kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘গান লিখতে গেলে তাঁর মুখটি চোখে ভাসে’

২৪ নভেম্বর সংগীতশিল্পী বারী সিদ্দিকীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। শিল্পীকে স্মরণ করেছেন তাঁরই গাওয়া প্রায় ৪০টি গানের গীতিকার দেলোয়ার আরজুদা শরফ

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে




‘গান লিখতে গেলে তাঁর মুখটি চোখে ভাসে’

বারী সিদ্দিকীর সঙ্গে দেলোয়ার আরজুদা শরফ

বারী ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে। তিনি তখন বাঁশি বাজাতেন। সুরকার মান্নান মোহাম্মদের সঙ্গে তাঁর খুব সখ্য ছিল। আমার লেখা, মান্নান মোহাম্মদ ভাইয়ের সুর করা গান বাজাতে এলে বারী ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। ধীরে ধীরে সম্পর্কটা গাঢ় হতে লাগল। পরে দেখি তিনি সুর করছেন, কণ্ঠও দিচ্ছেন। একদিন আমার কাছ থেকে কিছু গান নেন সুর করার জন্য। গানগুলোতে কণ্ঠ দেন বাদশা বুলবুল, ডলি সায়ন্তনীসহ কয়েকজন। এরই মাঝে হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিতে গান করে তিনি বেশ পরিচিতি পান। প্রথম একক অ্যালবাম ‘দুঃখ রইলো মনে’ প্রকাশ করেন শহীদুল্লাহ ফরায়জীর কথায়। সেটিও মানুষ গ্রহণ করে। ২০০৬ সালে বিভিন্ন গীতিকারের কথায় প্রকাশ করেন একক অ্যালবাম ‘ভালোবাসার বসতবাড়ি’। সে অ্যালবামে আমার লেখা দুটি গান করেন। একটি অ্যালবামের টাইটেল, অন্যটি হলো ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’। প্রকাশের পর পরই ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’ বেশ সাড়া ফেলে। এরপর বারী ভাইয়ের সঙ্গে কাজ আরো বাড়তে থাকে। প্রতি অ্যালবামেই আমার কাছ থেকে এক বা একাধিক গান নিতেন। আমিও কিছু প্রজেক্ট করি। সব মিলিয়ে আমার কথায় প্রায় ৪০টি গান গেয়েছেন তিনি। আমার কথায়, তাঁর সুরে অন্যরা গেয়েছেন প্রায় ১০টি। আমার লেখা প্রায় তিন হাজার গানে বাঁশি বাজিয়েছেন তিনি। 

২০০৯ সালে সংগীতা থেকে ১০টি গান দিয়ে ‘চন্দ্রদেবী’ নামে একটি অ্যালবাম করি। সেখানে পাঁচটি করে গান করেছিলেন বারী ভাই এবং ফজলুর রহমান বাবু। বারী ভাইয়ের সর্বশেষ একক অ্যালবামটিও আমার করা। ‘নিষিদ্ধ মানুষ’ শিরোনামের অ্যালবামটি মাই সাউন্ড থেকে প্রকাশ পায় তিনি মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে। এর পরপরই আমরা আরেকটি অ্যালবামের কাজ ধরি। দুঃখের বিষয় হলো, অ্যালবামটি শেষ করার আগেই তিনি মারা যান!  হারমোনিয়াম ধরে তিনি অ্যালবামের গানগুলোর সুর করেছিলেন। পরে তাঁর মেয়ে এলমা সিদ্দিকীকে দিয়ে ‘আত্মাদেবী’ শিরোনামের অ্যালবামের গানগুলো গাওয়াই। প্রকাশ করে বাংলা ঢোল। অ্যালবামের ‘দয়াল আমার পীপিলিকার ঘর/এক ফোঁটা জল দেখে ডরে কাঁপে এ অন্তর’ গানটির সুর করতে গিয়ে তিনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি রেকর্ডিং না হতেই গানটি চ্যানেল আইয়ের একটি লাইভে গেয়ে শোনান। আরেকটি গানের সুর নিয়ে বসতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আধ্যাত্মিক অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ হয়। অনেক ভেবেচিন্তে পরে সুরটি করেন। গানটি হলো—‘মানুষ ছাড়া কে পারে তার বর্ণনা দিতে/মানুষের ভিতরে প্রভু, বাহিরেও থাকেন কভু, এই মানুষই পারেন তাঁরে অন্তরে নিতে’। আমার অনুরোধে বারী ভাই ৪৩৩তম কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে প্রথম দিন কিছু সময়ের জন্য অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার মাত্র ১০ দিন পরই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। ‘মানুষ’ গানটি তিনি গেয়ে রেকর্ড করে যেতে পারেননি। এটা আমার জন্য অনেক বড় আফসোসের! তাঁর সঙ্গে এত এত স্মৃতি, মনে পড়লে খুব কষ্ট লাগে। সবচেয়ে বেশি কানে বাজে ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’ গানটি। প্রায়ই বলতেন, ‘দেলোয়ার, তুমি জীবনে অনেক গান লিখেছ, লিখবে; কিন্তু এই গানটিই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে হাজার বছর।’ আমি বেঁচে আছি, গানটিও। কিন্তু তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

আমার সংগীত ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করেছেন বারী ভাই। মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। প্রায়ই নতুন গান লিখতে গেলে তাঁর মুখটি চোখে ভাসে।

     অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা