kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

বলেছিল, ‘জয় বাংলা’ কাটতে হবে

২৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বলেছিল, ‘জয় বাংলা’ কাটতে হবে

মোরশেদুল ইসলাম

স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মোরশেদুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ, চ্যালেঞ্জ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

‘আগামী’, ‘সূচনা’, ‘শরৎ ৭১’, ‘খেলাঘর’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’—মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছয়টি ছবি বানিয়েছি। শুরুটা ১৯৮৪ সালে, স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘আগামী’ দিয়ে। যখন ছবি করার সিদ্ধান্ত নিই তখন একেবারেই তরুণ। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, শুধু ছবি করার জন্য করব না, একটা কিছু বলার আছে সে জন্য ছবি করব। প্রথম মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কথাটা আমাদের বলা উচিত, কেউ বলছে না। মুক্তিযুদ্ধের তখন যে অবস্থা ছিল—প্রতিকূল পরিবেশ। আমি আমার ছবিতে (আগামী) সে কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। রাজাকাররা আবার পুনর্বাসিত হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা মনে হচ্ছে অসহায়। কিন্তু তার মধ্যেও একটা ছোট্ট ছেলে প্রতিবাদ করছে। যার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের সময়, একজন মুক্তিযোদ্ধার ঔরসে। সে-ই হবে আগামী দিনের মুক্তিযোদ্ধা। এই বার্তা নিয়েই ছবিটি করেছিলাম।

ছবিটা প্রথমে সেন্সর দেয়নি। বলেছিল, ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী’ সংলাপ ছিল, সেটা কাটতে হবে, শুধু ‘হানাদার বাহিনী’ বলতে হবে। তারপর ‘জয় বাংলা’ সংলাপও কাটতে হবে। মেনে নিইনি, আমরা আন্দোলন করেছিলাম। আমার পক্ষে অনেকেই দাঁড়িয়েছিল। ৫২ জন বুদ্ধিজীবী একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন—‘আগামী’র মুক্তি দেওয়া হোক। এরপর আমি আপিল বোর্ডে যাই। সেখানে নানামুখী চাপে ছবিটি সেন্সর পায়। কিন্তু সেটাও সহজ ছিল না। আপিল বোর্ডে তখন যিনি সচিব ছিলেন তিনি ছিলেন একজন রাজাকার। সেটা তখন বুঝতে পারিনি। উনি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে খুবই খারাপ মন্তব্য করলেন—‘এই মুক্তিযোদ্ধা শালারাই তো দেশটারে ডুবাইছে।’ তখন আমি সচিবালয়ের ভেতরে তাঁর কলার চেপে ধরি। বলি, আপনাকে মাফ চাইতে হবে। তিনি মাফ চান, নিজের মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। এই রকম নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রথম ছবিটিকে যেতে হয়েছে।

আমার ছবিতে বারবার মুক্তিযুদ্ধ ফিরে আসার কারণ মুক্তিযুদ্ধ আমার খুব প্রিয় বিষয়। কারণ আমরা সেই সময়টাতে বড় হয়েছি...মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৩। ক্লাস সেভেনে পড়তাম। ওই সময়টাতে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মুক্তিযুদ্ধটা। আমি অবরুদ্ধ ঢাকা শহরেই ছিলাম। পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাও করেছি। আমার বড় ভাই (অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম) মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যখন প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় এলেন, মাঝেমধ্যে বাসায় আসতেন। কিন্তু অস্ত্র নিয়ে আসতেন, আমি ও আমার বড় বোন সেগুলো লুকিয়ে রাখতাম। এসব কারণে পরে যখনই সুযোগ পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করার চেষ্টা করেছি।

এ কথাটা ঠিক, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রে কম কাজ হয়েছে। সেটা কেন আমি বলতে পারব না, যাঁরা করেননি তাঁরা বলতে পারবেন। কেউ কেউ করেছেন...তানভীর ভাই (তানভীর মোকাম্মেল) করেছেন। তবে ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজের আগ্রহ কম দেখছি। এ ক্ষেত্রে বাজেট একটা বড় সমস্যা বটে। মুক্তিযুদ্ধের ছবি সত্যিকার অর্থে করতে গেলে অনেক বাজেট দরকার। সে জন্য আমরা এমন গল্প বেছে নিই যেখানে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধটা দেখানোর দরকার নেই। আমার ‘খেলাঘর’ ছবিতে যেমন। ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এ একটা যুদ্ধের দৃশ্য ছিল, সেটাও সেনাবাহিনীর সহায়তা পেয়েছিলাম বলে করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এখন সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় ক্যানভাসে কাজ করার। সেই রকম ছবি করতে গেলে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া হবে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিজের কাজের মধ্যে ‘খেলাঘর’ আমার খুব প্রিয় ছবি। এ ছাড়া তরুণরা যখন ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ দেখে, তারা খুবই উজ্জীবিত হয়। এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এ ছাড়া ‘অনীল বাগচীর একদিন’ও আমার প্রিয় ছবি। 

 

অনুলিখন : লতিফুল হক



সাতদিনের সেরা