kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘আসিস না আর কোনো দিন’

১৮ অক্টোবর প্রয়াত সংগীতশিল্পী, ‘এলআরবি’র প্রতিষ্ঠাতা আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এমন দিনে তাঁকে স্মরণ করেছেন তাঁরই বন্ধু সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আসিস না আর কোনো দিন’

১৯৭৭ সালের কথা। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। চট্টগ্রামের জুবিলি রোডে বাচ্চু আর আমি পাশাপাশি বাসায় থাকতাম। তখন বন্ধুরা মিলে ‘রিদম ৭৭’ নামে একটি ব্যান্ড করি। বয়সে একটু বড় হলেও মিউজিকের কারণে বাচ্চুর সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতা হয়ে যায়। সে তখন আমাদের ব্যান্ডেও বাজাতে লাগল। এরপর আমি কলেজে উঠে ‘ফিলিংস’ গড়ার সময় তাকে নিয়ে আসি। তখন আমরা ইংরেজি ইনস্ট্রুমেন্টালই বেশি করতাম। ‘ফিলিংস’ প্রথম শো করে আগ্রাবাদ হোটেলে। সেখানে বিদেশি অতিথিরাই বেশি থাকত। দীর্ঘদিন আমরা এই হোটেলে বাজিয়েছি। সেই সময় থেকেই বাচ্চু ওয়েস্টার্ন ঘরানার গিটার বাজানো শুরু করে। রাত করে ঘরে ফিরতাম। মা রান্না করে আমাদের খাওয়াতেন। মা বলতেন, আমার দুই ছেলে।

তখন আমাদের বাসার পাশে ছিল আমাদের আরেক বন্ধু ‘রিদম ৭৭’ ব্যান্ডের সদস্য উত্তমের মিষ্টির দোকান। প্রতিদিন আমরা সেখানে আড্ডা দিতাম। ব্যাপারটা ছিল এমন, যেখানেই যাই না কেন উত্তমের দোকানে যাবই। শিঙাড়া খাব, মিষ্টি খাব, তারপর দল বেঁধে প্র্যাকটিসে যাব। এই আড্ডা ছিল আমাদের জন্য একটা উৎসব। যেখানে প্র্যাকটিস করতাম আশপাশের অনেকে ঢিল মারত, অনেকে বিকৃত স্বরে চিল্লাচিল্লি করত। আমরা প্রায় চুরি করে প্র্যাকটিস করতাম। বিছানার জাজিম দিয়ে সাউন্ড আটকে কাজ করতাম।

১৯৭৮ সালের একটি ঘটনা খুব মনে পড়ছে। আমরা ব্যান্ডের বন্ধুরা মিলে তখন ঢাকায় আসতাম, গান করতাম। একবার বাচ্চু আর আমি আরো তিন বন্ধুসহ ঢাকায় এসে একটি হোটেলে উঠি। তখন হাতে টাকা-পয়সা থাকত খুবই অল্প। সবার নাশতার জন্য মাত্র এক প্লেট ভাজি আনা হয়। ভাজিটা মাটিতে পড়ে যায়। মাটি থেকে তুলেই সবাই খেয়েছি। বন্ধুত্বটা এত গাঢ় ছিল যে তখন এসব কোনো ব্যাপারই মনে হতো না।

আমি ঢাকায় চলে এলে বাচ্চু ‘সোলস’-এ গিটারবাদক হিসেবে যোগ দেয়। সে-ও ঢাকায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে একবারে ঢাকায় চলে আসে। আমরা তখন একসঙ্গে থাকতাম। এমনকি এক খাটেও ঘুমিয়েছি। এক বাসায়ই তিন-চার বছর কেটে যায়। বাচ্চু তখন প্রতিদিন প্রতি মুহৃর্তে গিটার প্র্যাকটিস করত। বাচ্চুর জীবনের অনেক অধ্যায়ের মধ্যে অন্যতম হলো গিটার। গিটারে যেভাবে সে দক্ষতা অর্জন করে তার সাক্ষী আমি। এমনও হয়েছে, দুজনের একসঙ্গে কোথাও দাওয়াত। আমি বলছি, ‘কী রে, যাবি না?’ সে বলত, ‘আমি গিটার বাজাচ্ছি।’ আমি দাওয়াতে গেলেও সে গিটার নিয়ে পড়ে থাকত। আবার এমনও হয়েছে, দুজন দুজনের রুমে প্র্যাকটিসে এতটাই ডুবে আছি যে কারো সঙ্গে কারো কোনো কথা নেই, কিন্তু ঠিকই সন্ধ্যায় বের হতাম। আড্ডা দিতাম, ছবি দেখতাম, রিকশায় করে ঘুরে বেড়াতাম।

নতুন ব্যান্ড করার পর একদিন বলল, ‘আমি আলাদা বাসা নেব।’ আমি বললাম, ‘তুই দূরে চলে যাবি! এটা কোনো কথা হলো। আমার এখানে থাকলে অসুবিধা কী?’ ও বলল, ‘ব্যান্ড করেছি। এখন লোকজন আসা-যাওয়া করবে। নিজস্ব একটা প্রাইভেসি দরকার।’ বললাম, ‘তাহলে আমার পাশের বাসাটা নে।’ আমার পাশের বাসাটাই সে ভাড়া নিল। তার জানালা ঠিক আমার জানালার পাশে। হাত দিয়ে হাত ধরা যেত। প্রতিদিন একজন আরেকজনকে ডেকে জানালায় দাঁড়িয়ে কথা বলতাম। এরপর বাচ্চুর প্রেম, বিয়ে। বিয়ের বাজার-সদাই থেকে শুরু করে গার্ডিয়ান হওয়া পর্যন্ত পুরো কাজ বলতে গেলে আমিই করেছি।

চট্টগ্রামের হাটে, মাঠে, ঘাটে, বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই যে আমরা বাজাইনি। চট্টগ্রামের অলিগলিতে আমাদের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। মাঝে ব্যস্ততার কারণে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ কমে যায়। প্রায়ই বাসায় দাওয়াত দিতাম। সে আসতে পারত না। তার সঙ্গে কথা বলে ফোন রাখার সময় প্রায়ই অভিমান করে বলতাম, ‘আসিস না আর কোনো দিন।’

৪০ বছরের সম্পর্কে আমাদের অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে শেষবার দেখা হয়। তখন বলল, ‘দোস্ত, শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাদের একজন আরেকজনকেই কাঁধে নিতে হবে।’

 

অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা