kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

স্মরণ
মাহফুজুর রহমান খান [১৯৫০—২০১৯]

আমাকে ডাকতেন ‘মাগো’

মেহের আফরোজ শাওন অভিনেত্রী-নির্মাতা

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আমাকে ডাকতেন ‘মাগো’

‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭’-এ মাহফুজুর রহমান খানের পাশে শাওন ও রিয়াজ

মাহফুজুর রহমান আংকলের সঙ্গে আমার পরিচয় ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’-এর প্রি-প্রডাকশনের সময়। ‘শ্যামল ছায়া’ ছাড়া আমার চলচ্চিত্রজীবনের সব ছবির চিত্রগ্রাহক তিনি। সিনেমায় অভিনয় করে যতটকু পরিচিতি পেয়েছি, সেটা যতখানি হুমায়ূন আহমেদের জন্য, ততখানিই মাহফুজুর রহমান খানের জন্য। একজন অভিনেত্রীকে দর্শকের সামনে প্রেজেন্ট করার পুরো দায়িত্ব চিত্রগ্রাহকের। চিত্রগ্রাহকের সঙ্গে প্রচণ্ড একটা ভালো সম্পর্ক থাকলে শিল্পীরা অনেকটা সাবলীলভাবে অভিনয় ফুটিয়ে তুলতে পারেন স্ক্রিনে, আমার যেটা মাহফুজুর রহমান খানের সঙ্গে ছিল। কোন অ্যাংগেলে তাকালে আমার বেস্ট প্রফাইল পাওয়া যাবে, সেটা তিনিই ভালো বুঝতেন। এখনো যে আমি ছবি তুলি, এমনকি সেলফি তোলার ক্ষেত্রেও কোনোভাবে তাকাতে হবে—এগুলো মাহফুজ আংকলের কাছেই শিখেছি।

সিনেমার নিয়ম অনুযায়ী শুরুর দিকে আমাকে ‘ম্যাডাম’ ডাকতেন। আমার খুব হাসি পেত। তখন আমার মাত্র ১৭ বছর বয়স। উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আংকল আমাকে কেন ‘ম্যাডাম’ ডাকছেন? বললেন, ‘মাগো, এটা তো এফডিসির নিয়ম।’ এই যে উনি ‘মাগো’ ডাকা শুরু করলেন, আমার শেষ ছবি ‘আমার আছে জল’ পর্যন্ত আমাকে ‘মাগো’ই ডেকেছেন। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর উনি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র জন্য যখন জাতীয় পুরস্কার পেলেন, অ্যাওয়ার্ডটা হাতে নিয়ে প্রথম আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হুমায়ূন আহমেদ নেই; কিন্তু তাঁর শিল্পীদের অনেকেই হয়তো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে বা বিভিন্ন বিষয়ে সফল হয়েছে, কখনো দেখিনি কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকে হুমায়ূন আহমেদকে ধন্যবাদ দেওয়া বা তাঁর পরিবারকে এসে বলা, স্যারের জন্য এই প্রাপ্তিটা হয়েছে। মাহফুজ আংকল একটা কাগজে লিখে নিয়ে এসেছেন ‘থ্যাংক ইউ স্যার’। আমার হাতে কাগজটি দিয়ে বলছেন, ‘স্যার তো নেই, তাই কাগজটা আমি তোমাকে দিলাম। আমি জানি, কাগজটা তোমার হাতে দিলে স্যার পেয়ে যাবেন।’

নতুন কোন সিনেমা নিয়ে যখন আইডিয়া হতো, হুমায়ূন আহমেদ বলতেন মাহফুজ সাহেব চলে আসুন, আমরা একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়ব। মাহফুজ আংকল বলতেন, ‘স্যার, আমরা যখন ছবি করি অন্যরা দশটা গল্প শোনায়, সেখান থেকে একটা গল্প বেছে নিই। আর আপনি যখন ডাকেন তখন আমি অঞ্জলি পেতে বসে থাকি, আপনি যা দেবেন তাই আমি করব।’ এই যে একটা বিনয়, মানুষকে সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়, তা উনার কাছে নতুনভাবে শিখেছি।

মাহফুজ আংকল ১০ বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, এর মধ্যে চারবারই পেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের ছবিতে। আর কারো দুটি ছবিও নেই। ‘শ্যামল ছায়া’ ও ‘নয় নাম্বার বিপদ সংকেত’ ছাড়া বাকি সব ছবিই তাঁর করা। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কতটা অ্যাটাচমেন্ট ছিল তাঁর! কথা বলতে বলতে খেয়াল পড়ল, মাহফুজ আংকলের মা খুব ভালো রান্না করতেন। উনি প্রায়ই পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বন্ধুদের দাওয়াত দিতেন। আমরা একসঙ্গে দখিন হাওয়ায় বসে খেতাম। সিনেমার বাইরেও তাঁর সঙ্গে আমাদের একটা বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা