kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

প্রযোজনার ঘণ্টা বাঁধছেন না শিল্পীরা

ঢাকাই ছবিতে অভিনয় করে যাঁরা তারকা হয়েছেন, প্রায় প্রত্যেকেই একটা সময় প্রযোজনায় এসেছেন। নব্বইয়ের দশকেও বছরে যত ছবি মুক্তি পেত, তার এক-তৃতীয়াংশই এই শিল্পীদের প্রযোজিত। এই সময়ে এসে তারকাদের কেউই নিয়মিত প্রযোজনা করছেন না। অভিযোগ—এ কারণেই এখন বছরে ছবি ১০০ থেকে ৩০-এ নেমে এসেছে। সিনেমার খরা কাটাতে নানা প্রসঙ্গ তুললেও প্রযোজনার ঘণ্টা বাঁধছেন না শিল্পীরা। বিস্তারিত লিখেছেন সৈকত সালাহউদ্দিন

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রযোজনার ঘণ্টা বাঁধছেন না শিল্পীরা

শাবানার এসএস প্রডাকশনস প্রযোজিত ‘ভাত দে’র দৃশ্য

সিনেমার সোনালি ও ভালো সময়ে জনপ্রিয় শিল্পীরা প্রযোজনায় সরব ছিলেন। সে সময় সারা বছর যে পরিমাণ সিনেমা মুক্তি পেত তার একটি বড় অংশ প্রযোজনায় থাকতেন শিল্পীরাই। সে সংখ্যা কত? জনপ্রিয় নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র গবেষক-শিক্ষক মতিন রহমানের মতে, ৪০-৪৫ শতাংশ সিনেমা প্রযোজনায় থাকতেন ডাকসাইটে তারকারা। মতিন রহমান হয়তো সর্বোচ্চটাই বলেছেন। বছরে গড়পড়তা ১৫-৩০ শতাংশ সিনেমার লগ্নি থাকত তারকাদের হাতেই। একসময় বড় সিনেমা মুক্তির প্রতিযোগিতায় টক্করে মেতে উঠত রাজ্জাকের ‘রাজলক্ষ্মী প্রডাকশনস’, শাবানার ‘এসএস প্রডাকশনস’, ববিতার ‘ববিতা মুভিজ’, ফারুকের ‘এফপি ফিল্মস’, সোহেল রানার ‘পারভেজ ফিল্মস’, জসীমের ‘জ্যাম্বস’, উজ্জলের ‘উজ্জল ফিল্মস লিমিটেড’, আলমগীরের ‘আঁখি ফিল্মস’, বুলবুল আহমেদের ‘ত্রয়ী চিত্রম’, ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘জয় চলচ্চিত্র’সহ আরো অনেক প্রযোজনা সংস্থা।

তারকারা কেন প্রযোজনায় জড়িয়ে পড়তেন? শুধুই কি লাভের জন্য? উজ্জল, সিনেমায় অ্যাকশনে নতুন মাত্রা যোগ করে যিনি ‘মেগাস্টার’ উপাধি পেয়েছিলেন তিনি বললেন, নানা কারণেই শিল্পীরা প্রযোজনায় যুক্ত থাকতেন। “একবার আমি দুর্ঘটনায় পড়ে যাই। এর আগ পর্যন্ত রোমান্টিক ছবিতে ভালোই করছিলাম। দুর্ঘটনার পর আমার কাছে সেকেন্ড রোলের অফার আসতে শুরু করল। এ সময় আমি ‘কুদরত’ ছবির কাজ করছিলাম, পরিচালক মমতাজ আলীর কাজ আমার মনে ধরল। তাঁকে আমার জন্য একটা সিনেমা বানাতে বললাম। তিনি প্রথমেই বললেন, ‘আপনার লুক তো অ্যাকশন। রোমান্টিক কেন করেন?’ ট্রেড যা ভাবত একদম উল্টো ভাবনা থেকে তিনি আমাকে নিয়ে নির্মাণ করলেন ‘নালিশ’। এরপর তো ‘নসীব’ সুপারডুপার হিট হয়ে গেল। এরপর নিয়মিত প্রযোজনা করতাম নিজের ইমেজ ধরে রাখার জন্য। অন্য প্রযোজকরা তো আমাকে সেই সুযোগ দিতেন না।”

সোনালি দিনের নায়ক-নায়িকা নিয়ে ছবি করেছেন মতিন রহমান। এসএস প্রডাকশনসের প্রথম সিনেমা ‘মাটির ঘর’-এর কাহিনি লিখেছেন এ টি এম শামসুজ্জামান ও মতিন রহমান। পরিচালনা করেছেন আজিজুর রহমান। ছবিতে ধর্ষিতা নারীর চরিত্র করেছেন শাবানা। এর আগে শাবানার ইমেজ ছিল লক্ষ্মী মেয়ে, বউয়ের। ইন্ডাস্ট্রিতে এটা চাউর হতেই শাবানার ওপর চাপ তৈরি হলো যেন ধর্ষিতা নারীর চরিত্রে অভিনয় না করেন। কিন্তু শাবানা ছিলেন অবিচল। গল্পের নায়কও মারা যায়। ছবি মুক্তির পর দেখা যায়, সুপারডুপার হিট! শাবানা তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে আমজাদ হোসেনকে দিয়ে নির্মাণ করেন ‘ভাত দে’। অর্থাৎ অর্থের চেয়ে শাবানার কাছে মুখ্য ছিল সম্মান ও স্বীকৃতি। শাবানা প্রযোজিত ‘রাঙাভাবী’ পরিচালনা করেন মতিন রহমান। তিনি বলেন, ‘পরিচালকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন শাবানা। বাজেটে কার্পণ্য করতেন না।’ উজ্জল প্রযোজিত ‘বীরাঙ্গনা সখিনা’ও পরিচালনা করেন। রোজিনার ‘রোজিনা ফিল্মস’ প্রযোজিত ‘জীবনধারা’ও পরিচালনা করেন মতিন রহমান। রোজিনা তাঁর কাছে চেয়েছিলেন ভালো চরিত্র। আর এ ছবিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রোজিনা।

শিল্পীরা প্রযোজক হওয়ায় কয়েকটি ভালো বিষয় যোগ হতো। ছবির সংখ্যা বাড়ত ট্রেডে। তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সিনেমাগুলো বড় বাজেটের বড় তারকার হতো। দর্শকও এই সিনেমাগুলোর জন্য বাড়তি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করত। নব্বইয়ের দশকেও শিল্পীরা প্রযোজনায় সরব ছিলেন। মান্নার ‘কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র’ থেকে বেশ কিছু সিনেমা নির্মিত হয়। রুবেল, মৌসুমীও প্রযোজনায় আসেন। হঠাৎ নতুন ধাক্কা লাগে সিনেমায়। শাবানা স্বেচ্ছায় সরে যান। জসীমের মৃত্যুতে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে ‘জ্যাম্বস’। অশালীন ছবি নির্মাণ শুরু হলে সাময়িক বিরতিতে চলে যান অনেক ডাকসাইটে শিল্পী। ডিপজলের ‘অমিবনি কথাচিত্র’ থেকে অনেক সিনেমা নির্মিত হলো। মিশা সওদাগর, অমিত হাসান, রিয়াজ, ফেরদৌসও প্রযোজনায় নাম লেখান।

প্রযোজনায় এসেছেন শাকিব খানও। তাঁর ‘এসকে ফিল্মস’ থেকে নির্মিত ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’, ‘পাসওয়ার্ড’ বড় সাফল্য পায়। নির্মিত হচ্ছে ‘বীর’। প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘দেবী’তেই বড় সাফল্য পেয়েছেন জয়া আহসান। তাঁর ‘সি-তে সিনেমা’ ঘোষণা দেয় নতুন ছবি ‘ফুড়ুৎ’-এর। জায়েদ খান, ববিও প্রযোজনা করেছেন। ঠিক এই সময়ে যে বিতর্ক দানা বেঁধে উঠছে তা হলো জনপ্রিয় শিল্পীরা এখন আর নিয়মিত সিনেমা প্রযোজনায় আগ্রহী নন। দুর্মুখেরা বলেন, সিনেমার ভালো সময়ে যখন ব্যবসা রমরমা ছিল তাঁরা প্রযোজনা করে লাভ করেছেন। এখন সিনেমায় লগ্নির অক্সিজেন দরকার, তাঁরা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন।

উজ্জল অবশ্য এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, ‘সিনেমা প্রযোজনার জন্য শুধু অর্থের নিরাপত্তাই মুখ্য নয়। ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণের জন্য আমাদের প্রজন্ম প্রস্তুত নয় বলেই আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। সিনেমার বাজার সংকুচিত হয়ে গেছে, এ কথা সবাই জানে। পরিচালকের অভাব, অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভাব, নতুন টেকনোলজি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা কুশলীর অভাব—এমন নানা কারণ রয়েছে। আমার মতো সবাই হয়তো ভাবছেন, অনেক পরিশ্রম করে যে ইমেজ হয়েছে তা যেন নষ্ট না হয়ে যায়।’

এই মুহূর্তে প্রযোজকরা সিনেমায় লগ্নি করতে ভয় পাচ্ছেন। এ জন্য তাঁরা দায়ী করেন বাজার সংকোচন ও পর্যাপ্ত জনপ্রিয় শিল্পীর অভাবকে। এই সময়ে জনপ্রিয় শিল্পীরা সোনালি দিনের মতো প্রযোজনায় এগিয়ে এলে সিনেমার খরা কেটে যেতে পারে। জনপ্রিয় শিল্পীরা মনে করেন, পর্দায় তাঁদের ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে এখনো দর্শকের ঢল নামবে। এ কথা সত্য, তবে সিনেমার এই দুঃসময়ে শিল্পীদের প্রযোজনায় সরব হওয়া উচিত। তাঁরাই যদি নিজেদের নিয়ে ঝুঁকি নিতে ভয় পান, তাহলে সাধারণ প্রযোজকরা সে ঝুঁকি কিভাবে নেবেন?

অভিনেতা ফারুক বললেন, ‘আমাদের লাভের নিশ্চয়তা দিতে হবে, গ্যারান্টির কথা বলতে আমরা এটা বোঝাই না। বাস্তবতা হলো, সিনেমা নির্মাণের পর তা প্রদর্শনেরই তো ব্যবস্থা নেই। সারা দেশে মাত্র ১৫-২০টি ভালো প্রেক্ষাগৃহ। এ অবস্থায় কি করে সিনেমা ব্যবসায় লগ্নি করা সম্ভব?’ তিনি মনে করেন, প্রেক্ষাগৃহ ও মাল্টিপ্লেক্সের মালিকরা আন্তরিক হলেই সিনেমার সমস্যা অনেকাংশে কেটে যেতে পারে। তখন সিনেমায় প্রযোজকদের ব্যস্ততা বাড়বে।

এই সময়ের বড় তারকা শাকিব খান বলেন, ‘আসলে সোনালি দিনে কী হতো এই মুহূর্তে তা ভাববার অবস্থা নেই। এখন ইন্ডাস্ট্রি সিনেমার খরায় ভুগছে। কখন সিনেমার সব সমস্যার সমাধান হবে সে অপেক্ষায় থাকলে ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাবে। হলিউড, বলিউডের মতো করে চিন্তা করলেও বসে থাকতে হবে। আমাদের বাজেটে আমাদের সিনেমা নির্মাণ করে এগিয়ে যেতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা