়ি) : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে দুদুকছড়া ফুট ব্রিজ, চেঙ্গী নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের একাংশ, বন্ধ রয়েছে মুনিপুর-তারাবন সড়ক যোগাযোগ, ফুটব্রিজ ধসে পড়ায় বন্ধ হয়েছে ৪০ গ্রামের সঙ্গে মোটরসাইকেল, টমটম ও অটেরিকশা যোগাযোগ। পূজগাং মুখ উচ্চ বিদ্যালয় ও লতিবান ইউনিয়ন কার্যালয়ে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। তবে পানি কমে যাওয়ায় পূজগাং মুখ উচ্চ বিদ্যালয়ে থাকা বাসিন্দারা নিজ নিজ ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মুনিপুর-তারাবন সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো আশেকুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার কাজ শুরু করেছেন।

মন্তব্য