kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

পাহাড়ে পেয়ারা আর পেঁপে চাষে ভাগ্যবদল

আরমান খান, লংগদু (রাঙামাটি)   

২০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাত্র চার বছর আগে কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের একটি প্রদর্শনী নিয়ে বাড়ির পাশে পতিত জমিতে দুই বন্ধু মিলে রেডলেডি পেঁপে চাষ শুরু করেন। চাষাবাদে অভিজ্ঞতা না থাকায় ওই সময় খুব একটা লাভবান হতে পারেননি  মামুন ও আলমগীর। মাত্র ২২ হাজার টাকার মতো লাভ হয়েছিল তাঁদের। তবে পেঁপের চাষ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে চাষাবাদের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয় দুজনের।

পরিবার আর বন্ধুদের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে বড় আকারে পেঁপে আর পেয়ারা চাষ শুরু করেন দুজন। লংগদু উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে হাজাছড়া গ্রামে ৫ একর পতিত পাহাড় ভাড়া নিয়ে শুরু করেন চাষাবাদ। এখানে দুই হাজার পেয়ারা আর দেড় হাজার পেঁপে চারা দিয়ে শুরু করেন নতুন উদ্যোমে। এবার লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন তাঁরা। এক বছর পরে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে দুই বন্ধু আলাদা হয়ে চাষ শুরু করেন। হাজাছড়া গ্রামের এই বাগানটা আলমগীরকে দিয়ে মামুন চলে যায় পাশের গ্রাম ইসলামাবাদে।

ওই গ্রামে পাঁচ একর পরিমাণের একটি পাহাড়ের অর্ধেক জমিতে দুই হাজার পেয়ারা আর ২৫০০ পেঁপে চারা দিয়ে চাষ শুরু করেন কৃষক মামুন। গত তিন বছরে শুধু পেঁপে বিক্রি করে মামুনের আয় হয়েছে প্রায় নয় লক্ষ টাকা। এ ছাড়া গত বছর থেকে পেয়ারার ফলন আসতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ২.৫ লক্ষ টাকার পেয়ারা বিক্রি হয়েছে। এবার আরো ৬-৭ লক্ষ টাকার পেয়ারা বিক্রি হবে বলে আশা করছেন কৃষক মামুন। তার বাগানে উৎপাদিত থাই পেয়ারার সুনাম সারা উপজেলা জুড়ে। এ ছাড়াও পেঁপে চারা এবং পেয়ারার গুটিকলম তৈরি করে বিক্রি করছেন মামুন।

সম্প্রতি কৃষক মামুনের পেয়ারা আর পেঁপে চাষের সফলতা নিয়ে কথা হয় কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকের সঙ্গে। মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি ২০০৪ সাল থেকে ছোট আকারে কাঠের ব্যবসা করতাম। ২০১৫ সালে লংগদু হর্টিকালচার সেন্টারে কর্মরত প্রতিবেশী এক চাচার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে তাইওয়ানের রেডলেডি জাতের পেঁপে চাষ শুরু করি। এরপর আর অন্য কোনো কাজ করার চিন্তা মাথায় আসেনি। চাষাবাদের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থেকেই পেঁপের পাশাপাশি থাই পেয়ারা চাষ করে লাভবান হয়েছি। পেয়ারা ও পেঁপে খেতে সুস্বাদু এবং মিষ্টি হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা আছে। আমি স্থানীয় বাজার ছাড়াও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং ঢাকায় পাঠাচ্ছি আমার বাগানের পেয়ারা ও পেঁপে। ৭০ টাকা কেজি দরে পেয়ারা আর ৫০ টাকা দরে পেঁপে বিক্রি করি।’

মামুন আরো বলেন, ‘আমার বাগানে বর্তমানে ২৫০০ পেঁপে এবং ২০০০ হাজার থাই পেয়ারা গাছ আছে। সব গাছ থেকেই পর্যাপ্ত ফলন পাচ্ছি। এ ছাড়া খালি জমিতে আরো ১৫০০ থাই পেয়ারা এবং ১০০০ রেডলেডি পেঁপে রোপণ করেছি। আশা করছি আগামী বছর আমার বাগান থেকে ১২-১৫ লক্ষ টাকার পেঁপে এবং পেয়ারা বিক্রি হবে। তবে বন্ধু আলমগীরের বাগান পরিচর্যার অভাবে খুব বেশি ফলন পাচ্ছে না। বাগানের সব গাছের প্রতি সমান যত্ন নিতে হবে। তবেই পর্যাপ্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।’

মামুন তার বাগানে সেচ দেওয়ার জন্য ২০০০ ওয়াটের সোলার প্যানেল স্থাপন করেছেন। সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাগানে সেচ দেন তিনি। এ ছাড়া এ তরুণ কৃষক বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের জন্য ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার করছেন। প্রতিটি পেয়ারা গাছে শতাধিক ব্যাগ ঝুলে আছে। ফলে গাছের ক্ষতিকর পোকামাকড় পেয়ারার কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং গাছের বালাই দমনে বিষ ব্যবহার করলে তা পেয়ারার ওপর প্রভাব ফেলে না। ফলে পেয়ারার রং, স্বাদ এবং পুষ্টিগুণেও কোনো সমস্যা হয় না। নিজের অভিজ্ঞতা, ইন্টারনেট আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বড় চাষিদের বাগান পরিদর্শন করেই নিজের চাষাবাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন-এমনটাই জানালেন মামুন।

সম্প্রতি মামুনের পেয়ারা আর পেঁপে বাগান পরিদর্শন করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি অঞ্চলের উপ-পরিচালক পবন কুমার চাকমা এবং অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. শাহনেওয়াজ। পবন কুমার চাকমা বলেন, ‘দুর্গম পাহাড়ে এমন ফলের বাগান করা অত্যন্ত সাহসের কাজ। যেখানে বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়াই নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে চাষাবাদে সফল হয়েছেন মামুন।’

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে নতুন নতুন চাষাবাদে কৃষকদের পরামর্শ এবং সহযোগিতা করতে আমরা চেষ্টা করছি। সম্প্রতি কৃষক মামুনকে বাগান পরিচর্যা প্রদর্শনীর মাধ্যমে সার এবং কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু কৃষি পদকের জন্য সফল চাষি মামুনের নাম পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।’

 

মন্তব্য