kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

জলবায়ু সম্মেলন শেষে দেশে ‘নোনা জলের কাব্য’

ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানার কয়েক দিন পর কুয়াকাটা বেড়াতে গিয়ে ছবির গল্প মাথায় নিয়ে ফিরলেন রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত। তাঁর সেই ‘নোনা জলের কাব্য’ প্রশংসিত হলো বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে। প্রদর্শিত হলো জাতিসংঘের এবারের জলবায়ু সম্মেলনেও। আগামীকাল দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ছবিটি। এ উপলক্ষে সুমিত ও ফজলুর রহমান বাবুর সঙ্গে কথা বলেছেন ইসমাত মুমু

২৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জলবায়ু সম্মেলন শেষে দেশে ‘নোনা জলের কাব্য’

পেছনে সমুদ্রের গর্জন। এই পারে চায়ের দোকানে জেলেদের ‘নোনা জলের কাব্য’ ধারণ করা হচ্ছে ক্যামেরায়

নিজের প্রথম ছবির জন্য জেলেদের জীবন বেছে নিলেন কেন?

ছবিতে যে জনপদ দেখানো হয়েছে, সেটি পটুয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত একটি চর। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা ইলিশনির্ভর। এই মানুষদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ২০০৮ সালে। সিডরের কয়েক মাস পর বন্ধুদের সঙ্গে কুয়াকাটা যাই। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমার একটু ফটোগ্রাফির শখ আছে। আমি পর্যটন এলাকা পেরিয়ে কুয়াকাটা থেকে হেঁটে এক মাইল ডানে চলে যাই। দেখতে পাই জেলেরা ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় সমুদ্রে যাত্রা করেন। প্রথমবার তাঁদের কাছ থেকে দেখলাম। এই মানুষদের কথা আমরা সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে পড়ি বা দেখি। সেটাও পরিসংখ্যান হিসেবে, যেমন ঝড় হলে কতজন প্রাণ হারাল বা কত কেজি ইলিশ ধরল। তখন মনে হলো, এঁরা শহরের মানুষের জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ অথচ আমরা তাঁদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।

 

গল্প তো নিজেই লিখলেন। বাইরের একজন মানুষ চাইলেই কি জেলে সম্প্রদায়ের জীবন বিশ্বাসযোগ্যভাবে লিখতে পারে...?

নিউ ইয়র্ক ফিল্ম স্কুলে যখন পড়ি, আমাকে শেখানো হয়, কিভাবে একটা চরিত্রকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, সেখান থেকে কিভাবে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়। ওখানকার প্রফেসররা আমাকে বলেছেন, নিজের দেশে নিজের সংস্কৃতিতে চলে যাও। সেখানে তোমার গল্প ডেভেলপ করো। ব্যাচে আমরা ৩৬ জন শিক্ষার্থী ছিলাম—১৮ জন আমেরিকান, বাকি ১৮ জন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। সবাই মোটামুটি নিজ দেশে গিয়ে ফিল্মের কাজ শুরু করে। নিজের সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই মাথায় আসে ওই মানুষদের কথা, যাঁদের জীবনযাত্রা আমাকে খুব টাচ করেছিল।

 

গল্পটা কেমন?

গল্পে একজন আর্টিস্ট ওই স্পটে যায়। তার ভাবনার সঙ্গে ওখানকার কিছু মানুষের ভাবনার সংঘর্ষ হয়। এটা কিন্তু বাংলাদেশের খুবই প্রমিনেন্ট একটা ন্যারেটিভ। আমরা খুবই শান্তিপূর্ণ এক সমাজে বাস করি। এর মধ্যেও তলে তলে আছে নানা রকম অসহিষ্ণুতা। ভিন্ন ভাবনার কাউকে নিজেদের কাছ থেকে দূরেই রাখতে চাই। জেলেদের মধ্যে নতুন ও পুরনোর দ্বন্দ্ব, শহর ও গ্রামের দ্বন্দ্ব, বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব নিয়েই ছবিটি।

 

ছবি তৈরির জন্য তো বিভিন্ন উৎস থেকে ফান্ড পেয়েছেন...

এই ছবিতে প্রথম টাকা দেন কিংবদন্তি পরিচালক স্পাইক লি। তিনি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। উনি বছরে পাঁচটা গল্প সিলেক্ট করেন এবং কিছু অর্থ দিয়ে স্ক্রিপ্ট ডেভেলপ করতে উৎসাহিত করেন। টাকাটা পাওয়ার পর নতুন উদ্যমে আমার এই স্ক্রিপ্ট দাঁড় করানো শুরু করি। এরপর ছবির চিত্রনাট্য গোয়া ফিল্ম বাজারে কো-প্রডাকশন মার্কেটে নির্বাচিত হয়, সেখানেই ছবির অন্যতম প্রযোজক ইলান জিরার্দের সঙ্গে পরিচয়। জিরার্দ ‘মার্চ অব দ্য পেঙ্গুইন’, ‘গুডবাই বাফানা’, ‘ফাইনাল পোর্ট্রেট’-এর মতো বিখ্যাত কিছু ছবি প্রযোজনা করেছেন। এরপর ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সরকারি অনুদান পেয়েছি ৫০ লাখ টাকা। পরের বছর ৮০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি ফরাসি সরকারের সিএনসি ‘সিনেমা দ্যু মন্ড’ ফান্ড থেকে। ২০২০ সালে ছবিটি টরিনো ফিল্ম ল্যাবে (টিএফএল) অডিয়েন্স ডিজাইন ফান্ড জিতেছে। ৪৫ হাজার ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। এই অর্থের মাধ্যমে ছবিটিকে বিশ্বের বেশ কিছু দেশের সিনেমা হলে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছি আমরা। বাংলাদেশেও প্রডিউসার খুঁজেছি, কারো মধ্যেই তেমন আগ্রহ পাইনি। দুই মাস কুয়াকাটায় থেকে ছবি বানানো কিন্তু অনেক খরচের ব্যাপার। আমরা এমন একটা চর এলাকায় ছিলাম, যেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, গ্যাস নেই।

 

জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের অভিব্যক্তি কেমন ছিল?

আইম্যাক্স থিয়েটারে এই ছবির স্ক্রিনিং হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় থিয়েটার। ৮০ ফুট বড় স্ক্রিন। তবে ছবি স্ক্রিনিংয়ের চার দিন আগেই শেষ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টদের মিটিং। মিনিস্টার বা সেক্রেটারি লেভেলের নীতিনির্ধারকমহলের লোকজন ছবিটি দেখেছেন। দিনের শেষে এটাও বড় পাওয়া। কারণ মেসেজটা তাঁরাই রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পৌঁছে দেবেন।

 

কী মেসেজ দিতে পেরেছেন বলে মনে হয়?

২০১৮ সালের বর্ষায় যে গ্রামে ছবির শুটিং শুরু করেছিলাম, মাত্র আড়াই বছরের ব্যবধানে সেই গ্রাম বিলীন হয়ে যায়। যে ২০-২৫ ঘর জেলে ওখানে ছিলেন, তাঁরা হয়েছেন বাস্তুহারা। শুধু যে বাস্তুহারা হচ্ছেন তা নয়, আরো কত কী না হচ্ছে! এই মানুষগুলো নিয়ে তো আমাদের নীতিনির্ধারকদের আরো অনেক কাজ করতে হবে। আমরা দেখিয়েছি, একটা সাইক্লোন চলে যাওয়ার পর নতুন আরেকটা সাইক্লোন আসার আগ পর্যন্ত ওঁদের জীবনটা কেমন থাকে। ওঁদের জীবনে কিন্তু রং আছে, সুখও আছে। শুধু একপেশেভাবে এটা বললে হবে না যে ওঁদের এটা প্রয়োজন, ওটা প্রয়োজন। জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাঁরা জানেন যে কী করতে হবে। অবশ্য এগুলো বহির্বিশ্বের মানুষকে কী বলব, আমরাই তো ওঁদের জানি না। আমরা ঘুরতে গেলে হয়তো ঘুরে ঘুরে আকাশ-বাতাস আর নদী দেখে আসি। এটা দেখাটাও অনেক জরুরি।

 

ক্যামেরার পেছনে ছিলেন আন্তর্জাতিক অনেক কলাকুশলী। তাঁদের নিয়ে কী বলবেন?

সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসনিবাসী থাই শিল্পী চানানুন চতরুংগ্রোজ। তিনি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্পিরিট অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে আমার দুই বছরের সিনিয়র। ওঁদেরও সমুদ্র আছে, ফিশিং কালচার ওঁদেরও। যখন স্ক্রিপ্ট দেখাই, উনি খুব ভালোভাবে কানেক্ট করতে পারেন। চিত্রগ্রহণ তাই ওঁর জন্য অনেক সহজ হয়েছে। একদমই অন্য ধরনের এক লেন্স দিয়ে আমাদের দক্ষিণবঙ্গকে দেখিয়েছেন। সিলভা নাহমিয়াস আমাদের প্রডাকশন ডিজাইনার। ফরাসি এই ভদ্রলোক আগেও বাংলাদেশে কাজ করেছেন। তারেক মাসুদ স্যারের সঙ্গে ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তর্যাত্রা’ এমনকি ‘কাগজের ফুল’ও ডিজাইন করেছিলেন। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর তিনি আর বাংলাদেশে আসেননি। আমাদের ছবির জন্যই এসেছেন। ছবিটির নির্মাণ সহযোগী প্রতিষ্ঠান নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর হাফ স্টপ ডাউন। সম্পাদনা করেছেন আমেরিকার ক্রিস্টেন স্প্রাগ, রোমানিয়ার লুইজা পারভ্যু এবং ভারতের শঙ্খ। শব্দ ও রং সম্পাদনার কাজটি হয়েছিল প্যারিসের দুটি বিখ্যাত স্টুডিওতে।

 

কলকাতা উৎসবে সেরা এশীয় ছবির পুরস্কার পেল ‘নোনা জলের কাব্য’। আর কোন উৎসবে প্রতিযোগিতা করেছে ছবিটি?

কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড (শ্রেষ্ঠ এশীয় ছবি) পাই। লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভালে মনোনয়ন পেয়েছিলাম। বুসান, সিঙ্গাপুর, সিয়াটল, গুটেনবার্গ, ইঙ্গমার বার্গম্যান অ্যাওয়ার্ড, সাও পাওলো—এ রকম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় আমরা নমিনেটেড ছিলাম। তবে আমার বড় পাওয়াটা পেয়েছি দেশে ছবি মুক্তির আগে আগে।

 

সেটা কী?

‘জেলেদের নিয়ে ছবি, তাঁরা দেখবেন আগে’—এই প্রতিশ্রুতি পূরণে পটুয়াখালী গিয়ে তিনটা স্ক্রিনিং করেছি। সমুদ্রসৈকতে জেলেপাড়ায় এক হাজার জেলে তাঁদের পরিবার নিয়ে এসেছিলেন। নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখেছেন। এটা সব অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের চেয়েও বড় পাওয়া। ছবি দেখে ওরা আবেগাপ্লুত। ওরা বলত, শহর থেকে অনেকে আসে, এটা-সেটা করে আবার চলে যায়। আপনি কেন বারবার আসেন?

 

শুটিং স্ট্রাগল কেমন ছিল? অভিনয়শিল্পীরাই বা কেমন করলেন?

অনেক রকম স্ট্রাগল, বলে শেষ করা যাবে না। যেমন ওখানে মোটরসাইকেলে যেতে হয়। জোয়ারে যাওয়া যায় না, ভাটা হলে যেতে হয়। ফিল্মের এত বড় বড় ইকুইপমেন্ট নিয়ে ওখানে যাব কিভাবে, সেটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ৩৬ দিন শুটিং করেছি। জেলেপাড়ার জেলেদের হেল্প না পেলে সম্ভবই হতো না।

ছবির ৮০ শতাংশ অভিনেতাই জেলে ও তাঁদের পরিবার। শহরের হয়তো ছয়-সাতজন ছিলেন। ছবির অন্যতম মূল চরিত্র করেছেন তিতাস জিয়া। এর আগে তিনি ‘মৃত্তিকা মায়া’ করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। মঞ্চে জামিল আহমেদের ‘রিজওয়ান’ করেছেন। উনি খুব বেছে বেছে কাজ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। উনি এখন মস্কোতে পিএইচডি করছেন। ছবি মুক্তির সময়ে উনাকে সশরীরে পাচ্ছি না, এটা খুব দুঃখজনক। তাসনুভা তামান্না, ফজলুর রহমান বাবু—উনাদের চরিত্র হয়ে ওঠার একটা ব্যাপার ছিল। কারণ তাঁরা ওই এলাকার নন। তামান্না জেলের মেয়ে, বাবু ভাই চেয়ারম্যান বা মহাজন। বাবু ভাই শুটিং শুরুর বেশ কিছুদিন আগে ওখানে গিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন।

 

কাল কয়টা হলে মুক্তি পাবে ছবিটা?

আমাদের ডিস্ট্রিবিউটর স্টার সিনেপ্লেক্স। আপাতত জেনেছি যে ঢাকায় তাদের চারটি ভেন্যুতে চলবে। এ ছাড়া যমুনা, শ্যামলী, নারায়ণগঞ্জের সিনেস্কোপ, চট্টগ্রামের সিলভার স্কোপ, বগুড়ার সুগন্ধা, বরিশালের অভিরুচিতে মুক্তি পাবে।



সাতদিনের সেরা