kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

‘আমার গানকে মানুষ নিজের গান মনে করে’

১৯৬৯ সালে বাংলা ছবি ‘দাদু’ দিয়ে সংগীত পরিচালক হিসেবে অভিষেক। বয়স ছিল তখন মাত্র ১৭! ৬৬ বছর বয়সে এসেও কাজ করে যাচ্ছেন সমান তালে। সংগীতজীবনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নানা মাধ্যমে বাপ্পী লাহিড়ীর দেওয়া সাক্ষাৎকারের সংকলন করেছেন লতিফুল হক

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আমার গানকে মানুষ নিজের গান মনে করে’

পঞ্চাশের দশকে ৬৫০টির বেশি সিনেমা, প্রায় ১০ হাজার গান! এখনো কাজ করে যাচ্ছেন! এত দিন ধরে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছেন কিভাবে?

কাজ একটাই জানি, সেটা গান। গান নিয়েই চলতে থাকি। কখনো থামি না। ২০১৯ সালেও বলিউডের পাঁচটি ছবিতে আমার গান আছে। দুটির সংগীত পরিচালনা করেছি, তিনটিতে গেয়েছি। কাজের মধ্যে ডুবে থাকি বলেই সময় কিভাবে যায় বুঝতে পারি না। নতুন যা আসছে, খোঁজ রাখি। এ কৌতূহলও আমাকে কাজের মধ্যে থাকতে সাহায্য করে।

 

আপনার গান এখনো বিভিন্ন ছবিতে ব্যবহার করা হয়। মার্ভেল পিকচার্স থেকে তামিল—ঝুমঝুমঝুম বাবা থেকে ডিসকো ডান্সার বাজছে। এত দিন পরে এসেও আপনার গান এতটা গ্রহণযোগ্য!

সবই মানুষের ভালোবাসা। আমার গানকে মানুষ নিজের গান  মনে করে। ওমান, সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়া যেখানেই যাই দেখি আমি গাওয়ার আগেই মানুষ নাচ-গান শুরু করে দিয়েছে। সেই কবেকার সব গান। অথচ আট-দশ বছরের বাচ্চাদেরও সব লাইন মুখস্থ। নিজেই আশ্চর্য হই।

 

আপনাকে সবাই একনামে ‘ডিসকো ডান্সার’ বলে ডাকে। কিন্তু এই সিনেমার আরেকটি গান ‘জিমি জিমি’ও তো দারুণ হিট।

‘জিমি জিমি’ তো একসময় বিশ্ব রেকর্ডও করেছিল। ৪৫টি ভাষায় ডাব হয়েছে গানটি! রাশিয়া, চীন, উজবেকিস্তান কোথায় হিট হয়নি।

 

খুব অল্প বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। কিভাবে বুঝতেন সংগীতেই আপনার রুটি-রুজি?

চার বছর বয়সেই তবলা বাজানো শুরু করি। বাবার সঙ্গে [অপরেশ লাহিড়ী] লতা মুঙ্গেশকর অনেক কাজ করেছেন। তিনি আমার তবলা শুনে মুগ্ধ হয়ে বড় পণ্ডিতের কাছে শিখতে বলেন। পাঁচ বছর বয়স থেকে তবলা শিখি। ১১ বছর বয়সে সুর করা শুরু করি। বাবা উৎসাহ দেন। পরে এমন এক সুর করি শুনে বাবা পাগল হয়ে যান! সেটা রেকর্ড করে ফেলেন। তখনই বুঝে যাই, এই লাইনেই আমার নিয়তি। মাত্র ১১ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলাম, এরপর গানের ব্যস্ততায় সময় পাইনি।

 

প্রথম ছবি ‘দাদু’তেই আপনার সুরে মান্না দে, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীরা গেয়েছেন। ভয় লাগেনি?

আসলে মুঙ্গেশকর পরিবার আগে থেকেই আমার পরিচিত। বাবার সঙ্গে কত কাজ করতে দেখেছি। তাই উনাদের সঙ্গে কাজ নিয়ে কোনো নার্ভাসনেস ছিল না। নিজের কাজ নিয়ে সব সময় আত্মবিশ্বাস ছিল।

 

এই ছবির পরপরই বম্বে চলে আসেন। কলকাতা ছেড়ে বম্বে এসে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কতটা কঠিন ছিল?

আরো বড় পরিসরে কাজ করতে চাইছিলাম, এ জন্যই বম্বে আসা। বাবাও উৎসাহ দিয়েছেন। প্রথম প্রথম বম্বে এসে কাজ পেতে খুব ঝামেলা হয়েছিল। তখন আর ডি বর্মণ, লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারে লালসহ আরো অনেক শক্তিশালী সুরকারের ভিড়ে জায়গা করে নিতে হয়েছিল। সবই ঈশ্বরের কৃপা। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কয়েকটা ছবিতে কাজ পাই। এরপর নাসির হোসেন, তাহির হোসেন আমার একটা গান শোনেন, ‘এক লাকড়ি বদনাম’। এটা শুনেই তিনিই আমাকে ‘মাদহোশ’-এ সুযোগ দেন। মূল ছবির গানের সুর আর ডি বর্মণ করলেও আমি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করি। এটাই ছিল আমার টার্নিং পয়েন্ট। বড় ব্যানারে কাজ করার পর সবার চোখে পড়ে যাই। এরপর সুযোগ পাই ‘জখমি’তে। ১৯৭৫ সালে সুনীল দত্ত, রাকেশ রোশন, আশা পরেখের তারকাবহুল এই ছবি আমার জীবনই বদলে দেয়।

 

আপনার পরিচিত গানগুলোর কথা সবাই জানে। অন্য রকম দু-একটি গানের কথা বলুন। যেমন ধরুন ‘জাহা চারিয়া’।

ওহ! ওটা তো রেকর্ড। বলিউডে এটাই একমাত্র গান যেটার মুখরা গেয়েছেন কিশোর কুমার, অন্তরা অমিতাভ বচ্চন। এখন র‌্যাপ নিয়ে এত মাতামাতি অথচ সেই ১৯৭৮ সালেই আমি ভারতে বসে র‌্যাপ করেছিলাম। অমিতাভের আরেক ছবি ‘নমক হালাল’-এর গানগুলোও দারুণ ছিল। ‘পাগ গুংরো বাধ’-এর কথা বলতে পারি। পাক্কা ১২ মিনিটের গান, বলিউডে আর হয়নি।

 

‘ডিসকো ডান্সার’ তৈরি নিয়ে কিছু বলুন।

১৯৭৯ সালে প্রথম বিদেশ সফর। শিকাগোতে এক নাইট ক্লাবে যাই, ওখানেই প্রথম ডিসকো দেখি। যেটাকে এখন আমরা ডিজে বলি। শিকাগোর নাইট ক্লাবের ডিসকোতে তখন জন ট্রাভেলট্রার গান বাজছিল। ওখান থেকেই ডিসকো ডান্সারের আইডিয়া পাই।

 

এ গানের জন্যই ডান্স মিউজিক কম্পোজার হিসেবে আপনার পরিচিতি।

আমি কিন্তু লোকসংগীত নিয়েও প্রচুর কাজ করেছি। অনেক বাংলা লোকসংগীতের সুর হিন্দিতে ব্যবহার করেছি। তবে মানুষ আমাকে যে জন্যই ভালোবাসুক, মনে রাখুক মাথা পেতে নেব।

 

আপনার নিজের সবচেয়ে পছন্দ কোন গান?

অবশ্যই ‘চলতে চলতে’। অনেক গান করেছি কিন্তু ‘চলতে চলতে’ কখনো ভুলতে পারব না। সব কনসার্টেই এটা আমার শেষ গান। বাস্তবে রেকর্ডিংয়ের সময় কিশোর মামা [কুমার] গাইতে গাইতে কেঁদে ফেলেছিলেন।

 

আপনার এই লুক, এত স্বর্ণের ব্যবহার করা কবে থেকে?

আমি এলভিস প্রিসলির পাঁড় ভক্ত, তাঁকে অন্ধ অনুকরণ করেছি। তিনিও চেন, ব্রেসলেট পরতে ভালোবাসতেন। সোনার জিনিস আমার জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে। প্রতিটিই বড় কোনো উপলক্ষে উপহার পাওয়া। কোনোটা মায়ের দেওয়া, কোনোটা স্ত্রীর। লকেটও বিভিন্ন ধরনের। কোনোটা হরে কৃষ্ণ, কোনোটা গণিপতি বাবা। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, সব ধর্মই বিশ্বাস করি। মনে করি, লকেটে এসব থাকলে মঙ্গল হবে।

 

লোকসভা নির্বাচন চলছে। গেলবার আপনি লড়েছিলেন, এবার নেই?  

আসলে এসব রাজনীতি অবসরপ্রাপ্তদের জন্য। যাদের অনেক কাজ তাদের এসব করার সময় কোথায়?

মন্তব্য