kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বহুরূপী নাসির

ওটিটির কল্যাণে যে কয়েকজন অভিনেতা দর্শকের আপনজন হয়ে উঠেছেন নাসির উদ্দিন খানের নামটি তাঁদের সবার ওপরে। বহুরূপী এই অভিনেতাকে নিয়ে লিখেছেন পৃথ্বী সাহা বাপ্পা

৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বহুরূপী নাসির

নাসির উদ্দিন খান ছবি : বাঁধন কুমার প্রণব

ছয় বছর আগে হঠাৎ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে এলেন। জীবনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত ছিল এটা। অভিনয় নিয়ে যে স্বপ্ন-সম্ভাবনার বীজ বপন হয়েছিল নিজ শহরে, রাজধানীতে আসার পরই সেটি মূলত আলোর দেখা পায়। এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলতেও এই ‘মুভ’টাকেই মানেন নাসির উদ্দিন খান।

বিজ্ঞাপন

হালে ওটিটি প্ল্যাটফরমে নাসিরের পারফরম্যান্স পছন্দ করেনি এমন দর্শক কমই আছে। ওয়েব সিরিজ, ওয়েব ছবি ও চলচ্চিত্র—যেখানে যে চরিত্রই করেছেন, দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছেন। হোক সেটা ‘তাকদীর’-এর ডোম কিংবা ‘মহানগর’-এর ছিঁচকে চোরের চরিত্র, পর্দায় স্বল্প সময়ের সুযোগেও বাজিমাত করেছেন। গত ঈদে শিহাব শাহীনের ওয়েব সিরিজ ‘সিন্ডিকেট’-এ রসিক মন্দলোক অ্যালেন স্বপন চরিত্র করে তো রীতিমতো প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন। ঈদের ছবি ‘পরান’-এ তিনি আবার পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা, আছেন ‘হাওয়া’তেও। এককথায় পর্দায় তিনি বহুরূপী।

চাকরি হারিয়ে ব্যক্তিজীবনে টালমাটাল নাসির ২০১৬ সালে ঢাকায় এসে ক্যামেরার সামনে পুরোদস্তুর কাজ শুরু করেন। আগের জীবনটা কম নাটকীয় ছিল না তাঁর। সিএ ফার্মে কোর্স করার পর প্রায় দেড় যুগ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। কোথাও মন বসাতে পারেননি। নাসির বলেন, ‘চাকরি জীবনে ভালো কিছু করতে পারিনি। সবাই উন্নতি করছিল, আমি ছাড়া। অভিমান হতো খুব। একটা সময় বুঝতে পারি, আমি কর্মী হিসেবে ভালো ছিলাম না। ’

নাসিরের ফোকাস তখন অভিনয় আর লেখালেখিতে। ২০০৮ সাল থেকে গল্প লেখা শুরু করেন। তাঁর লেখা বেশ কিছু গল্প কাগজে ছাপা হয়। তিনি বলেন, ‘অফিসের কাজ ফাঁকি দিয়ে গল্প লিখেছি। সিগারেট খাওয়ার কথা বলে ছাদে গিয়ে নাটকের রিহার্সাল করেছি। একটা সময় চাকরি করেছি অফিস থেকে শিল্পকলা কাছাকাছি হওয়ার কারণে। সব কিছুর পরেও মন পড়ে থাকত অভিনয়ে। ’

ছয় ভাই-বোনের মধ্যে নাসির উদ্দিন সবার ছোট। জীবনে সব সময়ই ছায়ার মতো পাশে ছিলেন বড় ভাই আমান উল্লাহ খান। চাকরি জীবন বা অভিনয় জীবন—প্রতিটা মুহূর্তেই ভাইয়ের সাপোর্ট পেয়েছেন। তিন সন্তানের জনক নাসির বলেন, ‘মেয়ের জন্মের পর একটা ইনস্যুরেন্স করেছিলাম। ঢাকায় আসার আগে সেটা ভেঙে ফেলি। সেই টাকা রেখে এসেছিলাম সংসার চালাতে, আর অল্প কিছু নিজের জন্য এনেছিলাম। ভেবেছিলাম, ওরা কোনোভাবে চলতে পারলে আমি অভিনয়টা করতে পারি। ’

১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামে তীর্যক নাট্যগোষ্ঠীর সদস্য হন। এখনো আছেন দলের সঙ্গে। এর আগেও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্কুলের এক অনুষ্ঠানে প্রথম অভিনয় করেন। নাসির তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। অভিনয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা তখনই গড়ে উঠেছিল।

খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবেন আর অভিনয় করতে পারবেন,  ঢাকা এসেছিলেন এই স্বপ্ন নিয়েই। কাজের অভাব হয়নি নাসির উদ্দিনের। টানা কাজ না করে মানের দিকেই ফোকাস করেছেন বেশি। নাসির বলেন, ‘প্রতিবারই নতুন কাজের জন্য নিজেকে আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে চেষ্টা করছি। এত দিনে আমার প্রতি দর্শকদের একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেদিকে নজর রেখেই ভালো কাজের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। ’

বিভিন্ন মাধ্যমে নাসির উদ্দিনের ভিডিও কনটেন্টের নিচে অনেক দর্শকের মন্তব্য, ‘এ লোক এত দিন কোথায় ছিলেন? আরো আগে পেলাম না কেন?’ ক্যামেরার সামনে আসতে আসলেই কি দেরি হয়ে গেল? এ নিয়ে আফসোস নেই নাসির উদ্দিনের, ‘আমি বিশ্বাস করি, যে গাছের যখন ফল দেওয়ার সময় তখনই ফল দেবে। এখন বরং মঞ্চে পারফরম করতে পারছি না বলে আফসোস হয়। ’

অনেকেই বলেন, শুধু মুখাবয়ব নয়, পুরো শরীর দিয়ে অভিনয়টা করেন নাসির। অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন কিভাবে? বলেন, ‘মঞ্চে আমরা চা আনা থেকে ঝাড়ু দেওয়া—সবই করেছি। আমাদের ইগো ভেঙে গেছে সেখানেই। সিনিয়ররা অনেক কিছু শিখতে সহায়তা করেছেন। ’

নিজেকে শক্তভাবে তৈরি করার পেছনে মঞ্চে তাঁর প্রথম নাটকের নির্দেশক সালাহউদ্দিনের অবদানের কথা বললেন নাসির, ‘আমার বয়স তখন তেইশ-চব্বিশ। মঞ্চে বেশ কাজ করছি, কেউ প্রশংসা করলে ভালো লাগত। একদিন সালাহউদ্দিন ভাই আমাকে খুব বকাঝকা করলেন, মঞ্চে নিয়মিত রিহার্সাল না করাসহ বিভিন্ন ভুলত্রুটির জন্য। খুব অপমানজনক ছিল সেটা। শিল্পকলা থেকে চোখ মুছতে মুছতে হেঁটে বাসায় ফিরেছিলাম। ’ ঘটনা মনে করে গলা ধরে আসে তাঁর। কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে বলেন, ‘আমার মননের একটা মোড় ঘুরে যায় এ ঘটনায়। এর পর থেকে আমার ইগো কাজ করে না, শুধু নিজের কাজটাই মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করি। সেদিন সালাহউদ্দিন ভাই এভাবে না বকলে আমার এই বোধ তৈরি হতো কি না জানি না। আমি আজীবন কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে। ’



সাতদিনের সেরা