kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

এ এক নতুন শ্রাবন্তী

৪ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এ এক নতুন শ্রাবন্তী

থাকেন মার্কিন মুলুকে। ১১ বছর হলো নতুন কোনো নাটক-সিনেমায় নেই। তবু ইপশিতা শবনম শ্রাবন্তীকে ভুলে যায়নি দর্শক। পারিবারিক কাজে স্বল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছেন ‘একান্নবর্তী’ অভিনেত্রী। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রুম্মান রশীদ খান

জন্মভূমির কোন বিষয়টি বেশি মিস করেন? শ্রাবন্তীর ঝটপট উত্তর, ‘কাজের মানুষ’। প্রবাসে ‘সিঙ্গল মাদার’ হিসেবে দুই মেয়ের দেখাশোনা, রান্নাবান্না, বাজার-সদাই, ঘরদোর সাফাই—সব এক হাতে সামলে নেন সাবেক এই ফটোসুন্দরী, নৃত্যশিল্পী, মডেল ও অভিনেত্রী। উত্তরটা তাই প্রত্যাশিতই। রিকশায় চড়া, ফুসকা-চটপটি কিংবা মন চাইলেই বন্ধু-পরিজনদের দেখতে পাওয়া—এই তিনটি বিষয় ছাড়া দেশের জন্য এখন আর মন কাঁদে না শ্রাবন্তীর। “আমার মতো চঞ্চল মেয়ে এখন ধৈর্য ধরা শিখে গেছে। ১০ বছর আগেও যেকোনো আকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে আমার প্রকাশভঙ্গি ছিল, ‘এটা আমার চাই, এখনই লাগবে।’ অথচ এখন যা লাগবে, তার জন্য আমি অপেক্ষা করতে পারি। পেলে ভালো, না পেলেও সমস্যা নেই।” নতুন এই গুণ (ধৈর্য) শ্রাবন্তীকে সমৃদ্ধ করেই চলেছে। শরীরের ওজন ১০০ কেজি ছাড়িয়ে গিয়েছিল! ৪৮ কেজি ওজন কমিয়ে তিনি এখন অনেকটাই ঝরঝরে! আত্মসমালোচনায় বরাবরই মুখর শ্রাবন্তী। বলেন, ‘নিজেকে একটা সময় হাতির বাচ্চা মনে হতো। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে হতাশায় ডুবে গিয়েছিলাম। পরে মনে হলো, আমাকে সুস্থ থাকতে হবে। নিজের জন্য, দুই মেয়ের জন্য। ব্যস! মেদ-চর্বির কাছে জেদ জয়যুক্ত হলো।’

শ্রাবন্তীর জীবনে আরেকটি অধ্যায় যোগ হতে যাচ্ছে শিগগিরই, নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে চাকরি করতে যাচ্ছেন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। এক বছর পড়াশোনা করে সার্টিফিকেট কোর্স শেষ করেছেন। নিজের অতীতকে তুলাধোনা করে বলেন, ‘যে মেয়ে আগে পড়াশোনা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকত, সে এখন আমেরিকায় গিয়ে মেডিক্যাল সায়েন্সে ডিগ্রি নিয়েছে। সামনে আরেকটি কোর্স করব। মেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে হোম ওয়ার্ক করি। জীবন বড়ই বিচিত্র, সুন্দর।’

শ্রাবন্তীর বড় মেয়ে রাবিয়াহ (৯), ছোট মেয়ে আরিশা (৬)। দুই মেয়ের খুব ইচ্ছে, মাকে অভিনয় করতে দেখবে। শ্রাবন্তীর পুরনো নাটক দেখে মেয়েরা মায়ের দিকে ‘হাঁ’ করে তাকিয়ে থাকে। পর্দায় মাকে প্রেমের অভিনয় করতে দেখলে মেয়েরা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। আরিশা কিছুটা প্রতিবাদীও, ‘মা, তুমি ওই আংকেলের সাথে এত ক্লোজ হচ্ছ কেন?’    

তিনি দেশে আছেন, খবর পেয়ে অনেক নির্মাতাই অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। শ্রাবন্তীও চান, মেয়েদের জন্য এবার একটি নাটক হলেও করবেন। ১৯ মার্চ ফিরে যাবেন। যা করার এর আগেই করবেন। তবে শ্রাবন্তীর মৃদু অভিযোগ, ‘এখন ঝগড়াঝাঁটির নাটক বেশি হয়। হয় ঝগড়াঝাঁটি, নয় কান্নাকাটি। আমি করতে চাই শান্তিপূর্ণ একটি ভালো নাটক।’

এই সময়ের শিল্পীদের মধ্যে মেহজাবীন চৌধুরীর অভিনয় শ্রাবন্তীর খুব পছন্দ। ‘মেয়েটা খুব ভালো করছে। বোঝা যায়, মন দিয়ে কাজ করে। তানজিন তিশাও নাকি খুব ভালো করে। নিশো, অপূর্ব তো এখন সুপারস্টার। অপূর্ব সব সময়ই ভালো করত। এখন আরো ভালো করছে। ভীষণ বিনয়ী। আমার বিশ্বাস, অপূর্ব অনেক দূর যাবে’, বলেন শ্রাবন্তী।

সাড়ে তিন বছর বয়সে রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান গিয়ে নেচেছিলেন শ্রাবন্তী। এরপর ‘নতুন কুঁড়ি’সহ সম্মানজনক সব পুরস্কারই পেয়েছেন ছোটবেলায়। ভরতনাট্যম শিখেছেন সোমা মমতাজের কাছে। নাচটা ভীষণ মিস করেন। দুই মেয়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে অনেক কিছুতেই ছাড় দিতে হচ্ছে তাঁকে। তাই বলে আফসোস নেই। ‘ওখানে বেশ আরামেই আছি। বাংলাদেশে থাকলেই বরং কষ্ট হতো। বলতে খারাপ লাগলেও সত্যি, এখানকার অনেকেই সিঙ্গল মাদারদের ভালো চোখে দেখেন না। শিক্ষার হার বাড়লেও আলোকিত মানুষের সংখ্যা কমছে। সে তুলনায় আমেরিকায় সিঙ্গল মাদার হিসেবে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাই। ভালোই তো আছি’, বলেন শ্রাবন্তী। এই ভালো থাকার জীবনটা নতুন করে কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করার ইচ্ছে হয় না? কেউ যদি এসে গান ধরে ‘প্রেমে পড়েছে মন’? সহাস্যে শ্রাবন্তীর উত্তর, ‘আমি বলব, তুমি মিষ্টি করে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলো, শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে প্রেম-বিয়ে-সম্পর্ক আমাকে দিয়ে আর হবে না। দেশে এলে আমার দুই মেয়ে ওদের বাবার সঙ্গে থাকে। ওদের বাবাও নিউ ইয়র্কে ওদের সঙ্গে দেখা করতে যায়। জীবনে অহেতুক জটিলতা বাড়িয়ে লাভ কী?’

একান্নবর্তী, সিক্সটি নাইন, নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল, জোছনার ফুল, হৃদয়ের একূল ওকূল, অনুর একদিন, অপু দ্য গ্রেট, ভাত ঘুম, দ্বিতীয় জীবনের মতো অনেক জনপ্রিয় নাটকের অভিনেত্রী শ্রাবন্তী। করেছেন চলচ্চিত্র ‘রং নাম্বার’ও। সেই শ্রাবন্তী ‘ডালিম কুমার’ (২০১০) নাটকের পর আর লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের মুখোমুখি হননি। জীবনের অঙ্ক কষতে বসলে শিল্পী শ্রাবন্তীর কোনো অপ্রাপ্তি খুঁজে পান না তিনি। তবে একটা বড় ক্ষত বুকের ভেতর প্রতিদিন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, ‘ইশ, আম্মার সঙ্গে যদি আরেকটু সময় কাটাতে পারতাম!’

বাবাহীন জীবনে মা-ই ছিল শ্রাবন্তীর সব। অসুস্থ ছিলেন মা। তাঁকে দেখতেই গত বছর ৯ অক্টোবর একবার ছুটে এসেছিলেন নিউ ইয়র্ক থেকে বগুড়ায়। ২০ অক্টোবর মেয়ের হাতে মাথা রেখে পরপারে পাড়ি জমান মা।

মন্তব্য