kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিজয়ের মাসে ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’

এখন পর্যন্ত একটি ছবি মুক্তি পেলেও পরিচালক নূরুল আলম আতিক চলচ্চিত্র বোদ্ধামহলে সমাদৃত। সেই ‘ডুবসাঁতার’ (২০১০)-এর ১১ বছর পর আগামীকাল তিনি আসছেন দ্বিতীয় ছবি ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ নিয়ে। পরিচালক এবং ছবির দুই অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি ও আশনা হাবিব ভাবনা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ছবিটি নিয়ে। লিখেছেন ইসমাত মুমু

৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিজয়ের মাসে ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’

জ্যোতিকা জ্যোতি (বামে) ও আশনা হাবিব ভাবনা (ডানে)

২০১২-১৩ সালের দিকে বলতে গেলে নূরুল আলম আতিকের সহকারী হয়ে গিয়েছিলেন জোতিকা জ্যোতি। একসঙ্গে সিনেমা দেখা, পড়াশোনা, বিভিন্ন মুভমেন্ট, অনুষ্ঠান করা, ছবির প্রডাকশন লেভেলে কী করা যায়—দিন-রাত সেই আলাপ-আলোচনা চলত। এর মধ্যে আতিক ঠিক করলেন সরকারি অনুদানের জন্য গল্প জমা দেবেন। ওই সময় আতিক কয়েকটা স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করেছেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কোনোটাই ফাইনাল হচ্ছিল না। ফান্ডিং কোথা থেকে আসবে, অনুদানে দিলে পাওয়া যাবে কি না। আতিক চাচ্ছিলেন ‘মানুষের বাগান’ ছবির পাণ্ডুলিপি অনুদানের জন্য জমা দেবেন। জ্যোতিসহ আতিকের কয়েকজন সহকারী বললেন, ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ দেওয়ার জন্য। জ্যোতি বলেন, “ওই সময় আমি আতিক ভাইয়ের চারটি স্ক্রিপ্ট পড়েছি। সেখানে দুই-একটা ক্যারেক্টারে আমার নামও থাকত। এর মধ্যেই আমি তখন অন্য আরেকটি ছবিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এসে দেখি আতিক ভাই ‘মানুষের বাগান’ রেডি করেছেন। আমার মনে হয়েছে ‘মানুষের বাগান’ অনুদান নাও পেতে পারে। আবার জোর করে ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ও রেডি করা হলো। ”

আতিক যেভাবে গল্প কিংবা চরিত্র বিশাল আকারে ভাবছিলেন, সেটা হচ্ছিল না। প্রথম দফায় জ্যোতি, দোয়েলসহ অনেকে শুটিংও করেছিলেন। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে যখন প্রত্যাশামতো হচ্ছিল না, তখন শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আবার গত বছর পুরোদমে এই ছবির শুটিং হয়। জ্যোতি বলেন, ‘ছবিটার নেপথ্যে আমিও কাজ করেছি। প্রচণ্ডভাবে চাইতাম আতিক ভাই একটা সিনেমা বানাক। পরিচালক ও মানুষ হিসেবে তিনি শোবিজে আমার সবচেয়ে পছন্দের। নতুনভাবে শুট হওয়ার পর গল্পটা আরেকটু গতি পেয়ে একটু অন্য রকম হয়েছে। ’

ভাবনা এই ছবির সঙ্গে যুক্ত হন ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ ছবির শুটিং করার সময় থেকেই। শুটিংয়ের মাঝেই আতিকের ডাকে সাড়া দিয়ে অডিশন দিয়েছিলেন। নির্বাচিতও হয়েছেন। সিনেমাটির শুটিং দেরি হয়ে যায়। ভাবনাও অপেক্ষায় থাকেন আতিক ডাকবেন। গত বছর আবার ডাক পান ভাবনা। সানন্দে সেই ডাকে সাড়াও দেন। ‘আতিক ভাইয়ের সঙ্গে এটা প্রথম কাজ। আমার বাবা একজন নির্মাতা। তাই আগে থেকেই আতিক ভাই আমাদের পরিচিত। আতিক ভাইয়ের কাজ ভীষণ পছন্দের। তবে ছবির প্রযোজক শুকু আপার গল্প ও পরিচালনায় টিভিতে আমি অনেক নাটক করেছি। তাঁদের কাজের সঙ্গে তাই একরকম পরিচয় আগে থেকেই ছিল’, বলেন ভাবনা।

ভাবনা অভিনীত চরিত্রের নাম পদ্ম। চরিত্রটা একটু অন্য রকম। এটা পাশের বাড়ির মেয়ের চরিত্র না। আমরা সাধারণত সমাজে যেমন নারী চরিত্র দেখতে পাই ঠিক তেমন না। ভাবনা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব ও অস্তিত্বের জায়গা। একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্ব করি যে আমাদের সাহসী সন্তানরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছেন। আমি চাই অনেক সিনেমা হোক, বই লেখা হোক। এ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকুক। মুক্তিযুদ্ধের একটি সিনেমাতে অংশ নিয়ে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করছি। আমি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, শুটিং করতে করতে মনে হয়েছে ওই সময়টায় চলে গেছি। ’

মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘রাবেয়া’, ‘জীবনঢুলি’, ‘অনীল বাগচীর একদিন’ ছবি করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন জ্যোতিকা জ্যোতি। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটক করেছেন প্রচুর। বোঝাই যাচ্ছে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অভিনয় জ্যোতির কতটা প্রিয়। ‘পারিবারিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অন্য রকম টান তো তাই সব সময়ই ছিল। আমি এত শুনেছি আর কাজ করেছি যে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় এক যুগ পর জন্ম হলেও মনে হয় আমি হয়তো ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সময়’, বললেন জ্যোতি।

‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ ছবিতে জ্যোতির চরিত্রের নাম দীপালি সাহা। বিয়ের আগে-পরে তার মানসিক একটা পরিবর্তন দেখানো হয়। যুদ্ধের সময় চারপাশের অবস্থায় সেই চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে জ্যোতিকে। ‘চরিত্রটা বলতে গেলে নিজের মতো করেই করেছি। প্রতিটা দৃশ্যের আগে আতিক ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করতাম, এভাবে বা ওভাবে করতে পারি কিনা। এসব ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল’, বললেন জ্যোতি।  

ছবিটির একটি বড় অংশ শুটিং হয়েছে জ্যোতির উপজেলা গৌরিপুরে। সেখানেও সব কিছু অ্যারেঞ্জ করার পেছনে আছে জ্যোতির অবদান। ‘স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মুক্তি পাওয়া একটি মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে আমি অভিনয় করেছি—এটাও আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি’, বলেন জ্যোতি।

আহমেদ রুবেল, আশীষ খন্দকার, স্বাগতা, দোয়েল, ভাবনাসহ অনেকেই একসঙ্গে এক ইউনিটে শুটিং করেছেন। জ্যোতি বলেন, ‘স্বাগতা আমার বন্ধু। ভাবনার সঙ্গে প্রথম কাজ, কিন্তু আমাদের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আগে থেকেই। গৌরিপুরে যখন শুটিং করেছি, ১০-১২ জন মেয়ে সবাই এক রুমে। কেউ বিছানায়, কেউ ফ্লোরিং করে ঘুমিয়েছি। সিনিয়র-জুনিয়র সবাই এক রুমে ছিলাম। ইলোরা আপা, অপু দি, শুকু আপা—আমরা সবাই মিলে ছিলাম এক রুমে। ওখানে তো থাকার ওভাবে ব্যবস্থাই নেই। কোনোমতে একটা রুম পাওয়া গেছে। ’

ভাবনার শুটিং হয়েছে গৌরিপুর ও টাঙ্গাইলে। ‘এই সিনেমাটায় যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা শতভাগ অভিনয়ের মানুষ। তাঁরা সব সময় ভালো চরিত্রের অন্বেষণে থাকেন। আতিক ভাই বেছে বেছে সেই মানুষদেরই একসঙ্গে এনেছেন। আতিক ভাইয়ের যে স্পিরিট ছিল, সেটা আমাদের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। তাঁর কারণেই সানন্দে ছবিটা শেষ করতে পেরেছি। আতিক ভাইয়ের ছবিতে আমিই সম্ভবত সবচেয়ে কম গুণী ও কম বয়সী ছিলাম। আমার সহশিল্পী একটা মোরগ। ওর সঙ্গেই আমি দিন-রাত থাকতাম। ছবিতে ওর নাম বাঘা। পদ্ম আর বাঘার দারুণ রসায়ন। শুটিংয়ের আট দিন আগে আমি ইউনিটে যোগ দিয়েছিলাম চরিত্র ও সহশিল্পীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে’, বললেন ভাবনা।

পাকিস্তানি আর্মি দৌড়াদৌড়ি করছে...তাদের সঙ্গে যুদ্ধ হলো...দেশ স্বাধীন হয়ে গেল—এই ছবি তেমন নয়। ভিন্নভাবে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে, মনে করেন জ্যোতি ও ভাবনা দুজনই। কিভাবে পুরো বিষয়টা তুলে ধরা হয়েছে সেটা হলে গিয়েই দেখতে হবে বলে তাঁদের অভিমত।



সাতদিনের সেরা