kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

তারকা কলাম

সাংস্কৃতিক অঙ্গনটাকে মেধাশূন্য হতে দেবেন না

কেবল নিজের গুণগান নয়, শিল্পীরা বলতে চান শোবিজের ভালো-মন্দ নিয়েও। নতুন বিভাগ ‘তারকা কলাম’-এ অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন বলেছেন টিআরপি-ইউটিউব-ভিউ দিয়ে শিল্পীর মূল্যায়নের বিপক্ষে

৩০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাংস্কৃতিক অঙ্গনটাকে মেধাশূন্য হতে দেবেন না

বাংলাদেশে এখন টিভি অনুষ্ঠানের মান নির্ধারণের কোন মানদণ্ড নেই। আলোচনাটা একটু পেছন থেকে শুরু করা যাক। আগে মানদণ্ড নির্ধারণ করত পত্রিকাগুলো। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক লেখা ছাপত। সেগুলো পড়ে অভিনয়শিল্পী, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও কলাকুশলীরা নিজেদের কাজের মূল্যায়ন করতে পারতেন। তার ভিত্তিতে নিজেদের আরো শাণিত করতে পারতেন। এখন এ ধরণের বিশ্লেষণাত্মক লেখা ছাপা হয় না।

এরপরে এলো ‘টিআরপি’। সম্ভবত ভারতীয় একটি কম্পানি এদেশে টিআরপি বক্স বসিয়েছে, তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বলা হয় ‘এই নাটকটি টিআরপিতে আছে’, ‘ওই নাটকটি টিআরপিতে নাই’। প্রতি মাসে একটা করে টিআরপি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। অথচ তার কোন ব্যাখ্যা নেই। বাক্সটা কোথায় আছে, কে রেটিং করেছে, কাকে রেটিং করেছে, কীভাবে রেটিং করছে—কোন বিশ্লেষণ কোথাও পাওয়া যায় না। পরিচালক, অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে যারা এই অঙ্গনে কাজ করছেন, তাদের আশি শতাংশই এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না! অথচ এখন টিভি অনুষ্ঠানের মূল্যায়ন পুরোপুরি টিআরপি নির্ভর। টিআরপি রিপোর্ট সন্তোষজনক হলে চ্যানেল নাটক চালাবে, বিজ্ঞাপনী সংস্থাও বিজ্ঞাপন দেবে। অথচ পরিচালক বা অভিনয়শিল্পীরা যেটিকে ভালো নাটক বলছেন, সেটি হয়তো টিআরপিতেই নেই। তাই সেটার মূল্যায়নও হচ্ছে না। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য টিআরপির প্রক্রিয়াটা আরো স্পষ্ট করা দরকার।

এরপর এলো ইউটিউব। এখন অনেকেই ব্যবসায়িকভাবে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাধারণত একটি নাটক টিভিতে প্রচারের পরে ইউটিউবে প্রকাশ করা হয়। সেখানে যতবার নাটকটা দেখা হয় সেটাকে বলা হচ্ছে ‘ভিউ’। সেই ভিউ কোথা থেকে হচ্ছে, কত ঘণ্টা হচ্ছে, তারপর ক্লিক-লাইক-সাবস্ক্রাইবার ইত্যাদি নানা জটিল সমীকরণ রয়েছে ইউটিউবে। সেসবের ভিত্তিতেই হয় ব্যবসা। তার জন্য অবলম্বন করতে হয় প্রচারণার নানা কৌশল—নাটক বুস্ট করা যায়, ইউটিউবকে টাকা দিয়ে সার্চ রেজাল্টের সামনের দিকে নিয়ে আসা যায়। এভাবে অনেকেই নাটকের ক্লিক-লাইক-ভিউ বাড়িয়ে দাবি করছে, যেহেতু এটিতে এত মিলিয়ন ক্লিক পড়েছে, তার মানে এটি ভালো নাটক। আর সেই সাফল্যের কৃতিত্ব পেয়ে যাচ্ছে নাটকটির পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীরা। এখানেই সমস্যা। কারণ পরিচালক বা অভিনয়শিল্পীর কিন্তু প্রযুক্তির এই মারপ্যাঁচ জানার কথা নয়। যারা জানে, তারা নিজেদের নাটক-গানের ক্লিক-ভিউ বাড়িয়ে নিচ্ছে। হয়তো সে নাটকটিই যখন টিভিতে চলেছে দর্শক দেখেইনি। তার মানে সমস্যা আছে দুটো মানদণ্ডেই। অথচ তা দিয়েই বিচার করা হচ্ছে কে ভালো পরিচালক বা অভিনয়শিল্পী। তাদের নিয়েই বানানো হচ্ছে নাটক। যোগ্যদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে না। ইউটিউবের এই ‘ভিউ’য়ের প্রভাব পড়ছে টিভিতেও। কারণ টিভির জন্য বানানো নাটকই চালানো হচ্ছে ইউটিউবে।

তারপর আছে ফেসবুক। সেখানে কার কত ফলোয়ার, সেটাও এখন মানদণ্ড হয়ে দাঁড়াচ্ছে! যার যত ফলোয়ার সে নাকি তত বড় তারকা! এর ভিত্তিতে তাঁকে নেয়া হচ্ছে নাটকে। এমন অনেক মানুষের লাখ লাখ ফলোয়ার, যারা সাংস্কৃতিক জগতের কেউ নন। লাইক-ভিউ আর ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে কি বিচার করা সম্ভব, কে ভালো পরিচালক বা অভিনয়শিল্পী? এটাই এখন ঘটছে। ফলে দর্শকদের হূদয়ে স্থান করে নেয়া শিল্পীরা আর ডাক পাচ্ছেন না। দর্শককে জিজ্ঞেস করলে তারা যে শিল্পীর নাম বলবেন, তাদের বেশিরভাগই এখন পর্দায় অনিয়মিত।

আবার ভিউ-ফলোয়ারের কারণে আপনি যখন হঠাত্ কাউকে তারকা বানালেন, সে কিন্তু পরিশ্রম ছাড়াই তারকা হয়ে গেল। একজন পরিচালক বা অভিনয়শিল্পীকে যে বছরের পর বছর পরিশ্রম করতে হয়, সেটা সে জানলোই না। কাজেই সে সিনিয়রদের সম্মান করবে না সেটাই স্বাভাবিক।

ভিউ-ফলোয়ারের দৌরাত্ম্যে আমরা অবক্ষয়ের শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি। ইন্ড্রাস্ট্রিতে প্রতিনিয়ত মেধার ক্ষয় হচ্ছে। যোগ্য ও মেধাবীরা লজ্জায়-ক্ষোভে আত্মসম্মানবোধের তাড়নায় কিংবা কর্মহীন হয়ে পড়ায় দূরে সরে যাচ্ছেন। বিষয়টা নিয়ে আমাদের ভাবা জরুরি। আমার মনে হয়, টিভি ও ইউটিউব নাটক নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। দুটোর জন্যই আলাদা মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার, যার ভিত্তিতে নাটকের মান যাচাই করা যাবে। পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীর মেধার পরীক্ষা হবে সেখানেই। সেটা এখনই করতে না পারলে আমরা ধীরে ধীরে মেধাশূন্য হয়ে পড়ব।

আমার একটাই অনুরোধ, সাংস্কৃতিক অঙ্গনটাকে মেধাশূন্য হতে দেবেন না প্লিজ। টিভি চ্যানেল, ইউটিউব চ্যানেল, বিজ্ঞাপনী সংস্থা—নাটক দিয়ে সবাই ব্যবসা করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে ব্যবসা করতে গিয়ে আমাদের নাটক যেন ধ্বংস হয়ে না যায়, মেধাশূন্য হয়ে না যায়।

 

অনুলিখন : নাবীল অনুসূর্য

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা