kalerkantho

শনিবার । ২১ চৈত্র ১৪২৬। ৪ এপ্রিল ২০২০। ৯ শাবান ১৪৪১

চলচ্চিত্রে একুশের গল্প

ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাংলাদেশের মৌলিক একটি অর্জন। এমন গৌরবের ইতিহাস দেশীয় চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে হাতে গোনা দু-একবার। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ছবি কম কেন? কালিক চলচ্চিত্র [পিরিয়ড ফিল্ম] নির্মাণে অন্তরায় কী? বলেছেন সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ভাষা দিবসের ছবি ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নির্মাতা তৌকীর আহমেদ

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চলচ্চিত্রে একুশের গল্প

কালিক চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর দৃশ্য

চলচ্চিত্র তৈরি করাই একটা ঝামেলার কাজ। সেটা যদি কালিক চলচ্চিত্র হয় তাহলে তো কথাই নেই। অস্কারজয়ী পরিচালক আলেহান্দ্রো ইনারিতু বলেছেন, ‘চলচ্চিত্র বানানো খুবই সহজ। ভালো চলচ্চিত্র বানানো কঠিন। খুব ভালো চলচ্চিত্র বানানো যুদ্ধের মতো। আর যে চলচ্চিত্র কালোত্তীর্ণ হয়, সেটা অলৌকিক ঘটনা।’

‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর নির্মাণ আমার কাছে যুদ্ধের মতোই ছিল। আমার মনে হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র হওয়া উচিত। সেটা আমার জন্য একটা সময় বেশ কঠিন মানসিক বাধা হয়েই দাঁড়ায়। সব বাধা অতিক্রম করেই ছবিটি বানিয়েছি। একটা জাতির যেসব গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় থাকে তার মধ্যে বাঙালির মুক্তি এবং ভাষা আন্দোলন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে চিন্তা করিনি, আমার আগে এ বিষয়ে কয়টা চলচ্চিত্র হয়েছে পরে কয়টা হবে। আমি মনে করি ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধিকার আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছি। একটা জাতি যদি তার ইতিহাসের দিকে ফিরে না তাকায় সেটা দুঃখজনক। নতুন প্রজন্মের জন্য সে ইতিহাস তুলে না ধরাটা তো আমাদের শিল্পীদেরও একটা ব্যর্থতা। আমার মনে হয় আমি এটা নিয়ে যতটুকু পারি করেছি।

‘ফাগুন হাওয়ায়’ যথেষ্ট সহজ করে বানিয়েছি, যাতে সাধারণ দর্শক বুঝতে পারে, তরুণরাও যেন বিনোদিত হতে পারে। একটু হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতেই আমি ছবিটা করেছি। 

কালিক চলচ্চিত্র বানাতে গেলে খরচ বেশি হয়, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুটিংয়ের স্থান, পোশাক জোগাড় করতে আলাদা যত্নের দরকার হয়। আর সেই গল্পকে সাম্প্রতিক সময়ের সঙ্গে মেলানোর দক্ষতাও থাকতে হয়। সেটা যদি কালের সঙ্গে উত্তীর্ণ করা যায় তাহলেই কালিক চলচ্চিত্র সফল হয়।

সার্বিকভাবেই আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য একটা বৈরী সময় চলছে। এখানে না আছে প্রেক্ষাগৃহ, না আছে প্রযোজক, না আছে শিল্প। ২০০৮ সালে পরিকল্পনা করেছিলাম ছবিটির। তখন প্রযোজক পাইনি। অনেকে হয়তো ভেবেছে, ছবিটা চলবে না। প্রচলিত অর্থে নাচে-গানে ভরপুর নয়। তাই কেউ-ই টাকা লগ্নি করতে চায়নি। ছবিটা বানাতে গিয়ে প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো, প্রযোজক খুঁজে পাচ্ছিলাম না। খুঁজতে খুঁজতেই প্রায় ১০ বছর কেটে গেল। অর্থ পেলে তো হবে না, পর্যাপ্ত অর্থ লাগবে এই ছবির জন্য। সরকারি অনুদানের জন্য জমা দিলাম, তাও পেলাম না। আমি বাইরে থেকেও অভিনয়শিল্পী আনলাম। তাদের জন্যও একটা আয়োজন দরকার ছিল। যশপাল শর্মা যে এসেছেন, তিনি কিন্তু একদমই দরকারি ছিলেন চরিত্রটার জন্য। পুলিশের থ্রি নট থ্রি রাইফেল জোগাড় থেকে শুরু করে বায়ান্ন সালের মডেলের গাড়ি জোগাড়—সব কিছুই কষ্টসাধ্য। তার ওপর ঢাকা শহরে যদি কেউ কোনো কালিক চলচ্চিত্র করতে চায়, সেটি দুরূহ হয়ে যাবে নির্মাতার জন্য। খুব ব্যয়বহুল। সে কারণেই আমার গল্পের প্রেক্ষাপট মফস্বল।

গল্পটিও সেভাবেই বেছেছি। রূপকভাবে মূল আন্দোলনকেই যেন বোঝায়। ছবিতে পুলিশের গাড়ি দেখাতে হবে, সেটি অবশ্যই বায়ান্ন সালের হতে হবে। মোটরসাইকেল, টাইপরাইটার, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর সব কিছুতেই কালের স্বাক্ষর থাকতে হবে।

একটি রেডিও জোগাড় করতে দেখা গেল। এতে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এর বাইরেও আরো কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। যেমন—বর্তমানে চটুল বিশ্বে সস্তা জিনিসই বেশি জনপ্রিয় হয়। দর্শক কী পছন্দ করবে তেমন বিষয়বস্তু নিয়েই অনেক নির্মাতা কাজ করেন। সেটাও আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।

ছবি মুক্তির পর ব্যবসা করেছে কি না সেটা কখনো বড় বিষয় ছিল না। নিজে টাকা খরচ করে যখন সিনেমা বানিয়েছি, তখনো এটা আমার মূল লক্ষ্য ছিল না। আসলে টাকার জন্যই আমি সিনেমা নির্মাণ করি না। তবে এই সিনেমা মুক্তির পর প্রযোজক অখুশি নন। একটা ভালো কালিক চলচ্চিত্রের আবেদন কমে না কখনো। চলচ্চিত্রটি যেমন প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে যেকোনো টিভি চ্যানেলে দেখানো যেতেই পারে। 

অনুলিখন : মীর রাকিব হাসান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা