kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

মুক্তিযুদ্ধের গল্পে সহজেই মেলে অনুদান

মুক্তিযুদ্ধের গল্প জমা দিলে নাকি সরকারি অনুদান হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। ফলে অন্য কোনো গল্পের দিকে নজর দিচ্ছেন না নির্মাতারা। এটা কি ভালো না খারাপ? বলেছেন এবার অনুদান পাওয়া নির্মাতা, জুরিবোর্ডের নতুন ও পুরনো সদস্যরা। লিখেছেন সুদীপ কুমার দীপ

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুক্তিযুদ্ধের গল্পে সহজেই মেলে অনুদান

মুক্তিযুদ্ধের গল্প না হয়েও সরকারি অনুদানের অন্যতম সফল ছবি ‘দেবী’। ছবির একটি দৃশ্যে চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান ও অনিমেষ আইচ।

বিগত এক দশকে দেখা গেছে, সরকারি অনুদানের ছবি মানেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প। অনুদানের জন্য ছবি আহ্বান করা হলে নির্মাতারা তাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প বাছাইয়ে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও অনুদানের জন্য জমা পড়া বেশির ভাগ ছবির গল্প ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। তবে সেই বেশির ভাগ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে নামমাত্র। বেশির ভাগ নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে গল্প টেনে নিতে চেয়েছেন অন্যদিকে। বিষয়টি নিয়ে এবার নাকি বেশ নড়েচড়ে বসেছিলেন জুরিবোর্ড সদস্যরা। এটাকে অনুদান ছিনিয়ে নেওয়ার সহজ কৌশল মনে করেছেন তাঁরা। এবারের জুরিবোর্ডের সদস্য ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া পরিচালক জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘পর্দায় সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গেলে বাজেট লাগে অনেক। কামান, গোলাবারুদ বা সেই সময়ের মফস্বল শহর-গ্রাম ফুটিয়ে তুলতে হলে অনেক পরিশ্রম ও টাকা দরকার। ফলে সেদিকে না গিয়ে বেশির ভাগ নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধ না দেখিয়ে ’৭১-এর অন্যান্য বিষয় তুলে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু এটা নীতিমালার বাইরে। আমরা শুরুতে সেই গল্পগুলো বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। বুঝে গিয়েছিলাম তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে ভাঙিয়ে অনুদান নিতে চান। এবারের অনুদানে মুক্তিযুদ্ধ বা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে প্রাধান্য পাননি তা নয়। তবে যে ছবিগুলো অনুদান পেয়েছে তার সবই ভালো কোনো সাহিত্যিকের গল্প। নীতিমালায় স্পষ্ট আছে—বাংলা সাহিত্যকে যেসব গল্প বা উপন্যাস সমৃদ্ধ করেছে সেগুলোকে অনুদানে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরাও তাই করেছি।’

এ বছর মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বাইরে অনুদান দেওয়া হয়েছে ‘কাজল রেখা’, ‘লেখক’, ‘শ্যামাকাব্য’কে। ছবিগুলো দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরবে বলে রাজু জানান। তবে এগুলো সংখ্যায় কম। এ বছর সর্বোচ্চ অনুদান [৭০ লাখ টাকা] পাওয়া ছবি ‘টুঙ্গিপাড়ার দুঃসাহসী খোকা’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে এটি। এই ছবির নির্মাতা-প্রযোজক ও বর্তমান চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘অনেক দিন ধরে ছবিটি নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। দূর গ্রাম থেকে উঠে আসা সাধারণ খোকা কিভাবে অসাধারণ হয়ে উঠেছিল, দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল সেটাই গল্প। এই গল্পের জন্য অন্য কেউ অনুদান পেলেও আমি খুশি হতাম।’

অনুদানের নীতিমালায় মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি আরো যে বিষয়গুলো আছে তার মধ্যে অন্যতম মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন জীবন ও সমাজধর্মী গল্প, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা শিল্পবোধসম্পন্ন গল্প। বেশির ভাগ নির্মাতা এ ধরনের গল্প বাদ দিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের গল্পে ভরসা রাখেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন। তিনি বলেন, ‘নির্মাতাদের মধ্যে এ প্রবণতা কয়েক বছর ধরে বেশি লক্ষ করছি। অনুদান কমিটি বা মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন—মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যে ছবিগুলোকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে সেগুলো কতটুকু মানসম্পন্ন? গত কয়েক বছরে অনুদান পাওয়া কয়টা ছবিই বা আলোর মুখ দেখেছে! আমি ও আমার কয়েকজন সহকর্মী চেয়েছিলাম অনুদান নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে। কিন্তু আমলারা সেটা পরিবর্তন করতে চান না। আরেকটি কথা না বললেই নয়, প্রতি বছর অনুদান কমিটিতে অন্তত চার-পাঁচজন আমলা রাখা হয়। তাঁদের কেউ রেলওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার, নয়তো অন্য পেশার মানুষ। তাঁরা নিজেদের পছন্দমাফিক গল্পে অনুদানের পক্ষে রায় দেন। অথচ চলচ্চিত্রের ন্যূনতম জ্ঞানও অনেকের নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা মনে করেন, বাহ! মুক্তিযুদ্ধের গল্প। এটাই তো অনুদান পাবে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারি অর্থগুলো প্রতি বছর আরো বেশি নষ্ট হবে।’

নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ ছাড়া অনুদান পাওয়া মুক্তিযুদ্ধের আর কোনো চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে সমাদৃত হয়েছে? এ প্রশ্ন অনেক নির্মাতার।

কয়েক বছরে মুক্তিযুদ্ধের বাইরে অনুদান পাওয়া যে ছবিগুলো মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ‘মৃত্তিকা মায়া’, ‘গহীন বালুচর’ ও ‘দেবী’। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ১৭টি শাখায় পুরস্কৃত হয় ‘মৃত্তিকা মায়া’। ক্ষীরমোহন নামের এক বিপত্নীক কুমারকে নিয়ে ছবির গল্প। ছবিটির পরিচালক গাজী রাকায়েত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পে অনুদান দেওয়ার বিপক্ষে আমি নই। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে গল্প, নির্মাতা এবং প্রযোজক—তিনটার সামঞ্জস্য আছে কি না। কয়েক বছর ধরে খেয়াল করছি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প হলেই হলো, ওই নির্মাতা কি গল্পটি নির্মাণ করতে পারবেন বা প্রযোজকের পুরো ছবিটা শেষ করার ক্ষমতা আছে কি না তা দেখা হচ্ছে না। ফলে অনুদানের বেশির ভাগ ছবি শেষ হচ্ছে না। তা ছাড়া বিখ্যাত মানুষদের অনুদান দেওয়ার রীতিটা বাদ দিতে হবে। আমি গাজী রাকায়েত বলে গল্প জমা দিলাম আর অনুদান পেলাম তা কি ঠিক? জাতীয় স্বার্থে যে ছবিগুলো কাজে লাগবে তেমন গল্পই জুরিবোর্ডকে বেছে নিতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা