kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

কেমন হলো ঈদের ছবি

ঈদে সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে তিনটি ছবি—‘পাসওয়ার্ড’, ‘নোলক’ ও ‘আবার বসন্ত’। এর মধ্যে দুটি ছবি দেখে সমালোচনা করেছেন জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কাহিনিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক ছটকু আহমেদ

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কেমন হলো ঈদের ছবি

‘পাসওয়ার্ড’-এ শাকিব ও বুবলী

দুর্দান্ত নির্মাণের ছবি

পাসওয়ার্ড

পরিচালক : মালেক আফসারী

কাহিনি ও সংলাপ : আব্দুল্লাহ জহির বাবু

অভিনয়ে : শাকিব খান, শবনম বুবলী, মামনুন ইমন, মিশা সওদাগর প্রমুখ।

প্রযোজনা : এসকে ফিল্মস

ধন্যবাদ ছবির প্রযোজক ও পরিচালককে। তাঁরা প্রমাণ করেছেন টাকা খরচ করে বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের ছবি নির্মাণ সম্ভব, বাংলাদেশের পরিচালকও এই মানের ছবি বানাতে পারেন। ধন্যবাদ ছবির সব শিল্পীকে। সুযোগ পেলে অভিনয়ে পূর্ণ দক্ষতা দেখাতে সক্ষম, সেটা তাঁরা প্রমাণ করেছেন। ধন্যবাদ কলাকুশলীদের। তাঁরা প্রমাণ করেছেন আবহ সংগীত, সেট, মারপিট পরিচালনা, চিত্রগ্রহণ, শব্দগ্রহণ, মেকআপ—কোনো দিক দিয়েই তাঁরা এখন আর পিছিয়ে নেই।

শুধু কোরিওগ্রাফি ও গানে পরিপূর্ণ ধন্যবাদ দিতে পারলাম না। এসব নাচ-গান তামিল, মুম্বাই এমনকি ইদানীংকালের জিত ও দেবের কলকাতার ছবিতে হরহামেশাই দেখছি। এখানে নতুনত্ব কিছু নেই তবে জৌলুস আছে।

ভালো লাগেনি ছবির গল্প। পেনড্রাইভ হাতে না পেয়েই পাসওয়ার্ড  (যেহেতু গল্পের নাম) খোঁজা নিয়ে এ ধরনের একটি মারকুটে খুনখারাবি গল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে আনবে না। বাংলাদেশের শহরকেন্দ্রিক কিছু তরুণের কাছে নতুন মনে হতে পারে, কিন্তু গ্রামবাংলার ৯০ শতাংশ দর্শককে এই গল্প টানতে পারবে না। তবু গল্প এগিয়েছে চিত্রনাট্যের গুণে, পরিচালকের দক্ষতায় আর মারপিট পরিচালকের কারিশমায়। সুপারস্টার শাকিব খান তো আছেনই। চুম্বকের টানে যেমন লোহা আসে (ছবির সংলাপ), তেমনি শাকিবের টানে হলে দর্শক ছুটে এসেছে।

শাকিব একাই এক শ। দর্শকপ্রিয় নায়কদের মধ্যে তাঁর অভিনয়ের কাছাকাছি কেউ নেই। এই শাকিবই একসময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ১০-২০ লাখ টাকা নিয়ে প্রযোজকরা তাঁর কাছে ধর্না দিতেন। বছরে ১৫-১৬টা ছবি করতেন। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক উপচে পড়ত। কিছু দুষ্ট লোক তাঁকে আন্তর্জাতিক তকমা গায়ে এঁটে দিতে কলকাতা নিয়ে গেল। কলকাতাও জয় করে ফেললেন। আর এতে এত বেসামাল হয়ে গেল তাঁর চামচারা, শাকিবকে পুরোপুরি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। দেশের ইন্ডাস্ট্রি রসাতলে যেতে শুরু করল। যারা এটা শাকিবকে বোঝাতে গেল তারা সবাই তাঁর শত্রু হয়ে গেল। অথচ শাকিবের শত্রু কেউ নয়, তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাঁচতে চেয়েছিল। বাধা হয়ে দাঁড়াল শাকিবের চামচারা। কবি মধুসূদন দত্তর মতো শাকিবও আবার নাড়ীর টানে ফিরে এলেন, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির আর সেই শানশওকত নেই। অগত্যা শাকিব নিজেই প্রডিউসার। তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন বন্ধু ইকবাল।

মালেক আফসারীর চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছবিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন মিশা সওদাগর, বুবলী, ইমন, অমিত হাসান, সাদিয়া ও নাদের খান। ইমনের অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, পরিচালক চাইলে তাঁর কাছ থেকে ভালো অভিনয় আদায় করে নিতে পারেন।

মালেক আফসারী কিছুদিন আগে সাহস করে বলেছেন, ‘মৌলিক ছবিই সিনেমারে ডুবাইছে। ৪০-৫০ লাখ টাকায় কী ছবি হবে? সিনেমা একটা ইন্ডাস্ট্রি। একে বাঁচাতে হলে আপনারা হলিউড ফলো করেন, কোরিয়াকে ফলো করেন, সাউথ ইন্ডিয়াকে ফলো করেন। সবাই তো করছে, আপনারাও করেন।’

‘পাসওয়ার্ড’ তিনি নকল করেননি, ফলো করেছেন। কারণ তাঁর স্কুলিং সাউথে আর সাউথের স্কুলিংয়ের ছাত্র নির্ভেজাল বাংলাদেশি পটভূমির ছবি বানাতে পারবে না বলেই স্বীকার করেছে, ফলো করায় কোনো দোষ নেই।

এই ছবিতে লাভ কত হবে, ছবির খরচ উঠবে কি না তা মুখ্য নয়, আসল কথা হলো, হলে দর্শক এসেছে। প্রদর্শকদের মুখে হাসি ফুটেছে। এটা কি কম লাভের?

তবে মালেক ভাই, আপনারা যতই সাউথে স্কুলিং করেন আর বিদেশি ছবি ফলো করে সাউথ স্টাইলে ছবি বানান এই দেশে কিন্তু মৌলিক ছবিও হবে। ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘ময়না মতি’, ‘অবুঝ মন’, ‘মনপুরা’, ‘পোড়া মন’ দর্শকপ্রিয়তায় ধন্য হয়েছিল। আজও যদি সুনিপুণভাবে মৌলিক গল্পের ছবি হয়, বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পাবে।

‘পাসওয়ার্ড’-এর নির্মাণ দুর্দান্ত। শুধু গল্পটা যদি বাংলাদেশি হতো তবে সব শ্রেণির দর্শকের মন ভরে যেত। মারামারিগুলোর একটা অন্তত বাংলা প্যাটার্নের হলে কোনো ক্ষতি হতো না, গানের চিত্রায়ণ দেশের মধ্যে হলে, অভিনয় ও চরিত্রায়ণে দক্ষিণ ভারতের মতো না হলে আমরা প্রচণ্ড খুশি হতাম। সাধুবাদ জানাতাম।

গল্পের প্রচণ্ড খরা চলছে। নতুনত্বের নামে গল্পকে যেমন খুশি তেমন সাজানো হচ্ছে। কিছু একটা দেখিয়ে চমক সৃষ্টি করে অভিনব গল্প ফাঁদার অপচেষ্টা হচ্ছে। এই প্রবণতা বন্ধ না হলে চলচ্চিত্রে গল্পের খরা কাটবে না।

 

পরিমিতিবোধের অভাব

নোলক

পরিচালক : সাকিব সনেট

কাহিনি ও সংলাপ : ফেরারী ফরহাদ

অভিনয়ে : শাকিব খান, ববি হক, রজতাভ দত্ত,

তারিক আনাম খান, মৌসুমী, ওমর সানী প্রমুখ।

প্রযোজনা : বি হ্যাপি এন্টারটেইনমেন্ট

নোলক অতি পরিচিত নারীর একটা অলংকার। ছবির শুরুতে সেই নোলক পরিয়ে বউ বরণ করে নোলককে সিন্দুকে তুলে রাখা হয়। ধনী তালুকদার পরিবারের দুই ভাই তারিক আনাম খান ও রজতাভ দত্ত, তাদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পায় শহীদুল আলম সাচ্চু ও সুপ্রিয়া দত্ত। তাদের কর্মহীন জীবনের বিলাসিতা নিয়ে গল্প ফাঁদা হলো। মাঝেমধ্যে দুই ভাইয়ের দুই ছেলে-মেয়ে ববি ও শাকিবের প্রেমকে নতুনত্বের রূপ দেওয়ার চেষ্টায় খুনসুটির হাস্যরসাত্মক দৃৎশ্যের বিশাল যজ্ঞ উপস্থাপন করা হলো। দু-চারটা দৃশ্যেই এগুলো শেষ করে মূল গল্পে প্রবেশ করা যেত সহজেই। তা না করে বিরতি পর্যন্ত টানা হলো, দর্শকও বিরক্তির চরমে পৌঁছে গেছে ততক্ষণে। বিরতির পর আবার নতুনত্ব! উপদেষ্টার বুদ্ধিতে দুই ভাই কর্মব্যস্ত থাকার জন্য একে অন্যের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। দুই উকিল ওমর সানী ও মৌসুমীর দ্বারস্থ হলো দুই ভাই। নোলকের গল্প তখনো সিন্দুকের ভেতর! দর্শক বুঝল, দুই ভাই উপদেষ্টাদের একটা ভয়ংকর ফাঁদে পড়বে শিগগির। সেটা দেখার জন্য যখন উত্সুক তখন আবার নতুনত্ব! মামলার ঘটনাও নোলকের সঙ্গে সিন্দুকে আবদ্ধ হলো। যে ছোট ভাই বড় ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না, এত মিল মান্যতা, সেই ভাই বড় ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে নিয়ে বেঁকে বসল। শুধু চোখ নয়, আঙুল মুখ সব তুলেই প্রতিবাদ করল এবং উপদেষ্টার চক্রান্তে বড় ভাইয়ের তেলের গুদামে আগুন লাগাতে রাজি হয়ে গেল। আর সেই ঘরেই ববি আর শাকিবকে লুকিয়ে তালা মেরে রাখল বড় ভাই। যা হওয়ার তা-ই হলো, শাকিব-ববি পুড়ে মরল আর সেই সঙ্গে নতুনত্বের সর্বশেষ দংশনে দর্শকও পুড়ল। শুধু তাই নয়, এই সময়ে আবহ সংগীতাকারে নোলক প্রবেশ করিয়ে নোলক নামটা জাস্টিফাই করার বিফল চেষ্টাও করা হলো।

শ্রদ্ধেয় সৈয়দ হাসান ইমাম বলেছিলেন, যে দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে চিত্রায়ণ করতে পারবে না সেটা চিত্রনাট্যে রাখবে না। নায়িকা ববিকে স্কুটি চালিয়ে ইন্ট্রোডিউস করাতে গিয়ে এবং   পিঁপড়া ঘরে ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখে সে সত্যিটা আবার উপলব্ধি করতে পারলাম। প্রযোজক বিপুল টাকা লগ্নি করে ফ্রেম ভরপুর করে ছবি করতে কার্পণ্য করেননি। পরিচালকও যত্ন করে নির্মাণ করেছেন। অভিনয়, গান, নাচ, সুর আবহ সংগীতের অপূর্ণতা এই চলচ্চিত্রে নেই। লোকেশন দেখার মতো। শুধু গল্পটা দেখার মতো হলেই আশি নব্বইয়ের সেই দিনে ফিরে যাওয়া যেত। অভিনয়ে ববি ও তারিক আনাম খান অসাধারণ। শাকিব নিজের গণ্ডিতেই আবদ্ধ। তবে শহীদুল আলম সাচ্চু ও সুপ্রিয়া দত্ত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সম্পাদনা ও চিত্রগ্রহণ সুন্দর। অযাচিতভাবে আসা ফাইটও খুব ভালো। আবহ সংগীত চলনসই। সংলাপ শ্রুতিমধুর, কিন্তু চিত্রনাট্যে পরিমিতির অভাব প্রচণ্ডভাবে লক্ষণীয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা