kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শ্রীহীন রূপসজ্জাকর পেশা

রূপসজ্জাকররা অন্তরালের মানুষ। আড়ালে তাঁদের অনেকে মানবেতর জীবন যাপনও করছেন। লিখেছেন সুদীপ কুমার দীপ

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রীহীন রূপসজ্জাকর পেশা

শাবনূরের সঙ্গে সেলিম

‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ রূপসজ্জাকরের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন কাজী হারুন। দেশের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র রূপসজ্জাকর তিনি। রাজ্জাক, ফারুক থেকে শুরু করে ইলিয়াস কাঞ্চন, অঞ্জু ঘোষ, দিতি—কার মেকআপ করেননি! অথচ তিনি এখন যাত্রাবাড়ী এলাকায় ভিক্ষা করেন। তাঁর স্ত্রী কয়েকটি বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে বাড়ি ভাড়ার টাকা জোগাড় করেন। উদাহরণটি টানলেন আরেক রূপসজ্জাকর হক মিয়া। বলেন, ‘চলচ্চিত্রে সবচেয়ে অবহেলিত মেকআপম্যানরা। তারকাদের ইচ্ছা হলে আমাদের কাজ দেন, না হলে দূরে সরিয়ে দেন। আমরা পরনির্ভরশীল হয়ে আছি প্রথম থেকেই। একজন তারকাকে পর্দায় নিখুঁত দেখানোর জন্য কী পরিমাণ কষ্ট করেন মেকআপম্যানরা, সেটা অনেক তারকাই বোঝেন না।’ রূপসজ্জাকরদের কথা চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো খুব একটা আমলে নেয় না। খোঁজ-খবর নেয় না মিডিয়াও। এমন অভিযোগ বেশির ভাগ রূপসজ্জাকরের।

প্রয়াত নায়ক মান্নার ব্যক্তিগত রূপসজ্জাকর ছিলেন হক মিয়া। মান্নার মৃত্যুর পর বিপদে পড়ে যান তিনি। উঠতি অনেক তারকাই পাশ কাটিয়ে গেছেন। কেউ কেউ তো সরাসরি পরিচালককে বলেছেন হককে না নিতে। তবে কাজী হারুনের মতো অবস্থা হয়নি হকের। বিভিন্ন বিয়ে বাড়ি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত ডাক পেয়েছেন। তাই কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়নি। অর্থনৈতিকভাবেও সচ্ছল। কিন্তু সেলিম! তিনি তো বিয়ে বাড়ি কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানের ডাক পান না। কেমন আছেন শাবনূরের প্রিয় এই রূপসজ্জাকর? ‘শাবনূর আপা চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর থেকে খুব খারাপ অবস্থায় দিন পার করছি। এখন এমনিতে ছবি নির্মাণ কমে গেছে। এরপর যে পরিমাণ দলাদলি হয় সেটা বলে শেষ করা যাবে না। একেক তারকার একেক রকম পছন্দ। যে যার মতো ব্যক্তিগত মেকআপম্যান তৈরি করে নিয়েছেন। ফলে আমরা যারা পেশাদার ছিলাম তারা আড়ালে পড়ে গেছি’—বললেন সেলিম।

শাবনূরের ৯০ শতাংশ ছবির রূপসজ্জাকর তিনি, মৌসুমীও মাঝেমধ্যে ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু এখন দুই তারকাই কাজ কম করেন। একসময়ের ব্যস্ত রূপসজ্জাকর জামালও এখন বেকার। তিন-চার বছর আগেও বদিউল আলম খোকনের ছবি মানেই শাকিব খান। আর বড় বাজেটের সেই সব ছবির রূপসজ্জার কাজ করতেন জামাল। মনোমালিন্যের কারণে তিন বছর হলো খোকনের সঙ্গে কাজ করছেন না শাকিব খান। মাঝখান থেকে বিপদে পড়েছেন জামাল, ‘বড় বাজেটের ছবিগুলোতে রূপসজ্জাকরের কাজ করার মজাই আলাদা। পারিশ্রমিকও ভালো পেতাম। চলচ্চিত্রের যে অবস্থা এখন তাতে করে সেই দিন আর ফিরবে বলে মনে হয় না। অন্য পেশায় যে যাব, সেটারও উপায় নেই।’

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে রূপসজ্জাকরদের মনে চাপা ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। সেই খবর জানালেন হক মিয়া। শাহীন সুমনের ‘একটু প্রেম দরকার’ ছবির ঘটনা। শাকিবের দীর্ঘদিনের রূপসজ্জাকর ছিলেন সবুজ। তাঁর সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় রাতারাতি পরিচালককে রূপসজ্জাকর বদলাতে বলেন শাকিব। সবুজকে বাদ দিয়ে হককে খবর দেন পরিচালক। শুরুতে শাকিবের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হননি হক, ‘সবুজ দীর্ঘদিন ধরে শাকিব ভাইয়ের কাজ করে। সেখানে হুট করে আমার যাওয়াটা মানায় না। তা ছাড়া সবুজ আমার জুনিয়র, সে হয়তো কষ্ট পাবে। শাহীন ভাইকে বিষয়টা বুঝিয়ে বললাম কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। শুধু তাই নয়, বললেন ছবির পুরো কাজ আমাকেই করতে হবে। তাঁর কথায় রাজি হলাম। পরদিন স্পটে গিয়ে শাকিব ভাইয়ের মেকআপও করলাম। দুই দিন পর স্পটে গিয়ে দেখি মেকআপম্যান হিসেবে কাজ করছেন জাভেদ। আমার অবর্তমানে শাকিব ভাইয়ের মেকআপ তিনিই করালেন। কেন! আমার দোষ কী? আমি তো সেধে কাজ নিইনি। পরিচালককে বললাম। তিনিও কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। আমি এর সমাধান চাইব কার কাছে? চলচ্চিত্রে আমার ক্যারিয়ার তিন দশকের। এই সময়ে এসে কি এমন অপমান সহ্য করে যাব?’—বললেন হক।

‘একটু প্রেম দরকার’-এর সেটে রূপসজ্জাকর নিয়ে আসলে কী ঘটেছিল? পরিচালক শাহীন বলেন, ‘শুরুতে সিনিয়র মেকআপম্যান শামসু ভাইকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। তিনি জাতীয় পুরস্কার পাওয়া মেকআপম্যান। শাকিবের মেকআপম্যান সবুজ বলল সে একাই সব কাজ করবে। কিন্তু কে জানত মাঝপথে শাকিবের সঙ্গে তার মনোমালিন্য হবে! শাকিব কোনোভাবেই আর সবুজকে নিয়ে কাজ করতে চান না। এরপর হককে ডাকি। দুই দিন পর শাকিব বললেন জাভেদকে ডাকতে। হক আর জাভেদ দুজন মিলে কাজ করবে। কিন্তু হক অভিমান করে চলে গেল। এখন আমি কী করতে পারি?’

এ বিষয়ে জাভেদ বলেন, ‘আমি আসলে কয়েক দিন প্রক্সি দিয়েছি। এর মধ্যে মাহি আপার শুটিং শুরু হয়েছে। আমি তাঁর ব্যক্তিগত মেকআপম্যান। তাই শাকিব ভাইয়ের কাজটা ছেড়ে দিতে হয়েছে।’

‘একটু প্রেম দরকার’ ছবির সহকারী মামুন জানালেন, এখন শামসু কাজ করছেন। এ পর্যন্ত ছবিটিতে চারজন রূপসজ্জাকর কাজ করেছেন। শাকিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাননি। তবে প্রযোজক সেলিম খান বলেছেন, ‘ছবির ভালোর জন্যই মেকআপম্যান বদল করা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ বা স্বার্থ নেই।’

 

পরীমণির সঙ্গে হক মিয়া


 

ফেরদৌস ও পূর্ণিমার সঙ্গে জামাল


 

জামালের সেলফিতে মাহিয়া মাহি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা