kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

বিনোদনে করোনার প্রভাব

১৯৮৮ ও ’৯৮ সালের বন্যাসহ প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে প্রভাব পড়েছিল চলচ্চিত্র, টিভি নাটক ও মঞ্চনাটকে। করোনা কতটা প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন তাঁরা? এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল যাঁদের জীবন-জীবিকা, তাঁদের নিয়েই বা কী ভাবছেন নেতারা? জেনেছেন মীর রাকিব হাসান

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিনোদনে করোনার প্রভাব

চলচ্চিত্র

আমাদের কিছু করতে হবে

ফারুক অভিনেতা

বন্যা, তুফান, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, যুদ্ধ—এগুলো চোখে দেখা যায়। এর বিপরীতে গিয়ে যুদ্ধও করা যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নানা প্রতিকূলতা আমরা মোকাবেলা করেছি। বর্তমানে যে সমস্যার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, এটা তো দেখা যায় না। তবে বাঁচার উপায় আছে। সরকার বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিছু নিয়ম বলে দিয়েছে। সেগুলো আমাদের মানতে হবে।

চলচ্চিত্রে এমন অবস্থা আমরা আগেও মোকাবেলা করেছি। আমরা ফুটবল খেলেছি, সেখান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষকে দিয়েছি। আরো কত কী করেছি! কিন্তু এখন তো কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। চলচ্চিত্রে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা দিন আনেন দিন খান। তাঁদের জন্য আমাদের কিছু করতে হবে। শিল্পী সমিতিতে অনেকেই আছেন, যাঁদের সামর্থ্য আছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। শুনেছি অনন্ত জলিল-বর্ষা সাহায্য করেছে। আরো কয়েকজনও সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে এসেছে। এ রকম সবাই মিলে আমরা কিছু একটা করতে পারি। 

 

এমনিতেই শুটিং হয় না...

আলমগীর অভিনেতা

আগে যে মহামারিগুলো হয়েছে সেগুলো আর করোনা এক না। বন্যা হয়েছে, হয়তো এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ ছিল। আমরা শিল্পীরা মিলে ত্রাণ দিয়েছি। কিন্তু এখনকার অবস্থা পুরোটাই ভিন্ন। এখন যত অসচ্ছল শিল্পী আছে, তখন এত অসচ্ছল শিল্পী ছিল বলে মনে হয় না। তখন আমরা সবাই কম-বেশি সাহায্য করেছি জোট বেঁধে।

এখনকার অবস্থা আগের মতো নেই, সেটা অবশ্য তাদের দোষ নয়। আগের মতো কাজ হচ্ছে না। আগে কয়েক শিফটে শুটিং থাকত। সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত ছিল। এখন এমনিতেই শুটিং হয় না, তার মধ্যে এমন পরিস্থিতি! সত্যিই অনেকে খুব বাজে অবস্থায় পড়ে গেল। এই অবস্থায় আমাদের নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে। তার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে ব্যাপার তাতে আমি সব সময়ই আছি। সারা বছরই আমি মানুষকে সাহায্য করি। কিন্তু আমি কী সাহায্য করছি সেটা বলে বেড়াব না, এটা আমি কখনোই করি না। 

 

 

 

টিভি নাটক

পরিস্থিতি যে কোনদিকে যায়...

শহীদুজ্জামান সেলিম অভিনেতা ও অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি

বিশ্বব্যাপী একটা বিপর্যয় চলছে। যুদ্ধের সময়ের চেয়েও মানুষ এখন বেশি আতঙ্কিত। এর বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ঘরে থাকতে বলেছে। তা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। সব সেক্টরের মতো আমাদের নাট্যাঙ্গনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৬ মার্চ, পহেলা বৈশাখ ও রোজার ঈদের কাজের প্রস্তুতি—কোনোটাই আমরা ঠিকমতো করতে পারিনি। পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, কতদূর আমাদের নিয়ে যাবে, না জানলে প্ল্যানিংয়ে যাওয়া যায় না। শুরুতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শুটিং স্থগিত করেছিলাম। পরে সরকারি নির্দেশমতো ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ রেখেছি। সরকার মেয়াদ বাড়ালে আমরাও বাড়াব।

আমাদের সঙ্গে নিম্ন আয়ের অনেকেই কাজ করেন। শিল্পী যেমন আছেন, কলাকুশলীরাও আছেন। প্রডাকশন বয় থেকে শুরু করে যে ছেলেটা মাইক্রোবাস চালায়, সবাই আমাদের পরিবার। আমাদের চারটি সংগঠন আছে, প্রত্যেকে আলাদাভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রকল্প হাতে নিয়েছি। সব সংগঠনের কাছে একটা তালিকা চেয়েছি, আর্থিকভাবে যারা অসচ্ছল তাদের তালিকা। সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদ ভাই কথা বলেছেন মাননীয় মন্ত্রী ও মুখ্য সচিবের সঙ্গে। তাঁরা আমাদের সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছেন।

এই যে যুদ্ধ এটা এক বা দুই দিনে থামার নয়। করোনার রেশ থেকে যাবে পরবর্তী মাসগুলোতেও। সামনের দিনগুলোর জন্য আমরা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছি।

১৯৮৮ সালের বন্যার সময় আমি সবে পড়াশোনা শেষ করেছি। টিএসসিতে যে ক্যাম্প করা হয়েছিল সেখানে রুটি বানাতাম। রুটি সেঁকে বন্যার্তদের মধ্যে দিতাম। ডেমরা নারায়ণগঞ্জের বাঁধ তৈরিতেও অংশ নিয়েছিলাম। জনগণের পাশে থেকেছি সর্বত্র। তবে বন্যার সঙ্গে করোনাকে মেলাব না। করোনায় কারো মৃত্যু হলে দেখতে পর্যন্ত যেতে পারছি না।

১৯৮৮ সালে ছিল শুধু বিটিভি। টেলিভিশন নাটককে তখন কেউ পেশা করেনি। তাই শিল্পীদের খুব একটা সমস্যা হয়নি। এখন তো সিনেমার চেয়েও আমাদের নাটকের বাজার বড়। অনেক বেশি মানুষ কাজ করে, ইনভেস্টও হয়।

 

মঞ্চ

আমরা হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়াচ্ছি

লিয়াকত আলী লাকী

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন

গ্রুপ থিয়েটার হলো প্যাশনের জায়গা, দায়বদ্ধতার জায়গা। এখানে প্রফেশনালি খুব কম মানুষই কাজ করে। যারা মঞ্চে লাইট সরবারহ করে, সেটের মালামাল সংগ্রহ করে, মেকআপম্যান—তারা ছাড়া সবাই তো আসলে অ্যামেচার। সেদিক বিবেচনা করলে মঞ্চে বড় ধরনের সংকট আপাতত নেই। তা ছাড়া ঢাকায় যারা এই কাজগুলো করে, তারাও অতটা সংকটে পড়বে বলে মনে হয় না। অন্য শহরে যারা আছে, তারা সমস্যায় পড়তে পারে। তাদের পাশে দাঁড়াতে আমরা সংস্কৃতিকর্মী, নাট্যকর্মী ও শিল্পকলা একাডেমি সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। নাটকের মানুষগুলো যার যার অবস্থান থেকে সচেতনতা তৈরি করছি, হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়াচ্ছি। করোনা বিশ্বব্যাপীই একটি বড় বিপর্যয়। এবার বিশ্বনাট্য দিবসেও সবার আহ্বান ছিল, সবাই যেন নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং বিশ্বকে সুরক্ষিত রাখে।  আমরা শিল্পকলা একাডেমির কর্মচারী-কর্মকর্তাদের এক দিনের বেতন দিয়ে প্রতিদিন ৫০টি পরিবারকে সাহায্য করছি। এর মধ্যে হয়তো রিকশাওয়ালা আছে, উদ্বাস্তুও আছে। দেশের ৬৪ জেলাতেই এটা হচ্ছে।

 

আমরাই বা কত দিন টানতে পারব

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ

মধুমিতা হলের মালিক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতা

আমাদের তো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। গেল পাঁচ-সাত বছর নিয়মিত ভর্তুকি দিয়ে সিনেমা হল চালাচ্ছি। গত মঙ্গলবার সাত লাখ টাকা বেতন দিলাম কর্মীদের। কিন্তু এভাবে কত দিন হল বন্ধ থাকবে, আর আমরাই বা কত দিন টানতে পারব। সরকারের অবশ্যই আমাদের সাহায্য করা উচিত। নিরাপত্তা রক্ষী বা ইলেকট্রিশিয়ান ছাড়া সব কর্মীকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি। তাদের এটাও বলতে পারিনি কবে আবার আসতে হবে।

প্রশাসন চিঠি দিয়েছে হল বন্ধ করার জন্য, আমরাও বাধ্য হয়েছি। লকডাউন খুললে ঢাকার হল মালিকদের নিয়ে বসতে চাই। তাঁদের সঙ্গে বসে দেখি এই মানুষগুলোর জন্য অন্তত কোনো ব্যবস্থা করতে পারি কি না। শুধু করোনার জন্য নয়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এমনিতেই দেখা করা জরুরি হয়ে গেছে। সিনেমা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি। সামনেই রমজান। আমার মনে হয় এর মধ্যে আরো অনেক হল বন্ধ হয়ে যাবে। আর সিনেমা হল বন্ধ হলে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাবে। সমাজে এর কতটা প্রভাব পড়বে তা অনেকেই বুঝছে না। ক্রাইম বেড়ে যাবে। করোনা হয়তো থেমে যাবে। আমরা যদি বেঁচে যাই তাহলে সরকারের উচিত এখনই বসে ঠিক করা, আমরা কোন পথে যাব। হল খুললেই নতুন ছবি লাগবে। কয়টি ছবি নির্মাণ হচ্ছে দেশে? এমনিতেও তো বন্ধ করে রাখতে হবে। তার ওপর ভারতীয় ছবি চালাতে পারছি না। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সম্মান দিয়েই বলছি, ছবি নির্মাণের জন্য কী করছেন তাঁরা? প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন দিয়ে সিনেমা বানাচ্ছে না কেন। আমরা আসলে ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়েই যাাচ্ছিলাম, করোনা এসে অবস্থা আরো খারাপ করে দিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা