kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

‘তাকিয়ে দেখি তিনি কাঁদছেন’

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘তাকিয়ে দেখি তিনি কাঁদছেন’

দর্শকের কাছে ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ (১৯৮২)-এর আলী যাকের অবিস্মরণীয়। তবে প্রয়াত অভিনেতার ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল ‘গ্যালিলিও’ ও ‘ম্যাকবেথ’। ২০১৫ সালে নিজের ৭১তম জন্মদিনে কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনটি নাটক নিয়েই বলেছেন আলী যাকের। সেখান থেকে নির্বাচিত কিছু অংশ

সৈয়দ শামসুল হক সাহেব তখন লন্ডনে বিবিসিতে কাজ করেন। গবেষণার কাজে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া লাইব্রেরিতে খুঁজতে খুঁজতে নূরলদীন চরিত্রের খোঁঁজ পান। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নূরলদীন ছিলেন বাংলার প্রথম কৃষক বিদ্রোহী। তাঁর সম্পর্কে খোঁজ করতে করতে বেশ কিছু চরিত্রের দেখা মেলে, বেশ কিছু চরিত্র তিনি কল্পনা করে নেন। তিনি ভাবেন, এসব চরিত্র নিয়ে অসাধারণ একটি নাটক হতে পারে। তিনি নাটকটি লেখেন। পরে আমাদের রিহার্সাল রুমে বসে হক ভাই সেটি পড়লেন। আমরা বিমোহিত হয়ে গেলাম। তিনি নূরলদীনকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এটা আপনার সন্তান, আপনি এর নির্দেশনা দেবেন এবং নূরলদীনের চরিত্রে আপনিই অভিনয় করবেন।’ এই প্রথম একটা মেজর নাটকে অভিনয় ও নির্দেশনা দুটিই করলাম।

এর ক্যানভাসটা এত বড়! আমাদের মঞ্চের যে সীমাবদ্ধতা, তাতে এমন ব্যাপ্তির নাটক করা খুব দুষ্কর। পুরো উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে রংপুরের ফতেহপুর, কাকিনা, ট্যাঁপা, ডিমলাজুড়ে নাটকের বিস্তার। আমাকে চলমান মঞ্চের কথা চিন্তা করতে হয়েছে। কারণ সেট বদল করতে গেলেই ভেজাল হবে। যদি না আমার একটা রিভলভিং স্টেজ থাকে কিংবা বিদেশে যেভাবে করে সেভাবে আমি ওপর থেকে ক্রেনের মাধ্যমে সেট নামিয়ে নিতে না পারি, তাহলে এই নাটক করা খুব কঠিন। আমাদের দেশে তো এই সুবিধাগুলো নেই। ওখানে ধু ধু প্রান্তরের একটা রেফারেন্স আছে। আমি চিন্তা করে নিলাম, গোটা ক্ষেত্রটি একটি বিশাল প্রান্তর, আদিগন্ত নগ্নভূমি। সেখানেই নূরলদীনের বিচরণ, সেখানেই তাঁর যুদ্ধ, প্রেম, হতাশা, দুঃখ। সেখানে ব্রিটিশদেরও দুরভিসন্ধি-ষড়যন্ত্র এবং সেখানেই তাদের ড্রামা। তাহলে এই প্রান্তরটা কিভাবে রাখব? একটা নদীর চর বেছে নিলাম। ধরে নিলাম তিস্তারই চর, বালুচর যে রকম হয়, মঞ্চের শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত এ রকম উঠে গেছে। একদিকে একটা গরুর গাড়ির চাকা। যেহেতু সেদিকে মঙ্গা হয়, সেহেতু একটা মরা গরুর খুলি পাশে ঝোলানো। অদূরে একটা তালগাছ, কিন্তু সেটার পাতা পুড়ে গেছে। এই হলো আমার সেট। বাকিটা আকাশ। কারণ নাটকটি শুরুই হয় এই কথা বলে, ‘নীলক্ষা আকাশ নীল’। বারবার এ কথা এসেছে, বারবার চাঁদের বর্ণনা এসেছে। কী অসাধারণ সব লাইন সৈয়দ হক লিখেছেন চিন্তা করা যায় না। আব্বাস (আসাদুজ্জামান নূর) বলছে, ‘তুমি এখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেয়ো না। কেননা তোমার শক্তি নেই। ওরা অনেক শক্তিশালী।’ তখন ও (নূরলদীন) বলছে, উপমাটা চিন্তা করুন, চাঁদনী রাতের গল্প, কথা হচ্ছে নদীর চরে দাঁড়িয়ে, ‘পূর্ণিমার চাঁদ, বড় হয় রে ধবল, জননীর দুগ্ধের মতো তার দেখ রোশনাই।’ জননীর দুগ্ধ কে দেখেছে? তাঁর (সৈয়দ শামসুল হক) শব্দকল্প, চিত্রকল্প একবার চিন্তা করুন...আরো বলছে, ‘মরো যদি, কোনো দুঃখ নাই, হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই।’ মানে আমি মরতে পারি, কিন্তু জীবন তো মরে যাবে না, জীবন এগিয়েই যাবে। সংলাপগুলো যখন বলতাম, এমন একটি সময়ও যায়নি আমার চোখ দিয়ে পানি বেরোয়নি। মনে মনে আমি নাটকটি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলাম। মনে আছে, তখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। তিনি প্রায়ই নাটক দেখতে চলে আসতেন। আমাদের জানাতেনও না। কাউকে পাঠিয়ে দিয়ে টিকিট কাটিয়ে রাখতেন। সামনের সারি বা দ্বিতীয় সারিতে বসে নাটক দেখে চলে যেতেন। ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ যেদিন দেখলেন, বললেন, ‘আমি তাঁদের সঙ্গে একটু দেখা করব, আলী যাকেরের সঙ্গে দেখা করব।’ উনি নাটক দেখে বেরিয়ে মহিলা সমিতি হলের পাশের বারান্দা দিয়ে গটগট করে আমাদের গ্রিনরুমের দিকে চলে আসছেন। তখন আমি মেকআপ তুলছি। কে যেন দৌড়ে এসে বলল, ‘শেখ হাসিনা আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন।’ মেকআপ রেখে বেরিয়ে গেলাম। করিডরে আমার সঙ্গে তাঁর দেখা। আমার দিকে দুটো হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি তাঁর দুটি হাত আমার হাতে নিলাম। তাকিয়ে দেখি তিনি কাঁদছেন। বিশ্বাস করুন, কোনো অতিশয়োক্তি নেই। শেখ হাসিনা কাঁদছেন। আমি বললাম, ‘এটা আমার পিতৃঋণ শোধ করার একটা প্রয়াস।’ সে স্মৃতিটা এখনো শেখ হাসিনার মনে আছে কি না জানি না। কিন্তু সেই স্মৃতি আমি জীবনেও ভুলব না। তখনো তাঁর ক্ষমতা হয়নি, কিছুই হয়নি।

এই নাটকের স্মৃতি এখনো বুকে ধারণ করে চলেছি। কী সব অভিনয়, কী সব কথা...শেষের দিকে এক জায়গায় আছে, ‘এক নূরলদীন যদি চলি যায়, হাজার নূরলদীন তবে আসিবে বাংলায়, এক নূরলদীন যদি মিশি যায়, অযুত নূরলদীন যেন আসে-যায়, নিযুত নূরলদীন যেন বাঁচি রয়। এ দেশে হামার বাড়ি, উত্তরে না আছে হিমালয়? উয়ার মতো খাড়া যেন মানুষেরা হয়, এ দেশে হামার বাড়ি, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উয়ার মতো গর্জিয়া উঠে যেন মানুষের স্বর, এ দেশে হামার বাড়ি, পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র আছে, উয়ার মতো ফির যেন মানুষের রক্ত নাচে, এ দেশে হামার বাড়ি, পশ্চিমে পাহাড়ের মাটি, উয়ার মতো খাড়া হয় যেন মানুষের ঘাঁটি। হয় হয়, হয় হয়।’ এই শেষ হচ্ছে। ঘটনাটা এ রকম, নূরলদীন মারা যাচ্ছে, তার লাশ মঞ্চে রাখা হলো। সেখান থেকে উঠে সে পুরো গল্পটা বলে তারপর মৃত্যুশয়নে চলে গেল। 

অবশ্য আমি বলব না, এটি আমার শ্রেষ্ঠ অভিনয়। আমার বিচারে এর চেয়ে ভালো অভিনয় করেছিলাম শেকসপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে। এই সৈয়দ শামসুল হকেরই রূপান্তর; থিয়েটার আর নাগরিকের যৌথ প্রযোজনায় ব্রিটিশ কাউন্সিলের আনুকূল্যে লন্ডন থেকে বিখ্যাত ব্রিটিশ পরিচালক ক্রিস্টোফার সানফোর্ড এসে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বাংলা জানতেন না। কিন্তু ‘ম্যাকবেথ’ তাঁর এমনই আত্মস্থ ছিল আমরা ডায়ালগ বললে তিনি বুঝতেন কোন ডায়ালগটা দিচ্ছি। তাঁকে সহকারী পরিচালক হিসেবে সহায়তা করেছিলেন নূর। ওটাতে আমার অভিনয় ভালো ছিল, হয়তো নূরলদীনের চেয়ে একটু ভালো, কিন্তু নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভালো অভিনয় আমার ‘গ্যালিলিও’তে। গ্যালিলিওর নাম ভূমিকায় আমার যে অভিনয়, ভীষণ তৃপ্তিদায়ক।

আমি খুবই সৌভাগ্যবান অভিনেতা। আমার কোনো দুঃখ নেই, আক্ষেপ নেই। আমি যা ডিজার্ভ করি, যা আমার প্রাপ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাকে দিয়েছে মঞ্চ। আমি বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের কতগুলো শ্রেষ্ঠ ভূমিকায় অভিনয় করেছি। ‘টেমপেস্ট’-এ প্রসপ্যারো করেছি, ‘ম্যাকবেথ’-এ ম্যাকবেথ, ‘নূরলদীনের সারা জীবন’-এ নুরলদীন, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’য় দেওয়ান গাজী।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ওমর শাহেদ

ছবি : কাকলী প্রধান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা