kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

এ টি এম নেই জানেনই না তাঁর বন্ধু

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এ টি এম নেই জানেনই না তাঁর বন্ধু

‘কিসমত’ ছবিতে এ টি এম শামসুজ্জামান ও প্রবীর মিত্র

অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী প্রবীর মিত্র। কানে কম শোনেন, কমে গেছে চোখের জ্যোতিও। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে বন্ধু এ টি এম শামসুজ্জামানের মৃত্যুর খবরটা তাঁকে জানাননি পরিবারের সদস্যরা। প্রবীরের শিয়রে বসে তাঁদের বন্ধুত্বের গল্প শুনে এলেন সুদীপ কুমার দীপ

এ টি এম আমার আত্মার বন্ধু। জীবনের বেশির ভাগ সময় আমরা বিভিন্ন ছবির শুটিংয়ে কাটিয়েছি। একসঙ্গে মঞ্চনাটক শুরু করলেও চলচ্চিত্রে সে আমার আগেই এসেছিল। শুরুতে সহকারী পরিচালক হিসেবে শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই পা রাখে অভিনয়ে। আমার প্রথম ছবি এইচ আকবরের ‘জলছবি’র কাহিনীকার ও সংলাপ রচয়িতা এ টি এম। একই ছবিতে অভিষেক ঘটেছিল নায়ক ফারুকেরও। এ টি এম যেহেতু চলচ্চিত্রে আগেই পা রেখেছে, তাই তার অভিজ্ঞতাও বেশি। আমি বিভিন্ন বিষয়ে তার পরামর্শ নিতাম। খুবই সাদামাটা মানুষ সে। কোনো অহংকার নেই। কেউ ভালো অভিনয় করলে, কোনো ছবি ভালো ব্যবসা করলে, অন্য কেউ ভালো গল্প লিখলে—সেটাকে অকপটে ‘ভালো’ বলে স্বীকার করে নিত।

আমার পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর হলেও বেড়ে উঠেছি পুরান ঢাকায়। সে নোয়াখালীর ছেলে, বাবার ওকালতি পেশার কারণে ঢাকায় থাকত। একই এলাকায় আমরা বেড়ে উঠেছিলাম। পগোজ স্কুলেও আমরা একসঙ্গে পড়েছি। ছেলেবেলা থেকেই এ টি এম প্রতিবাদী। তবে কারো সঙ্গে বিবাদে জড়াত না। বরং কেউ ঝামেলা করতে এলে হাসিমুখে মিটিয়ে নিত। এই গুণ এখনো আছে। ২০১৩ সালে যখন তার ছোট ছেলে বড় ছেলেকে হত্যা করে, নিজেই বাদী হয়ে ছোট ছেলের নামে মামলা করে সে। বিচার আদায় করেও ছাড়ে। যাবজ্জীবন জেল হয়েছে ছেলেটির। নিষ্ঠার জায়গায় নিজের ছেলেকেও ছাড় দেয়নি সে। এমন মানুষ এই যুগে পাওয়া কঠিন।

আমি অসুস্থ হলাম ২০১৭ সালের মে মাসে। খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে দেখতে চলে এলো। সাহস দিল। করোনার মধ্যেও নিয়ম করে ফোন দিয়েছে আমার ছেলের নম্বরে। আমি ফোনে ঠিকমতো কথা শুনতে পাই না, তাই ফোন ব্যবহার করি না। সপ্তাহে দুই-তিনবার করেও খোঁজ নিয়েছে সে।

মাঝখানে কয়েকবার এ টি এমের মরার সংবাদ পেয়েছিলাম। প্রতিবারই কেঁদেছি। মনেপ্রাণে চেয়েছি খবরটি যেন মিথ্যা হয়। মিথ্যা হয়েছে প্রতিবারই। পরে ফোন করে বলতাম, মরণে ভয় কিসের! আমরা এত দ্রুত মরব না। প্রায় চার বছর ধরে শয্যাশায়ী আমি। মাঝেমধ্যে আমার ছেলে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে যায়। তখনই বাইরের পৃথিবীটা দেখা হয়। আমি আর এ টি এম একটা সময় ভাবতাম আমরা বুঝি বৃদ্ধ হব না। সারাজীবন পর্দায় যেমন নায়ক ছিলাম, বাস্তবেও তেমন থাকব। আসলে সেটা ভুল ছিল। শারীরিকভাবে কতটা ভেঙে পড়েছি তা শুধু আমরাই জানি। এ টি এমের সঙ্গে আমার নানা বিষয়ে মিল। একটা সময় ছিল যখন আমরা এক দিন দেখা না হলেই অস্থির হয়ে যেতাম। দেখা যেত একটা ছবিতে আমাকে কাস্টিং করা হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বলতাম এ টি এম আছে তো! এ টি এমও সেটা করত। পরিচালকের সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করে কত কত ছবিতে আমাকে কাস্টিং করাত। এটা শুধু ভালোবাসা নয়, আত্মার টান। কত সোনালি দিন পার করেছি আমরা। কী যে দুরন্ত কৈশোর! এখন ভাবতে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়। আমার ছেলে (নিপুণ মিত্র) তো বলে, ‘বাবা তুমি অতীত নিয়ে একদম চিন্তা করবে না। বর্তমানকেই মেনে নাও।’ সত্যিই কি অতীত ভোলা যায়? এ টি এমকে চোখের সামনে দেখি না এক বছর হয়ে গেল। অনেক দিন হলো দুজনের কথাও হয় না। কবে যে সব স্বাভাবিক হবে! কবে যে আবার প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারব। আদৌ কি আমি সুস্থ হব! জানি না।

মন্তব্য