kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

কেমন আছেন বাবর

২০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কেমন আছেন বাবর

অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন রুপালি পর্দায় অনুপস্থিত দাপুটে এই খলনায়ক। সম্প্রতি গ্যাংগ্রিনের কারণে তাঁর বাম পা কেটে ফেলতে হয়েছে। খলিলুর রহমান বাবরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেছেন তাঁর স্ত্রী লতিফা বাবর। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

প্রথম ছবিতে হয়েছিলেন নায়ক, আমজাদ হোসেনের ছবি ‘বাংলার মুখ’-এ। সুবিধা করতে পারেননি। জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে হলেন খলনায়ক। ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় এই ছবি দিয়েই। সত্তরের দাপুটে খলনায়ক তিনিই। তিন শর বেশি ছবিতে মন্দ মানুষ সেজেছেন। ‘দয়াবান’, ‘দাগী’, ‘দাদাভাই’সহ বেশ কয়েকটি ছবি পরিচালনা করেছেন। আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রযোজক হিসেবেও। সর্বশেষ তাঁকে পর্দায় দেখা গিয়েছিল ২০০০ সালে, মনোয়ার হোসেন ডিপজলের ‘তের গুন্ডা এক পান্ডা’ ছবিতে। এরপর থেকেই তিনি বড় পর্দায় অনুপস্থিত।

দীর্ঘদিনের এই অনুপস্থিতির কারণ অসুস্থতা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে তাঁর শরীর একেবারেই ভেঙে পড়েছে। তাঁর সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করছেন স্ত্রী লতিফা বাবর। বলতে গেলে একাই যুদ্ধ করে যাচ্ছেন অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে।

লতিফা বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই বাবরের শরীরের অবস্থা ভালো না। নানা রোগে ভুগছেন উনি। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ—এসব তো আছেই; গত কয়েক বছরে শারীরিকভাবেও ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বছর দুই আগে তো ফুসফুসের সমস্যায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল।’

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বাবর। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর ফুসফুসে ক্ষত পাওয়া গিয়েছিল। পরে অস্ত্রোপচার করতে হয়।

বাবার এমন অসুস্থতার দিনগুলোতে বড় ভরসার জায়গা হয়ে আসে সন্তানরা। অথচ সেখানেও ভাগ্য খুব একটা সুপ্রসন্ন নয় এই দম্পতির। লতিফা বলেন, ‘আমাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই ও এখন স্বামীর সংসারে থাকে। ছেলেও বিয়ে করে আলাদা থাকে।’ একাই অসুস্থ স্বামীর সেবা-শুশ্রূষা করে যাচ্ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে গত মাসের শেষে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবর। ৩০ এপ্রিল স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন লতিফা। বলেন, ‘কমফোর্ট হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আনোয়ারুল আজীম জানালেন, উনার গ্যাংগ্রিন হয়েছে। বাঁ পায়ের তিনটি আঙুলে ছড়িয়ে গেছে। কেটে বাদ দিতে হবে।’

খারাপ লাগলেও ডাক্তারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হলো। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় টাকা। লতিফা বলেন, ‘হাসপাতালে থাকা, অস্ত্রোপচার—সব মিলিয়ে খরচ তো কম না। আমাদের জন্য খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। বাবর তো দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। আয়-রোজগারের তেমন উৎসও নেই। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছিল। টাকার অভাবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েও রাতে উনাকে বাসায় নিয়ে যেতাম। পরদিন বিকেলে আবার নিয়ে যেতাম।’

৩ মে বাবরের বাঁ পায়ের তিনটি আঙুল কেটে ফেলা হয়। লতিফা বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের পর উনাকে নিয়ে বাসায় চলে আসি। ডাক্তার বলেছিলেন দুই-তিন দিন হাসপাতালে থাকতে। কিন্তু খরচের কথা ভেবে আমরা বাসায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিই। ভেবেছিলাম বাসায় উনি বিশ্রামে থাকবেন। আমি তো দেখাশোনা করছিই। আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা যা যা করার, বাসা থেকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে করাব।’

কিন্তু বাসায় ফেরার দুই-এক দিনের মধ্যেই বোঝা গেল, ডাক্তারদের ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে গ্যাংগ্রিন। গোড়ালি ছাড়িয়ে হাঁটুও আক্রান্ত হতে লাগল। আবারও স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলেন লতিফা, ‘অবস্থা দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিল। এবার ডা. খালেকুজ্জামান দেখলেন। জানালেন, বাঁ পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ কেটে ফেলতে হবে।’

৯ জুন রাতে দ্বিতীয়বারের মতো অস্ত্রোপচার করে বাবরের বাঁ পা কেটে বাদ দেওয়া হলো। আর কখনো নিজের পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না একসময়ের দাপুটে এই অভিনেতা।

অসুস্থতার জন্য অভিনয় ছেড়েছেন দুই দশক আগে। এবার এক পা হারালেন। তবু চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা হারাননি বাবর। তার প্রমাণ মিলল লতিফার কথাতেই, ‘পুরো জীবনটাই চলচ্চিত্রের জন্য ব্যয় করেছেন। পরের দিকে অসুস্থতার জন্য এফডিসিতে যেতে পারতেন না। কিন্তু ঘরে বসেই সব খবর রাখতেন। নিজে একটা ছবি পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের কদিন আগেও অসুস্থ শরীর নিয়ে চিত্রনাট্য লিখেছেন। তিনি জানেন আর কাজ করতে পারবেন না, ছবিটা তাঁর করা হবে না, তবু লিখে চলেছেন।’

চলচ্চিত্রের জন্য স্বামীর এমন ভালোবাসার জন্যই বোধহয় বাবরের একসময়ের সহকর্মীদের প্রতি তাঁর তীব্র অভিমান জমা হয়েছে, ‘চলচ্চিত্রের অনেকেই বাসায় আসতেন-যেতেন। এখন আর তেমন কাউকে দেখি না। কেউ খোঁজখবরও রাখে না খুব একটা।’

অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে একাই লড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এবার বোধহয় ক্লান্তি ভর করেছে লতিফার মনে, ‘প্রথম দিকে নিজেদের টাকায় চিকিৎসা করালেও পরে ধারদেনা করতে হয়েছে। এভাবে কত দিন চালাতে পারব জানি না। হয়তো চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ছাড়তে হবে। মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন বাবর। এখন যদি সরকারের সাহায্য পাওয়া যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি বাবরের প্রতি সদয় হন, তাহলে নিশ্চিন্তে ওর বাকি চিকিৎসাটুকু করানো যেত।’

মন্তব্য