kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

মঞ্চে-পর্দায় রবীন্দ্রচর্চার হাল-হকিকত

বাঙালি চেতনার বাতিঘর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু ওপার বাংলার মতো করে এপারের সেলুলয়েড বা টিভি পর্দায় সেভাবে চর্চিত হয় না কবিগুরুর দর্শন। বিশেষ দিবসে টিভিতে নামকাওয়াস্তে প্রচারিত হয় নির্দিষ্ট কিছু নাটক। সেলুলয়েডে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন খুবই কম। ব্যতিক্রম মঞ্চনাটক। কবিগুরুর ৮০তম প্রয়াণ দিবস সামনে রেখে এ নিয়ে আয়োজন

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মঞ্চে-পর্দায় রবীন্দ্রচর্চার হাল-হকিকত

নতুন প্রজন্ম আসবে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিশাল সাগর, বাঙালির গৌরব। রবীন্দ্রনাথের ক্রিয়েটিভ পিরিয়ড কিন্তু এই বাংলায় তৈরি হয়েছে। উনার তখন ২৮ বছর বয়স। এই বাংলায় এসেছিলেন। আমি এটা নিয়ে নাটক করেছি ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’। রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ অবলম্বনে নাটকটি রচনা করেছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, নির্দেশনা দিয়েছি আমি। মঞ্চায়ন করেছে পালাকার।

কবিগুরুর সাহিত্য ভাবনা ও অনন্য সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়ির বিশেষ অবদান। ঠাকুর পরিবারের জমিদারি পরিচালনার জন্য এখানে এসে তিনি ভালোবেসেছিলেন ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লী শিলাইদহকে।

এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য ও প্রমত্তা পদ্মা নদী ও পদ্মার বুক থেকে বেরিয়ে আসা গড়াই নদীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কুঠিবাড়ি, পদ্মা ও গড়াই নদীর বুকে রচিত হয়েছে কবির সাহিত্যকর্মের শ্রেষ্ঠাংশ। পৈতৃক জমিদারি দেখতে এখানে এসেছিলেন। তখনো তাঁর কানে বাজছে আইরিশ গানের সুর। ইংল্যান্ড থেকে সবে এসেছেন। এখানে এসে লালনের গান শুনলেন, গগন হরকরার গান শুনেছেন। ‘ছিন্নপত্র’, ‘ছুটি’র মতো অনন্য লেখা এখানে। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রচিত হয়েছিল শিলাইদহের ডাকপিয়ন গগন হরকরা  রচিত ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটির সুরের অনুষঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ তাই এই বাংলার মানুষের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

রবীন্দ্রনাথের বহু নাটক করেছি। ‘রক্তকরবী’ যার অন্যতম। আলী যাকেরের নির্দেশনায় ‘অচলায়তন’ করেছি। ‘মুক্তধারা’, ‘রথের রশি’—অনেক অনেক করেছি। টেলিভিশনেও প্রচুর কাজ হয়েছে। ‘হৈমন্তী’তে তো আমি দুইবার অভিনয় করেছি। চলচ্চিত্রে অর্থকড়ির ব্যাপার আছে, নাটকে সে দায়টা অত নেই। তাই বাংলাদেশের নাটকে রবীন্দ্রনাথ বেশি ছড়িয়েছে। ভিক্ষা করে হলেও আমরা মঞ্চনাটক করেছি। সিনেমায় আমাদের বড় বড় নির্মাতারা সেভাবে ভাবেননি। হয়তো ভেবেছেন, একটা করতে যাব, যদি ঠিকমতো না হয় তাহলে সবটা শেষ! ঠিকমতো না করতে পারলে লোকে ধিক্কার দেবে।

রবীন্দ্রনাথকে যে সমসাময়িক করা হয়নি তা-ও নয়। ‘অরূপ রতন’ ও ‘রাজা’ হয়েছে। ‘হ্যামলেট’ করেছি শেকসপিয়ারের, সেখানেও রবীন্দ্রনাথ ঢুকিয়েছি। মঞ্চে এমন এক্সপেরিমেন্ট আমরা করেছি। সব দিন এক যায় না। কলকাতায় যখন স্বাধীনতার পর যাই, তখন সেখানে মঞ্চের রেনেসাঁ। একদিকে উৎপল দত্ত, একদিকে শম্ভু মিত্র। আমাদেরও রেনেসাঁ এসেছে। ‘ঢাকা থিয়েটার’, ‘নাগরিক’, ‘আরণ্যক’, ‘ঢাকা পদাতিক’ মিলিয়ে আমাদের মঞ্চনাটকের জোয়ার। এখন কি সেই দিন আছে? নেই। সব উত্থান কিন্তু ঘন ঘন হয় না। বঙ্কিমের পরে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো, রবীন্দ্রনাথের পর বহুদিন অপেক্ষার পরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা এলেন। নবজাগরণ ঘন ঘন হয় না। এখনো হয়নি মানে যে পাঁচ বছর পর হবে না, এমন না। নতুন প্রজন্ম আসবে। হয়তো আমরা থাকব না। আমি হয়তো দেখব না। হয়তো তারা রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ স্পেসে বসিয়ে দেবে।

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র নাট্য-সাহিত্যজুড়ে বিরাজ করছে ধর্মীয় গোঁড়ামি, ভণ্ডামি, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও ক্ষুদ্রতার স্বরূপ উদ্ঘাটন; পাশাপাশি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সোচ্চার উচ্চারণ। আমার ধারণায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পলিটিক্যাল নাট্যকার, যেভাবে বের্টল্ট ব্রেখটকে জার্মানির সেরা ‘পলিটিক্যাল’ নাট্যকার বলা হয়। রবীন্দ্রনাটক হয়তো ব্রেখটের নাটকের মতো প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিঘনিষ্ঠ নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতীকের আবরণে মোড়া ও ইঙ্গিতবহ পাশাপাশি এক অনিন্দ্যসুন্দর নান্দনিক সৃজনও বটে। রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হবে। অনেক বেশি জানার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে শুধু রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়েই হুবহু কিছু নয়, নিজের মধ্যে আরো অনেক কিছু সঞ্চারিত করতে পারবে এই প্রজন্ম।

 

অসহায়ত্বের মধ্যে আছি

আমরা যখন ‘প্রাঙ্গণেমোর’ নাটকের দল করি তখন ঘোষণা দিয়েই শুরু করেছিলাম, বাংলাদেশে রবীন্দ্র নাট্যচর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেব। এমন ঘোষণাও ছিল, যদি বছরে একটি নাটকও করতে পারি সেটা অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের হবে। যদি একাধিক করতে পারি তাহলে হয়তো অন্য নাট্যকারের নাটক করব। পরে আমরা একে একে রবীন্দ্রনাথের পাঁচটি নাটক করেছি, এখন পর্যন্ত। বাংলা ভাষায় যাঁরা থিয়েটার চর্চা করেন তাঁদের আর কারো মধ্যে এমনটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক বছর পর পর রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে উৎসব আয়োজন করেছি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাজ করার মূল চ্যালেঞ্জটা হলো ভালোবাসা। দ্বিতীয় কারণ, রবীন্দ্রনাথের নাটক করতে হলে তাঁর দর্শন বুঝতে হবে, এ জায়গাটায় ভয়ংকর সংকট তো আছেই। পশ্চিমবঙ্গের নাট্যচর্চার কথাও যদি বলি, তাঁরা বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ছবি রাখবেন, ঠাকুর বলে পুজো করবেন, কিন্তু চর্চা সেরকম করবেন না।

টেলিভিশনে ছোটগল্প বা কবিতা থেকে অনেক নাটক হয়েছে। সব মাধ্যমের জন্য রবীন্দ্রনাথের ৩৭টি নাটক আছে, এটাও খুব সত্য। ঘুরেফিরে সেখান থেকে অল্প কিছু গল্প আসছে সব জায়গায়। একটু এড়িয়ে চলার প্রবণতা তো আছেই। সবটা আসলে ছোঁয়ার চেষ্টা করা হয় না। আমরা হয়তো বিষয়টার গভীরে ঢুকতে পারি না। আরো যে গল্প, গীতিনাট্য আছে, হয়তো বুঝতে পারি না। বুঝতে পারলেও কিভাবে করব জানি না।

ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সত্যজিৎ রায়কে রাষ্ট্র সব সময় পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তাঁর একটি ছবি শেষ হওয়ার আগে পরের ছবির প্রযোজক রেডি থাকতেন। সে ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা এখানে কি কেউ কখনো পেয়েছে? একটা অনুদান দেওয়া হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্রের জন্য কি আলাদা কিছু দেওয়া হয়? যদি ভাবি আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চলচ্চিত্র করব, টাকাটা কে দেবে? এখানকার লগ্নিকারকরা রবীন্দ্রনাথ বা সাহিত্যে কোনো দিনই সাহস করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথকে সমসাময়িক করতে না পারার কারণটাও প্রযোজক। ‘শেষের কবিতা’ আরো এক শ বছর পরও আধুনিকতম গল্প। আগে একটা প্র্যাকটিস ছিল, সারা বছর না হোক রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যু দিবস ঘিরে টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথের নাটক হতো। এখন সে চেষ্টাটাও নেই। আমি প্রচুর নাটক করেছি রবীন্দ্রনাথের। এখন টেলিভিশনের নাটকের কী অবস্থা সে আলোচনায় না যাই। আমরা যাঁরা এসব নিয়ে ভাবি, তাঁরা একটা অসহায়ত্বের মধ্যে আছি।

ভালোবাসার জায়গা থেকে ছবিটা করেছি

আমি ত্রিমাত্রিক এনিমেশনে পারদর্শী। দেশের বাইরেও কিছু কাজ করেছি। সেখান থেকেই দেশে একটা কিছু করার সাহস হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প ‘ডিটেকটিভ’ নিয়েই সাহসটা করলাম। তারিক আনাম খান স্যারেরও উৎসাহ ছিল। তিনিই নাট্যরূপ করে দিয়েছেন। কাজটা কেমন হওয়া উচিত—এসব ব্যাপারে উনি নিঃস্বার্থ সহযোগিতা করেছেন। তবে আমি এককভাবেই বানিয়েছি। দেশের অনেকেরই সহযোগিতা নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খুব একটা আন্তরিকতা পাইনি। অনেকে নিরুৎসাহ করে বলেছেন, এত কষ্ট করে সময় ব্যয় করে যে কাজটা করছ, সেটার ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে নেই। বাজেট নিয়ে টেনশন ছিল না। কারণ কাজটা তো আমার একার হাতেই করা। আর্ট কালচারের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই জড়িত। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য। তারিক আনাম স্যারের সঙ্গে বিজ্ঞাপন বানিয়েছি। আর বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথের জায়গা তো ওপরের সারিতে। তাই তাঁরই দ্বারস্থ হলাম। রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে বানানো নাটক বা সিনেমায় কেমন যেন গরিবি অবস্থা। অল্প ক্যারেক্টার, সেই পুরনো বাড়ি—সেটা ভাঙার চেষ্টা করেছি। গল্পে লেখা আছে মহিনবাবু জিপ নিয়ে বের হয়েছে। আমি ভাঙা পুরনো একটা জিপ কেন দেখাব। জিপটা তো কোনো না কোনো সময় নতুন ছিল। আমার মাথায় ছিল যে ওই বাড়িটা তো প্রাসাদ ছিল। টাইলস করা। ম্যাড়মেড়ে কেন দেখাব। একজন রিকশাওয়ালার গায়ে শুধু পুরনো জামাই কেন দেখাব, জামাটা তো সে এক সময় নতুন কিনেছিল। সেদিনেরটা দেখাই। এইভাবে নির্মাণ করেছি। সিনেমাটি জাজ মাল্টিমিডিয়ার কাছে বিক্রি করেছি। কিছু দেনাপাওনা আছে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু সিনেমাটির দায়দায়িত্ব এখন ওনাদের। বিজনেস, লাভ-লোকসান সব ওদের ব্যাপার। জাজ মাঝে কিছু ঝামেলায় পড়ল, এ জন্য মুক্তি পিছিয়েছে। তারপর তো করোনা এলো। ছবিটার রেজাল্ট ভালো হলে সাহিত্যনির্ভর আরো কাজ করব। এই প্রজেক্ট প্রায় পাঁচ বছর ধরে করেছি। এই সময় অন্য কোথাও সময় দিলে হয়তো আরো বেশি অর্থ পেতাম। কিন্তু কাজটা আমি করেছি ভালোবাসার জায়গা থেকে।



সাতদিনের সেরা