kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

সেলে ডিসলাইন রঙিন টিভি ও রান্নার উপকরণ

কারা কর্তৃপক্ষের উপঢৌকন!

চট্টগ্রাম কারাগারে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কারা কর্তৃপক্ষের উপঢৌকন!

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ৬ নম্বর কক্ষ। ছয় ফুট বাই আট ফুট দৈর্ঘ্য প্রস্থের কক্ষটিতে ‘রাজবন্দির’ চেয়েও বেশি সুবিধা নিয়ে হাজত জীবন কাটাতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী। গত বুধবার রাতে সহবন্দি রিপন নাথের ইটের আঘাতে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ওই সেলে ছিল রঙিন টিভি, ডিসলাইন, রান্না করে খাওয়ার জন্য হাঁড়িপাতিলসহ যাবতীয় সরঞ্জাম। একজন রাজবন্দিও কারাগারের নিজে রান্না করে খাওয়ার সুযোগ পান না। এক্ষেত্রে শীর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরীকে ‘রাজবন্দির’ চেয়েও বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

আবার ৩২ নম্বর সেলের সামনের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের ৪টা ৫৭ মিনিট থেকে ৫টা ০৭ মিনিট পর্যন্ত ১০ মিনিট ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না। কী কারণে ভিডিও ফুটেজের অংশ বিশেষ ‘নাই’ হয়ে গেল সেই বিষয়ে তদন্ত করে দেখছে পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে ভিডিও ফুটেজ ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হচ্ছে না। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিষয়ে আরো তদন্তের পর নিশ্চিত হতে হবে। তারপরই ভিডিও ফুটেজের কত মিনিট নেই, কেন নেই, সেই বিষয়ে বলা যাবে। এখনই মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তবে পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ১০ মিনিট ভিডিও ফুটেজ নেই। এই বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছে, ওই সময় বিদ্যুৎ ছিল না। তাই ভিডিও ফুটেজ নেই। কিন্তু সেখানেও নতুন রহস্য তৈরি হয়েছে। হত্যা মামলার আসামি রিপন নাথকে ৬নং সেলে প্রবেশ করানো হয়েছে-এমন ভিডিও ফুটেজের অংশটুকুই নেই! বিদ্যুৎ না থাকায় ভিডিও ফুটেজ না থাকা আর রিপন নাথকে অমিত মুহুরীর সেলে প্রবেশ করানোর ভিডিও ফুটেজ না থাকার বিষয়ে গোয়েন্দাদের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গোয়েন্দারা এই বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি।

অন্যদিকে অমিত মুহুরীর বাবা অরুণ মুহুরী অভিযোগ করছেন, তার ছেলে অমিতের জামিনে মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছিল। এর আগেই যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এমন নেতারা চাননি অমিত মুহুরী পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসুক। এই কারণ, রিপন নাথকে ব্যবহার করে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কারাগার নিরাপদ স্থান হলেও সেখানে অমিত মুহুরীতে নিরাপদে রাখতে পারেননি কারা কর্তৃপক্ষ। এই কারণে তিনি আরো একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

বুধবার রাতে কারাগারের ৩২নং সেলের ৬নং কক্ষে ইটের আঘাতে অমিত মুহুরীর মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সেলটি পরিদর্শন করেন। সেল পরিদর্শন শেষে পুলিশ কর্মকর্তারা রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন। সেল পরিদর্শন করেছেন এমন একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সেলে অমিত মুহুরী রঙিন টিভি দেখতেন এবং সেলে ডিসক্যাবল দেখা গেছে। এ ছাড়া মুহুরী ওই সেলে রান্না করে খেতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তিন চারটি ইটের টুকরো দিয়ে চুলা বানিয়ে সেখানে রান্নার হাঁড়ি বসাত। আর রান্নার জ্বালানিসহ যাবতীয় সরঞ্জাম কারাগার থেকেই সংগ্রহ করতেন মুহুরী। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগারের ভেতরে রান্না করে খাওয়া, ডিসক্যাবলের মাধ্যমে টিভি দেখার সুযোগ পেয়েছে। এটা বিস্ময়কর। টিভি এবং ডিসক্যাবল সংযোগে ক্যাবলের (তার) প্রয়োজন হয়। এই ক্যাবল গলায় ফাঁস দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যায়। আবার মাল্টিপ্ল্যাগও থাকে সেলে। এটাও বিপজ্জনক।’

কারাগারের ভেতরে সেল পরিদর্শন করে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অমিত মুহুরী শীর্ষ সন্ত্রাসী। খুনসহ ১৭ মামলার আসামি অমিত মুহুরী কতো বড় মাপের সন্ত্রাসী সেটা কারা কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল না। এই কারণে কারা কর্তৃপক্ষ অমিত মুহুরীদের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। নিয়মিত সেল তল্লাশির নিয়ম থাকলেও কারাগারের জেলার ও জেল সুপারদের উদাসীনতার সুযোগে সেলগুলোকে রাজকীয় ঘরে পরিণত করেন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। কারাগারে বসেই তাঁরা আলিশান জীবন যাপন করেন।

অমিত মুহুরীর মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার ভোররাতেই ৬নং কক্ষ থেকে রান্নার সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারাগারের ভেতরে ওই সেলে থাকা বন্দি বেলাল এবং অন্য কয়েকজন বন্দির সঙ্গে কথা বলে এই তথ্যের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। রান্নার সরঞ্জামের সঙ্গে রঙিন টিভিও সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ডিসক্যাবল সরিয়ে নেওয়া হয়নি। ক্যাবলটি সেলের ভেতরে ছিল।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিউটি করেন এমন কয়েকজন কারারক্ষী আলাপকালে জানিয়েছেন, শুধু অমিত মুহুরী নন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারে বসে বিলাসী জীবনযাপনের সুযোগ পান। সেই ধারাবাহিকতায় অমিত মুহুরীও সুযোগ সুবিধা ভোগ করতেন। অমিত মুহুরীর রান্নার মসলা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় উপকরণ কারাগারের রান্নাঘর থেকেই সরবরাহ করা হত। আবার বিশেষ খাবারের অর্ডার করলে মুহুরীর সেলে তা পৌঁছে দেওয়া হত। মুহুরীর টাকার অভাবও ছিল না। মুহুরীকে সেবা করতে হত সহবন্দির। এই নিয়েই মূলত মুহুরীর সঙ্গে সহবন্দির বনিবনা হচ্ছিল না। ফলে বুধবার অন্য একজন বন্দিকে সেল থেকে বদলি করে রিপন নাথকে অমিত মুহুরীর সেলে পাঠানো হয়। মুহুরী যখন জানতে পারেন, রিপন নাথকে তাঁর সেলে বদলী করা হয়েছে, তখনই রাগারাগি করেন তিনি। এই নিয়ে রিপনের সঙ্গে বিতর্কও হয়। সেই বিতর্কের পর রাতেই মুহুরীর মাথায় ইটের আঘাত করেন রিপন নাথ।

অমিত মুহুরী হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীরকে এক সদস্যবিশিষ্ট গঠিত তদন্ত কমিটিকে তিন কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘তদন্ত কমিটিকে তিন কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিবেদন ঈদের ছুটির পর পাওয়া যেতে পারে। আর কারাগারের ভেতরে সেলে ইট কীভাবে গেল সেই বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে এখন অমিত মুহুরী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় নিয়মিত মামলা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ মামলা তদন্ত করছে। নিশ্চয়, তদন্তে সব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে।’

সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের তথ্য ‘নাই’ হয়ে যাওয়া, সেলের ভেতরে রান্নার উপকরণ এবং ডিসক্যাবল থাকার বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আজিজ আহমেদকে। তিনি বলেন, ‘তদন্তের প্রয়োজনে এখন (বিকেল পাঁচটা) কারাগারের ভেতরে আছি। এই মুহূর্তে কথা বলতে পারছি না।’

কারা সেলে বন্দিদের রান্না করে খাওয়ার অনুমতি কোনো অবস্থাতে দেওয়া যায় না উল্লেখ করে একজন ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ না করে এই সুযোগ অমিত মুহুরী কোনো অবস্থাতেই পেতে পারেন না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ম্যানেজ হয়েছেন বলেই অমিত মুহুরী নিজে রান্না করে খাওয়া এবং স্যাটেলাইট টিভি দেখার সুযোগ পেয়েছেন। না হলে তিনি শুধু বিটিভি দেখার সুযোগ পেতেন। চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতরে ডিসক্যাবলের মাধ্যমে স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখার সুযোগ করে দেওয়ার দায় নিশ্চয় কারা কর্তৃপক্ষের।’ 

চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার নাশির আহমেদ  বলেন, ‘অমিত মুহুরী সেলে রান্না করে খেতেন না। এমন সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি। আর সেলে ডিসক্যাবলও ছিল না। তবে বন্দিরা টিভি দেখার সুযোগ পান। সেই হিসেবে অমিত মুহুরীও টিভি দেখার সুযোগ পেয়েছেন।’

মন্তব্য