kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

মুক্তিযুদ্ধের ছবি কি কমছে?

এই দশকের শুরুতে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ। দশকের শেষে এসে আবারও তা কমে গেছে। এ নিয়ে কয়েকজন গুণী নির্মাতার সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুক্তিযুদ্ধের ছবি কি কমছে?

ফাখরুল আরেফিনের ‘ভুবন মাঝি’র দৃশ্যে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা ঘোষ

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ছবির ওপর সরকারি খবরদারি চলেছিল দীর্ঘদিন। সেটা অবশ্য কয়েক দশক আগের গল্প। সামরিক শাসন শেষ হওয়ার পর থেকে অবরোধ মুক্ত হতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ছবি। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে সংখ্যাও। সবচেয়ে বেড়েছিল এই দশকেই। ২০১১ ও ২০১৭ সালে চারটি এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধের ছয়টি করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে।

২০১১ সালে মুক্তি পায় ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ [মোরশেদুল ইসলাম], ‘গেরিলা’ [নাসির উদ্দীন ইউসুফ], ‘মেহেরজান’ [রুবাইয়াত হোসেন] ও ‘কারিগর’ [আনোয়ার শাহাদাত্]। ২০১৪ সালে ‘মেঘমল্লার’ [জাহিদুর রহিম অঞ্জন], ‘জীবনঢুলী’ [তানভীর মোকাম্মেল], ‘অনুক্রোশ’ [গোলাম মোস্তফা শিমুল], ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ [মাসুদ পথিক], ‘হূদয়ে ৭১’ [সাদেক সিদ্দিকী] ও ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ [মান্নান হীরা]। ২০১৫ সালে ‘এইতো প্রেম’ [সোহেল আরমান], ‘৭১-এর মা জননী’ [শাহ আলম কিরণ], ‘অনিল বাগচীর একদিন’ [মোরশেদুল ইসলাম], ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ [রিয়াজুল রিজু], ‘হরিযুপিয়া’ [গোলাম মোস্তফা শিমুল] ও ‘শোভনের স্বাধীনতা’ [মানিক মানবিক]। আর ২০১৭ সালে ‘ভুবন মাঝি’ [ফাখরুল আরেফিন], ‘রীনা ব্রাউন’ [শামীম আখতার], ‘লাল সবুজের সুর’ [মুশফিকুর রহমান গুলজার] ও ‘৫২ থেকে ৭১’ [দেলোয়ার জাহান ঝন্টু]।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যাটা আবার পড়তির দিকে। গত তিন বছরের মধ্যে দুই বছরে মুক্তি পেয়েছে মাত্র একটি করে! ২০১৬ সালে ‘একাত্তরের নিশান’ [তাহের শিপন] এবং ২০১৮ সালে ‘পোস্টমাস্টার ৭১’ [আবির খান, রাশেদ শামীম স্যাম]। এ বছর এখন পর্যন্ত মুক্তি পায়নি একটিও। অবশ্য একদম শেষ সপ্তাহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে মাসুদ পথিকের ‘মায়া দ্য লস্ট মাদার’। তাতে বড়জোর মুখরক্ষা হবে, এর বেশি কিছু না।

তানভীর মোকাম্মেলের ‘রাবেয়া’র দৃশ্য

কিন্তু এই অনুকূল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে হঠাত্ই কেন কমে গেল মুক্তিযুদ্ধের ছবির সংখ্যা? তানভীর মোকাম্মেল আঙুল তুললেন এফডিসি-কেন্দ্রিক নির্মাতাদের প্রতি। ‘নদীর নাম মধুমতি’র পরিচালক বলেন, “যারা বিকল্প ধারার নির্মাতা তাঁরা তবু চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছবি বেশি নির্মিত হয় মূলধারায়ই। সেখানে সরকারি সুযোগ-সুবিধা যায়, ভর্তুকি যায়। তুলনায় সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ছবি হয় না বললেই চলে। এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের যত ছবি হয়েছে, বেশির ভাগের নির্মাতাদেরই ‘এফডিসির বাইরের মানুষ’ মনে করা হয়।” ওপরের ছবিগুলোও তাঁর বক্তব্যের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়।

‘খাঁচা’র পরিচালক আকরাম খান অবশ্য তাতে একটু দ্বিমত পোষণ করলেন। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের ছবি কখনোই আর্থিক সাফল্য লাভের উদ্দেশ্য সামনে রেখে করা উচিত নয়। আকরাম বলেন, ‘কোনো ছবির সাফল্য বিচার করা হয় আর্থিক সাফল্য বা শিল্পমান অর্জনের মাপকাঠিতে। কোনোটাই যদি না হয়, তার মানে ছবিটা চলচ্চিত্রাঙ্গনে কোনো ছাপই ফেলতে পারল না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ছবি অবশ্যই শিল্পসফল হতে হবে। তাতে বাংলাদেশের ও মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপনটা বাস্তবসম্মত হতে হবে। নইলে সেটা বরং মুক্তিযুদ্ধের ছবির ধারার ক্ষতিই করে। দর্শকও মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে।’ এটাকে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের ছবি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন ‘মেঘমল্লার’ পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জনও, ‘প্রতি বছর মুক্তিযুদ্ধের নামে যে ছবিগুলো মুক্তি পাচ্ছে, বেশির ভাগই অত্যন্ত নিম্নমানের। একঘেয়ে-ক্লিশে কাহিনি, সঙ্গে মঞ্চের মতো অতিনাটকীয় অভিনয়! শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই নয়, এমনটা একদম শুরু থেকেই হয়ে আসছে। তাই সংখ্যায় নয়, নজর দেওয়া উচিত মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলোর শিল্পমানে।’

নিম্নমানের নির্মাণের জন্য আকরাম কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন নির্মাতাদেরই, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম যাঁরা ছবি বানিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য নির্মাণটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখনকার বাস্তবতায় সেটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন মুক্তিযুদ্ধের ছবি হতে হবে নান্দনিক, শিল্পমানসম্মত। সে জন্য নির্মাতাকে আন্তরিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে হবে। বর্তমানের উপযোগী করে আধুনিক ও শাশ্বত রূপে উপস্থাপন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিমানুষকে ইতিহাসের মুখোমুখি করতে হবে। যেমনটা দেখা যায় হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহিরদের লেখায়।’

আকরামের মতে, নান্দনিক মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের জন্য প্রয়োজন সত্যিকার মেধাসম্পন্ন পরিচালক। ‘চলচ্চিত্রের পাশাপাশি যাঁর ইতিহাস ও সাহিত্যেও দখল আছে এমন পরিচালকের সংখ্যা এখন খুবই কম। গভীর ভাবের ছবি বানানোর প্রবণতাটাও কমে গেছে। সরকারিভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হলেও তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ফলে সরকার মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইলেও তা ঠিকঠাক কাজে লাগানো যাচ্ছে না,’ বলেন আকরাম।

মোরশেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এর দৃশ্য

সরকারি আনুকূল্যের কথা বললেন তানভীরও, ‘সরকারি অনুদানের নীতিমালাতেই আছে, মুক্তিযুদ্ধের ছবি অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিবছরই দু-একটি ছবি পাচ্ছে।’ সেটা মেনে নিলেন অঞ্জনও। তবে তাঁর আপত্তি অনুদানের পরিমাণ নিয়ে, ‘বাস্তবতার নিরিখে সেটা খুবই কম। তাই অনুদান পাওয়ার পরও বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থার কাছে যেতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের ছবি বানাতে গিয়ে যদি বাজেট নিয়েই বেশি চিন্তা করতে হয়, তখন সেটাকেও প্রথাগত ছবির ফর্মুলায় ফেলে একটা গঁত্বাঁধা গল্প বেছে নিতে হয়।’ তাঁর মতে, এ থেকে বেরিয়ে আসতে ভালো গল্প ও পরিচালক নির্বাচন করে মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য অনুদানের অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে।

তানভীর অবশ্য এ নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হতে রাজি নন। তাঁর মতে, এটা একটা সাময়িক অবস্থা। বলেন, ‘শিল্পকর্ম তো আসলে বছর ধরে মাপা যায় না। কোনো বছরে কম হবে, কোনো বছরে বেশি। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মানুষের আগ্রহ আগের মতোই আছে।’ পাশাপাশি মনে করিয়ে দিলেন, সামনের বছরেই রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যাপন করা হবে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী। পরের বছরই মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি। ‘এই দুই উপলক্ষ সামনে রেখে আগামী বছরগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ছবি মুক্তি পাবে। সামনে আবারও মুক্তিযুদ্ধের ছবির নতুন ঢেউ আসবে,’ আশাবাদী কণ্ঠে বললেন তানভীর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা