kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

তারার বন্ধু তারা

তিন দশকের বন্ধু

নব্বইয়ের জনপ্রিয় জুটি। ব্যক্তিজীবনে তাঁরা একে অন্যের ভালো বন্ধু। জাহিদ হাসান-শমী কায়সারের বন্ধুত্বের গল্প লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিন দশকের বন্ধু

শমী কায়সার-জাহিদ হাসান—আরটিভির ঈদের অনুষ্ঠানে দুই বন্ধু

তাঁদের বন্ধুত্বের বয়স ৩০ বছর। গত তিন দশকে কখনোই তাঁদের বন্ধুত্বে মরিচা পড়েনি। শমী কায়সার বলেন, ‘মনে হয় এক তুড়িতেই এতগুলো বছর চলে গেল। বয়স তো হলো, জাহিদ রিডিং গ্লাস নিয়েছে, আমিও নিয়েছি।’

দুজনের প্রথম পরিচয়ের প্রসঙ্গে জাহিদ বলেন, ‘শমী তো আমার আগে খ্যাতি পেয়েছে। বেইলি রোডে একটা সময় অনেক আড্ডা হতো। শমী আসে আর আমার মতো অনেক যুবক তাকিয়ে থাকে। বলে, শমী আসছে শমী, আমিও তাদের একজন। ওর ভারী একটা ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, যাঁদের অনেক সম্মান। একসঙ্গে টিভি নাটক করার আগে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ করেছি, সেখানেও শমীও থাকত। আমাদের পরিচয়ের আগে টিভিতে ওকে অনেক দেখেছি। বিশেষ করে সে ব্যায়ামের একটা অনুষ্ঠান করত।’

জাহিদের শেষের কথাটা নিয়ে শমীর প্রবল আপত্তি, ‘ব্যায়ামের অনুষ্ঠানটির কথা ওর বলতেই হবে! সেটা আবার অ্যাক্টিং করে করে বলবে।’

নাট্যকেন্দ্রের ‘বিচ্ছু’ নাটকে জাহিদকে প্রথম দেখেন শমী। তারিক আনাম খান, তৌকীর আহমেদও অভিনয় করতেন নাটকটিতে। ‘নাটক দেখতে যাওয়ার আগেই শুনেছি ইয়ং একটা ছেলে চমৎকার অভিনয় করছে। এই ছেলে মিডিয়া মাতাবে। সেদিন নাটকটা দেখে সত্যিই জাহিদের ফ্যান হয়ে গেলাম’, বললেন শমী।

১৯৯৭ সালের একটি গল্প বললেন জাহিদ, ‘একসঙ্গে লন্ডনে গেলাম আমরা। সকালে ঘুম থেকে আমি একটু দেরি করে উঠি। ও এসে ডাকত—ওঠ না, ওঠ না। ও জগিং করত, আমি করতাম না। কিন্তু আমাকে ওর সঙ্গে দৌড়াতে হতো।’

সেই ট্যুরের কিছু গল্প বললেন শমীও, ‘সকালে নাশতার পর ওকে আর পেতাম না। কোথায় যায় সে? পরে আবিষ্কার করলাম সে মৌকে কল দিতে যায়। টেলিফোন বুথে কয়েন দিয়ে সে কথা বলত।’

কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই জাহিদ বলেন, ‘বলে রাখা ভালো, ওর হাত কিন্তু অনেক শক্ত। আমাকে অনেক মেরেছে। ব্যথাও পেয়েছি।’ জাহিদের এই কথার প্রতিবাদ শোনা গেল না শমীর কণ্ঠে।

মানুষ হিসেবে কে কেমন? উত্তর দিলেন জাহিদই, ‘শমীকে আমি মানুষ হিসেবে দেখি, মেয়েমানুষ না। জীবনে তো অনেক আপস অ্যান্ড ডাউন থাকে। ওরও তেমনি ভালো-খারাপ সময় গেছে। জীবনের রেসে সব সময় সাকসেস হওয়া যায় না। আমি সব সময়ই শমীর পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।’

শমী বলেন, ‘আমার মধ্যে একটা বিষয় কাজ করে—একসঙ্গে গ্রো করা, সবাইকে নিয়ে বড় হওয়া। সবাইকে নিয়ে ভালো কিছু করার মানসিকতাটা জাহিদেরও আছে। জাহিদের এ বিষয়টা সবচেয়ে ভালো লাগে আমার।’

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটা গল্প বললেন জাহিদ, “আজিজুল হাকিম ভাই তখন সুপারস্টার। মাওয়ায় আমরা শহীদুল হক খানের একটা নাটক করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু শুটিং হলো ‘তিথি’র। শমী এবং হাকিম ভাই নায়ক-নায়িকা। ঈশিতাও আছে। এখানে আমার কোনো ক্যারেক্টার নেই। মন খারাপ করে পারলে কেঁদেই ফেলি। শহীদুল হক খানকে বলেই ফেললাম, শমী-হাকিম ভাই করছে আর আমার কোনো ক্যারেক্টার নেই। আমার অবস্থা দেখে পাঁচ-ছয় সিকোয়েন্সের একটা ক্যারেক্টার বানানো হলো, ভিলেন টাইপের। হাকিম ভাইয়ের বড় ভাইয়ের চরিত্র। হাকিম ভাইয়ের বউ শমী, শমীর ছোট বোন ঈশিতা। আমি সারা দিন চিন্তা-ভাবনা করে ক্যারেক্টারটা আরো বিল্ডআপ করলাম, ভাবলাম ট্যারা হই আর হাতটা বাঁকা করে ফেলি। অতটুকু চরিত্র করেই সেবার সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছিলাম।”

জাহিদ-মৌয়ের ঝগড়া হলে মিটমাট করার দায়িত্ব পড়ত শমীর কাঁধে। ‘এমনও হয়েছে, মৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া। কথা বলছে না ওর সঙ্গে। আমাকে হাতে-পায়ে ধরে বলত—দোস্ত, তুই একটু কথা বলে ওকে বুঝা। নইলে আমি কিন্তু শুটিং করতে পারব না। এ রকম অনেক সময় গেছে, পুরো ইউনিট বসে আছে জাহিদের জন্য। আমি বুঝিয়ে মৌকে কথা বলাতে রাজি করালাম। আধা ঘণ্টা স্যার [জাহিদ] কথা বলল। মন ভালো করে স্যার লাফাতে লাফাতে শুটিংয়ে চলে এলো। মৌয়ের মুখে শমী আপা ডাকটাও আমার জীবনে বড় একটা পাওয়া। ছোট বোন যেমন আপা বলে একটা রাগ দেখায়। মৌ আমাকে তেমন চোখেই দেখে’, বললেন শমী।

জাহিদ হাসান বললেন আরো একটি মজার ঘটনা, ‘হানিফ সংকেতদার একটা নাটকে আমি, হাকিম ভাই, সেলিম ভাই তিনজনই আছি। শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌসি মজুমদারও আছেন। একটা দৃশ্যে দেখানো হবে, শমীর বিয়ের পাত্র আমরা তিনজন। তিনজনের সঙ্গেই বিয়ের দৃশ্য আছে। পরিচালক শেরওয়ানির ব্যবস্থা করবেন, পায়জামা-পাঞ্জাবি নিয়ে আসতে হবে আমাদের। শুটিং চলছে, হঠাৎ দেখি আমার পায়জামা নেই। যদি এটা বলি তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! হাকিম ভাইয়ের শট শেষ, সেলিম ভাইয়ের শট শেষ। এখন আমার পালা। হঠাৎ সামনে পড়ল সাদা রঙের একটা পায়জামা। পায়জামাটা পরতে গিয়ে দেখি অনেক ছোট। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, একটা হাফপ্যান্ট পরে ওর সঙ্গে সেফটি পিন দিয়ে পায়জামাটা পরলাম। শমী পাশে এসে বলে, জানিস আমারও না এ রকম একটা পায়জামা আছে। আমি তো চুপ। নুরজাহান নামে শমীর এক মেয়ে সহকারী ছিল, ও বলল আপা, আপা, আপনার পায়জামা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শমী তো বুঝে গেল, রেগেমেগে অস্থির।’

ওই ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনো হাসেন শমী।  জাহিদকে নিয়ে বলেন, ‘ও আমার কাছে একেবারে খোলা বই। হাসতে হাসতে সব বলে দেয়।’

জাহিদ বলেন, ‘কোনো কিছু হওয়াটা বড় কথা না। কোনো কিছু হয়ে থাকাটা বড় ব্যাপার। বন্ধুত্বটা নার্সিং করার জন্য দুটো মানুষেরই অবদান লাগে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা