kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

স্মৃতিকথা

কী এমন বয়স হয়েছিল!

৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কী এমন বয়স হয়েছিল!

সুবীর নন্দী [১৯৫৩—২০১৯]

সদ্য প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীকে নিয়ে বলেছেন তাঁর জনপ্রিয়তম দুই গানের সুরকার মকসুদ জামিল মিন্টু

‘দিন যায় কথা থাকে’ যখন জনপ্রিয় হয় তখন থেকেই আমি সুবীর নন্দী নামের সঙ্গে পরিচিত। আমি তখন গিটার শিখি। গিটারে গানটির সুর প্রায়ই তুলতাম। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গানটি বাজাতাম। তখন এ গানটিই ছিল আমাদের গিটার শেখার জন্য উপযুক্ত গান। সেটা ১৯৭৯ সালের কথা। সুবীর নন্দীর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৪-৮৫ সালে। এর পর থেকেই তাঁর সঙ্গে কি-বোর্ড, বেজ বাজাতাম। তিনি সত্য সাহার সুরে গান করতেন। সত্যদার সঙ্গেও আমি বাজাতাম। ২০০৪ সাল পর্যন্ত সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোরদের পাশাপাশি প্রায়ই সুবীরদার সঙ্গে বাজিয়েছি।

আমার সুরে সুবীর নন্দী প্রথম গান করেন ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে। বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জন্য ‘আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা’ লেখেন হুমায়ূন আহমেদ। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদ ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে গানটি আবার করান সাবিনা ইয়াসমিনকে দিয়ে। আর খালি গলায় একটি ভার্সন করেন মেহের আফরোজ শাওন। একই চলচ্চিত্রে আমার সুরে সুবীর নন্দী কণ্ঠ দেন ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’য়। ছবি মুক্তির পর গানটি ভীষণ জনপ্রিয় হয়। গানটির জন্য সুবীরদা জাতীয় পুরস্কারও পান। এরপর ২০০২ সালে হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’য় আমার সুরে গাইলেন ‘ও আমার উড়াল পঙ্খি রে’। এটিও তুমুল জনপ্রিয় হয়। 

১৯৯৬ সালে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি আর গান গাইতে পারবেন কি না তা নিয়ে একটা সন্দেহ দেখা দেয়! তখন অনেকেই বলেছিলেন আমার এ গানগুলো দিয়েই সুবীর নন্দী সংগীত জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছেন। আমাদের দুজনের আরো কিছু গান আছে—‘উড়ে যায় বকপক্ষী’ নাটকের গান ‘হুরমুর হুরমুর করে মেঘা হুরমুর করে’, ‘হাবলংয়ের বাজার’ নাটকের টাইটেল ‘হাবলংয়ের বাজারে গিয়া’।

সুবীরদা খুব যত্ন করে গান তুলতেন। ভয়েস নেওয়ার আগে চার-পাঁচবার প্র্যাকটিস করে বলতেন, ‘তুমি যাও তো! বাইরে গিয়ে বসে একটু চা-টা খাও। আমি দেখতেছি।’ একটু পরেই ডাকতেন, ‘আসো। এবার শোনো। তুমি যে রকম চাচ্ছ সে রকম হচ্ছে কি না!’ আমি বলতাম, ‘দাদা এটা তো ঠিক আছে। আর রেকর্ড লাগবে না।’ তিনি তখন বলতেন, ‘আরে না। মাথা খারাপ! তুমি সংগীত পরিচালক! তোমার সামনে গাইব না! এতক্ষণ গানটি ভালোমতো তুলে নিলাম। দেখলাম কোনো সমস্যা আছে কি না। তুমি যখন বলছ কোনো সমস্যা নেই, এবার রেকর্ড করতে পারো।’ তাঁর এই ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগত। একটা গান নিজের মতো করে তুলে নেওয়া। এটা একটা সাংঘাতিক বিষয়। এ রকম সময় কেউ দেবে না।

মাঝে অনেক বছর আমি স্টেজে বাজাইনি। কিছুদিন আগে সুবীরদার সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে বাজাতে গিয়েছিলাম। শ্রোতাদের সামনে আমাকে তিনি এমনভাবে পরিচয় করিয়ে দিলেন—একজন বড় মাপের মানুষের পক্ষেই অন্যকে এভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। সেই মানুষটি এভাবে আমাদের ছেড়ে যাবেন এটা অপ্রত্যাশিত। আরো কিছুদিন বাঁচলে কী এমন ক্ষতি হতো! কী এমন বয়স হয়েছিল!

 

অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন

মন্তব্য