kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

গান আমি গেয়েই ছাড়ব

বারবার তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসকরা, প্রতিবারই মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছেন ‘অর্থহীন’ ব্যান্ডের সুমন ওরফে ‘বেজবাবা’। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম রাকিব

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গান আমি গেয়েই ছাড়ব

বেজবাবা সুমন [সাইদুস সালেহীন খালেদ]

আপনার জীবনে ঝড়ের পর ঝড় বয়ে গেছে। প্রথম ঝড় সম্ভবত ২০০১ সালে, কনসার্টে গাইতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো চোয়াল আর বন্ধ করতে পারছেন না...!

আমার চোয়ালের একটা রোগ হয়েছিল—ডাক্তারি ভাষায় ‘টিএমজে ডিস-অর্ডার’। আমার কেসটা সিভিয়ার। বড় করে মুখ হাঁ করলে চোয়ালের এক সাইড ডিসলোকেটেড হয়ে যেত! সে সময় ডাক্তার আমাকে একটা ‘ডেঞ্চার’ দিয়েছিল মুখে পরে থাকার জন্য। সেটা মুখে পরে থাকলে আবার ঠিকমতো কথা বলা যেত না। সবাই বুঝতে পারত আমার মুখে কিছু একটা আছে। তিন মাস পর পর সিঙ্গাপুর গিয়ে ইনজেকশন দিয়ে আসতে হতো। কিন্তু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না যে আমি আর গাইতে পারব না। ডাক্তারের কথায় দমে যাইনি। চ্যালেঞ্জ নিলাম, গান আমি গেয়েই ছাড়ব। যখনই গাওয়ার চেষ্টা করতাম, মনে হতো মুখে বড় সাইজের দুটি সুপারি নিয়ে গাইছি। প্রথম দিকে অসহায় লাগত। পরে নানাভাবে প্র্যাকটিস করতে করতে নিজেই একটা টেকনিক বের করলাম। ৯ মাস পর অর্থহীনের ‘ধ্রুবক’ অ্যালবামে গাইলাম মুখে ‘ডেঞ্চার’ লাগিয়েই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সেটা ধরতে পারেনি। বেশ কয়েক মাস এভাবেই কনসার্ট করেছি। পরে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পর ডাক্তার বলল, আর ডেঞ্চার পরে থাকার দরকার নেই। চোয়াল ঠিক হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আমার কাছে এখনো মিরাকল মনে হয়।

 

আপনি তো খেতেও খুব ভালোবাসতেন। ওজন ছিল অস্বাভাবিক রকমের বেশি, ১৭৪ কেজি! কমিয়েছেন।

হ্যাঁ। অনেক মোটা ছিলাম। প্যান্ট পরতাম ৫৮ সাইজের। চলতে-ফিরতে কষ্ট হতো বেশ। মিউজিক এরিনায় অনেক সুমন আছে, সবাই আমাকে ‘মোটা সুমন’ হিসেবেই চিনত। ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর, একটা পার্টিতে সিরিয়াসলি ডিসিশন নিই ওজন কমানোর। আমি তখন কোক খাচ্ছিলাম। আমার পাশে সম্ভবত আর্টসেলের সাজু দাঁড়ানো। ওকে বললাম, ‘এটাই আমার লাস্ট কোক, আর খাব না, আজকে থেকে আমি শুকানো শুরু করব।’ সেই সময় খাওয়াদাওয়া একেবারেই কমিয়ে দিয়েছিলাম। দিনে পাঁচ ঘণ্টা খেলতাম আর এক্সারসাইজ করতাম। ১৮ মাসে কমিয়েছিলাম ৯২ কেজি! অনেকের ধারণা আমি সার্জারি করে ওজন কমিয়েছি। ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। আর্টসেল, ক্রিপটিক ফেইট, আরবোভাইরাস, নেমেসিসের ব্যান্ড মেম্বাররা জানে আমি কতটা কষ্ট করে ওজন কমিয়েছি।

 

যতটুকু জানি, আপনার মেরুদণ্ডে মোট সাতটি কৃত্রিম স্ক্রু। পাকস্থলীর ক্যান্সারের সার্জারিতে পুরো পাকস্থলীই কেটে ফেলা হয়েছিল। এখন কী অবস্থা?

এখন সম্পূর্ণ ক্যান্সার মুক্ত। মেরুদণ্ডে দুটি সার্জারি করাতে হবে বছরখানেকের মধ্যে। কভিড পরিস্থিতি আরো ভালোর দিকে গেলে জার্মানিতে গিয়ে সার্জারি করাব।

 

আপনাকে দেখলে অন্য রকম একটা মানসিক শক্তি বা প্রেরণা পায় মানুষ। এমন অদম্য শক্তিটা কোথায় পেয়েছেন আপনি?

সম্ভবত ব্যাপারটা জেনেটিক। আমার বাবা মানসিকভাবে প্রচণ্ড শক্ত। আমাকে দেখলে আপনারা যেমন একটা অন্য রকম শক্তি পান বলছেন, তেমনি আমি আমার বাবাকে দেখলে একটা অন্য রকম শক্তি পাই।

 

কখনোই কি আপনি ভেঙে পড়েননি?

পড়েছি। তবে সেটা কাউকে বুঝতে দেইনি।

এখন আপনার ভাবনাজুড়ে গান আছে কতখানি?

প্রথমত ফ্যামিলি, তার পরেই গান।

 

কিছুদিন আগে সহকর্মীর বিয়েতে গান করেছেন, কনসার্টে গাওয়ার জন্যও কি প্রস্তুত আছেন?

মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও শারীরিকভাবে প্রস্তুত হতে আরো দুই-তিন মাস লাগবে। টানা তিন বছর গিটার বাজাইনি বা গাওয়া হয়নি, তাই ব্যান্ড নিয়ে অনুশীলনের প্রয়োজন আছে।

 

প্র্যাকটিস কিংবা গান লেখা—কোনোভাবে কি গানের সঙ্গে আছেন? রাফার বিয়েতে নাকি আপনার সৃষ্টি ‘অদ্ভুত সেই ছেলেটি’র লিরিক মনে পড়ছিল না।

গত তিন বছর কোনোভাবেই গানের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। শুধু জয় বাংলা কনসার্টে ফুয়াদের সঙ্গে স্টেজে উঠে একটা গান করলাম কোনো রকম প্র্যাকটিস ছাড়া। এ ছাড়া ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ মুভিতে গাওয়া ‘প্রথম’ তিন বছরেরও আগে রেকর্ড করা। তবে এবার দেশে ফেরার পর নতুন গানের কাজ শুরু করেছি।

 

অর্থহীন ব্যান্ডের ভবিষ্যৎ কী?

দুই-তিন মাসের মধ্যেই একটা গান রিলিজ হবে। এর পর থেকে নিয়মিতভাবে আমরা গান রিলিজ দিতে থাকব। দেশে যখন কনসার্ট করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে তখন থেকে কনসার্টও নিয়মিত করব।

 

আপনার গানে একটা গল্প থাকে। গানে কেন গল্প বলতে চান?

অনেক ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশেছি এই জীবনে। তাদের জীবনের অনেক ইন্টারেস্টিং গল্প আমি শুনেছি। বেশির ভাগ গান লেখার সময় ‘সত্য’ কথা লিখতে পছন্দ করি। যা অনুভব করতে পারি সেটা অনেক সহজে লিখতে পারি। তাই আমার জীবন অথবা আমার আশপাশের মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়েই গান লিখি।



সাতদিনের সেরা